(ক) ব্যাঙ্করা নাকি টাকা দিত, আওয়ামী লীগকে– ভুট্টো বলেছেন, শেখকে পার্সনেলি।
এষ স্য অবতরণিকা : শেখের পূর্বপুরুষ সর্ব শুযুখ নিশ্চয়ই বহু পুণ্য সঞ্চয় করে গিয়েছিলেন যে সিন্ধুর কল্কি ভুট্টাবতার শেখকে সিন্ধি কলমা পড়িয়ে ভুট্টো-ইয়েহিয়া গোত্রে অন্তর্ভুক্ত করে এ আপ্তবাক্য ঝাড়েননি যে, তারা যে কায়দায় পঞ্চমকারের সাধনায় পয়সা ওড়ান শেখও ওই প্রাণাভিরাম পদ্ধতিতে পার্টি ফান্ডের কড়ি উড়িয়েছেন!
বলা বাহুল্য, শেখের জেবে ক-কড়ি ক-ক্রান্তি ছুঁচোর নৃত্যের কেত্তন চালাচ্ছে সে তত্ত্ব ভুট্টো তার ভুবন-জোড়া টিকটিকি প্রসাদাৎ উত্তমরূপেই জানতেন। সেখানে কানাকড়ির গড়বড় থাকলে ব্যারিস্টার ভুট্টো কি ছেড়ে কথা কইতেন? ঢাকার বাঙাল হাইকোর্টের চিলকোঠায় উঠে চিল-চাঁচানোর কর্কশ কণ্ঠে সে কেলেঙ্কারিটা প্রচার করতেন না?
মূল টীকা : ব্যাঙ্কারেরা শেখকে টাকা দিয়েছিল। এস্থলে সেই প্রাচীন প্রবাদ মনে আসে মোটেই মা দ্যায় না খেতে– তার আবার কাড়া-আকাড়া। উভয় পাকিস্তান মিলিয়ে বাঙালি ব্যাঙ্ক ছিল সর্বসাকুল্যে কটা? দুটো! তাদেরই-বা রেস্ত ছিল কতটুকু যে রাজনীতির ঘোড়দৌড় ব্যাক করতে যাবে? আওয়ামী লীগের মতো ডার্ক হর্সকে বিশেষ করে সবজান্তা সরকারি মহল থেকে ফিসফিসেনি কানাঘুষো যখন চতুর্দিকে চক্কর খেয়ে বেড়াচ্ছে শেখ মেরে-কেটে ৮০টা ভোট পায় কি না পায়?… আর পশ্চিম পাকিস্তানি ব্যাঙ্কগুলো টাকা দেবে লীগকে? এর উত্তরে শুধু ঢাকাইয়া উত্তর একমাত্র সম্বল : আস্তে কয়েন কর্তা— ঘোরায় হাসব।
কতকগুলো লোফার বোম্বেটে পিক-পকেট একদা কলকাতায় এসে নেমেছিল বাণিজ্যের নামে হয় মুর্শিদাবাদ-দিল্লিতে ভিখ মাঙতে নয় শান্ত সরল অতিথিবৎসল বাঙালির সর্বস্ব লুট করতে। তার পর কিস্মাৎ, পতন-অভ্যুদয়ের অলঙ্ বিধানই বলুন, পূর্বজন্মের কর্মফলেই বলুন,
বণিকের মানদণ্ড
পোহালে শর্বরী
দেখা দিল রাজদণ্ড রূপে।
যে দাঁড়িপাল্লার ঘামে ভেজা তেলচিটে ভঁটটায় হাত দিতে গা ঘিনঘিন করে সেটা দেখি আঁধারে গুঁড়িগুড়ি সিংহাসন বেয়ে উঠে রাজদণ্ডরূপ ধরে বেনের পোলাডার হাতে তিড়িং বিড়িং করে লাফাচ্ছে।
যে বোহরার পো পরশুদিন তক্ বোম্বায়ের রাস্তায় রাস্তায় ভাঙা ছাতা মেরামত করে দিনগুজরান করত, যে খোঁজার ব্যাটা বটতলায় ইটের উপর খদ্দের বসিয়ে নোয়ার ড্যাঁটার ইটালিয়ান চশমা বেচত, যে যেমন উদয়াস্ত কেনেস্তরার তৈরি ঝাঁঝরি বদনা ফেরি করে বেড়াত আর যে কচ্ছি ভূগুকচ্ছের গলিতে গলিতে তালা কুঞ্জিনা ধান্দা করে চাপাতি শাক খেত তারা ফাদার অব দি নেশনের কেরপায় ঢাকায় এসে রাতারাতি হয়ে গেল শেঠিয়া, মালিক, শিল্পপতি, আঁতরপ্রবর, চেম্বার অব কমার্সের চেয়ারমেন এবং সর্বোপরি বিশ্বজুটের সর্বাধিকারী হর্তা-কর্তা বিধাতা। আর ছাপরা ইস্টিশানের বেহারি মুটে হল ট্রাফিক ম্যানেজার।
