এবং এটা যে কতবড় নির্লজ্জ মিথ্যা সেটা আর সবার চেয়ে স্বয়ং ভুট্টোই জানেন সবচেয়ে বেশি। নইলে তিনি দু দুবার পা ঘষ্টাতে ঘষ্টাতে ঢাকা আসতেন না, নিছক মুজিবের উঠোনে কল্টো পেতে।… আসরে টাকাটা সাপটেছিলেন কোন গোঁসাই ভুট্টো মিঞা। তাই লোকে বলে, খেলেন দই রমাকান্ত, বিকেরের বেলা গোবদ্দন।
কিন্তু এ সবের সবকিছু ছাড়িয়ে যায় যে ঘৃণ্য, ন্যক্কারজনক আচরণ যেটা মানুষ জীবনভর ভুলতে পারে না সেটা :
সবাই জানত, ভুট্টো জানতেন মুজিব তখন পশ্চিম পাকে কারারুদ্ধ। তিনি কোনও কুৎসা, কোনও নিন্দা, কোনও অভিযোগ, কোনও অবমাননার উত্তর দিতে পারবেন না। তার প্রাণবায়ু অনিশ্চয়।
নিতান্ত ইতরজনও এ অবস্থায় তার দুশমনকেও গাল দেয় না।
কিন্তু বিলেতের ব্যারিস্টার, ল একপার্ট ভুট্টো জানেন আইনে সেটা বাধে না।
তাই ভাবি, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হতে হলে কত না এলেমের প্রয়োজন।
.
‘দুঃখ সহার তপস্যাতেই/ হোক বাঙালির জয়—’
মধুঋতু। ২৭ জানুয়ারি ১৯৭১ সালে জমিদার ভুট্টো অবতীর্ণ হলেন ঢাকা নগরীতে।
নেমেই নাকি বললেন, আমি আমার বড়দার সঙ্গে কথা কইতে এসেছি।
সুবে পুব পাকিস্তান পরিতৃপ্তিসহকারে উচ্চধ্বনি করলে, হো হো হো, কী বিনয়, কী বিনয়। জুনাগড় রাজ্যের পরম প্রতাপশালী ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রীর ঔরসে তথা বহু কলায়, বিশেষত সঙ্গীতে পারদর্শিনী অনন্যা প্রিয়দর্শিনীর গর্ভে যার জন্ম তিনি কি না আমাদের গায়ের সাদামাটা মুসল্লি মিয়া সাবের পোলাডারে বড় ভাইসাব কইলেন! খানদানি ঘরের মনিষ্যি অইব না ক্যান?
আসলে কিন্তু এটা কি সেই বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ-র নায়েবজির উদয়াস্ত নারায়ণ নারায়ণ! হরি হে তুমিই সত্য বুলি আওড়ানোর মতো নয়? দুটোই আগাপাশতলা নির্ভেজাল ভণ্ডামির প্রহসন।
এ তামাশার দশ-বারো বৎসর আগের থেকেই পশ্চিম বাংলায় প্রকাশিত পুঁথি-কেতাব পুব বাংলায় আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছে–মায় রবীন্দ্রনাথের কাব্য। তাই সেই বহুল প্রচারিত কবিতাটির নীতিবাক্য যদি ঢাকাইয়ারা ভুট্টোর দাদা, দাদা সম্বোধনের সময় স্মরণে না এনে থাকেন তবে উত্মা প্রকাশ করা অনুচিত।
কুটুম্বিতা বিচার
কেরোসিন-শিখা বলে
মাটির প্রদীপে
ভাই বলে ডাক যদি
দেব গলা টিপে।
হেনকালে গগনেতে
উঠিলেন চাঁদা–
কেরোসিন বলি উঠে,
এস মোর দাদা!
পূর্বেই বলেছি, মি. ভুট্টো আমাদের শেখের বর্ণে উঠতে চেয়েছিলেন, এখন তিনি তার ভাই হতে চান! তিনি এদানির আসমানে ওড়ান ইসলামি ঝাণ্ডা; ইসলাম অনুযায়ী ভাইয়ে ভাইয়ে সমান বখরা। পশ্চিম পাকের জনসংখ্যা পুব বাংলার চেয়ে কম। অতএব ভুট্টো-ভাই পুব বাংলারও একটা হিস্যে পাবেন।
দীর্ঘ তিন দিন ধরে শেখ সম্প্রদায় আপ্রাণ চেষ্টা দিলেন ভুটো কী চান সেটা জানতে। বাংলাদেশ কী চায় সে তো জানা কথা। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন। ভুট্টোও তাতে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তা হলে গেরোটা কোথায়?