এবং এদের তুলনায় ইসপাহানি গোষ্ঠী তো রীতিমতো খানদানি মনিষ্যি, শরিফ আশরাফ। এদের ঠাকুর্দার বাবা এসেছিলেন ঘোড়া খচ্চর বিক্রি করতে ইরান থেকে শ্রীরঙ্গপট্টমে, টিপু সুলতানের আস্তাবলে।
তালাকুঞ্জির ফেরিওলা থেকে ইটে বৈঠানওলা পরকলা বেচনেওলার দাপট তখন দেখে কে?–নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-টঙ্গি জুড়ে! দম্ভে দেমাকে যব চার্নক থেকে গলস্টনকে তারা তখন তুড়ি দিয়ে নাচাতে পারে। সুবে পাকিস্তানের ফাদার মাদার পিএএস (সিভিল সার্ভিস) তাদের নাম স্মরণে এনে ঢাকার সেকেন্ড ক্যাপিট্যাল আইয়ুব নগরে প্রবেশ করে।
সুবে পাকিস্তানের এইসব শাহ্-ই-শাহরা দাঁতে কুটো কেটে, ভেটের ডালি মাথায় করে যাবেন কোথাকার সেই ফরিদ-পুরা গাঁইয়া মছলিখোরকে পাস?
আর এঁদের তল্পিদার, যদ্যপি জমিদার তথাপি মন্ত্রণাদাতা জুলফিকার ভাই-আলিজি ভুট্টোওয়ালা তখনও কি তাঁদের হুশিয়ার করে দেননি, ওরে, তোরা যাচ্ছিস কোন বাগে? ওই লোকটাই তো কসম খেয়েছে, বাঙালিকে ফি বাঙলার রাজা বানাবে।
আর টাকা দিয়েই যদি দেশের দশের সম্মতি মহব্বত কেনা যেত তবে টাকার কুমির ভুট্টো তাঁর আপন দেশ সিন্ধুর দক্ষিণাঞ্চলের ভোটগুলো পাইকিরি হিসেবে কিনলেন না কেন? বেলুচিস্তানে ব্লাঙ্কো, আর সীমান্তে কুল্লে একটা ভোট পেলেন কেন?
গাঁয়ের ছেলে মুজিবের তরে ছিল দেশের দশের দরদ মহব্বত। তাকে তো কড়ি দিয়ে কিনলেম রেওয়াজ নিরিখে শুঁটকি হাটের কায়দাকেতায় ভোট কিনতে হয় না।
.
মি. ভুট্টোর আরেক কুৎসা : সদাগরদের কাছ থেকে যে টাকা পায় তাই দিয়ে মুজিব অস্ত্র সংগ্রহ করেছিল।
হায়, হায়, হায়! মাথা থাবড়াতে ইচ্ছে করে। তা হলে পশ্চিম পাকি পিশাচেরা এদের ন মাস ভূতের নাচ না নেচে ন দিনেই খতম হত।
কুৎসার কত ফিরিস্তি দেব? এ যে অন্তহীন।
ভুট্টো যে আজও ভুবনময় দাবড়ে বেড়াচ্ছেন সেটা বহু পূর্বেই উবে যেত যদি এই শেষ মেছোহাটার বদবোলা গালটার এক কড়িও সাচ্চা হত : মুজিব ভাড়াটে গুণ্ডাদের মদদ দ্বারা ঘায়েল করতেন নিরীহ নাগরিককে।
পুনরপি হায়, হায়। তাই যদি হত তবে স্বয়ং ভুট্টো সাহেব ২৬ মার্চ মুক্তকচ্ছ হয়ে, পড়িমড়ি করে, ইয়েহিয়ার পাইলটদের কোমর জাবড়ে ধরে ঢাকা থেকে পালিয়ে জানটি বাঁচাবার ছোটাসে ছোটা মোকাটা পেতেন কি?