ভুট্টোর মনের গভীরে দৃঢ়তর বিশ্বাস, আওয়ামী লীগ ভিতরে ভিতরে শুধু তক্কে তক্কে আছে, কী করে আখেরে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে সর্ব সম্পর্ক ছিন্ন করে স্বয়ংসম্পূর্ণ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র নির্মাণ করতে পারে। ভুট্টো তার কেতাবে স্বীকার করেছেন যে, ওই সময়ের কিছু আগে ইয়েহিয়ার প্রধান উপদেষ্টা পিরজাদা যখন তাকে জিগ্যেস করেন আওয়ামী লীগ। চায় কী? তখন তিনি মাত্র একটি শব্দে তার উত্তর দেন, সিসেশন। কেটে পড়তে চায়।… পশ্চিম পাকিস্তান বাংলাদেশকে না দেয় খেতে না দেয় পরতে, অথচ তিনি কিল মারার গোঁসাই। সেই খসমের কাছ থেকে সে চায় তালাক– এইভাবে বললে পুব পশ্চিম উভয় বাংলার হিন্দু-মুসলমান তত্ত্বটা স্পষ্ট বুঝতে পাবে।
এ কথা অতিশয় সত্য, সেই বখতিয়ার খিলজির আমল থেকে এবং আমার ব্যক্তিগত দৃঢ় বিশ্বাস তার পূর্বে, বৌদ্ধ হিন্দুযুগে, এক কথায় অনাদি অনন্তকাল থেকে বাংলাদেশ কস্মিনকালেও দিল্লির বশ্যতা স্বীকার করতে চায়নি। বার বার স্বাধীন হওয়ার জন্য সংগ্রাম করেছে। বাজারে চালু ইতিহাসে কিন্তু পাবেন, বুদু ঐতিহাসিকরা প্রতি অনুচ্ছেদে লিখছেন, এর পর বেঙ্গল রেবেল এগেনস্ট দি (দিল্লি) এমপেরর। যেন ঐতিহাসিক দিল্লি রাজদরবারের বেতনভোগী, হিজ মেজেস্টিজ মোস্ট অবিডিয়েন্ট স্লেভ, দিল্লির হুজুরের সাম্রাজ্যলোভী ইমপিরিয়ালিস্ট কলোনিয়ালিস্ট চশমা পরে সত্যমিথ্যা ন্যায়-অন্যায় বিচার করে ইতিহাস লিখেছেন– ইংরেজ যেরকম ১৮৫৭-র স্বাধীনতা সংগ্রামকে যতখানি অপমান করতে পারে সেই বদ মতলব নিয়ে তার নাম দিয়েছে সিপয় টিনি। ইন্ডিয়ান রেবেলিয়ান নাম দিলেও যে আন্দোলনের খানিকটে ন্যায্যতা স্বীকার করে নেওয়া হয়।
মোটেই ধান ভানতে শিবের গীত নয়।
এই বেলাই আমরা যেন এই ন মাসের দুঃখদহনের মূল তত্ত্বটি পরিপূর্ণরূপে হৃদয়ঙ্গম করে নিই। এই তত্ত্বটি একমাত্র তত্ত্ব অখণ্ড শাশ্বত সত্য। রাজনীতির ক্ষেত্রে একমাত্র কলমা, একমাত্র ইমান। এটা সর্বক্ষণ হৃদয়ে পোষণ না করলে কোনও দরকার নেই ওই ন মাস নিয়ে বিন্দুমাত্র কালির অপব্যয় করা। আমরা যেন ঘুণাক্ষরেও আমাদের আরামপিয়াসি মনকে এই বলে সান্ত্বনা দিই, এ ন মাস একটা দুঃস্বপ্ন, স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মাঝখানে একটা উটকো ব্যত্যয়– এটা গেছে, এখন থেকে আমরা চলব গোলাপের পাপড়ি বিছানো শস্যশ্যামল সোনার বাংলার জনপদভূমির উপর দিয়ে এবং পথের শেষে পাব কোরমা-পোলাওয়ের খুশবাই ভরা পদ্মাসাইজের ইয়া বিরাট দাওয়াত-বাড়ি, ভোজনান্তে তার চেয়েও বিরাট জলসাঘর, সেখানে অন্তহীন সঙ্গীত, নৃত্য, মধুচন্দ্রিকা।
