আরেকটি নীতিতে ফেবিয়ানরা দৃঢ় বিশ্বাস ধরতেন। গণতন্ত্রের গর্ভে থাকে সমাজতন্ত্র। গণতন্ত্রের অর্থনৈতিক রূপ সমাজতন্ত্র (সোশ্যালিজম)।
আওয়ামী লীগ চিরকালই এ-নীতিতে বিশ্বাস করেছে–আজও করে। তবে সেখানেও সে ফেবিয়ান। আকস্মিক শ্রেণি-সগ্রামের মাধ্যমে সে সমাজতন্ত্র (অর্থ বণ্টনের সাম্য) রূপায়িত হবে না– হবে প্রগতিশীল সংবিধান নির্মাণ, আইনকানুন প্রণয়ন দ্বারা ক্রমবিকাশমান সমাজচেতনার শুভ বুদ্ধিকে উৎসাহিত করে, সমাজবিরোধী শোষণ নীতিকে পলে পলে নিষ্পেষিত করে।
সোশ্যালিস্ট মাত্রই বিশ্বাস করে মানবসমাজ ক্রমশ সর্বপ্রকার সাম্যের দিকে এগিয়ে চলেছে- ধনবণ্টনে সাম্য, রাষ্ট্রচালনায় সাম্য, ধর্মকর্মে সাম্য, ভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে পদমর্যাদায় সাম্য (নেশনালিজম)–দুর্বল রাষ্ট্রকে যখন বৃহত্তর, বলীয়ান পশুরাষ্ট্র শোষণ-উৎপীড়ন করে, তাকে তার ন্যায্য সাম্য থেকে বঞ্চিত করতে চায়, তখন তাকে সর্বপ্রকারে সাহায্য করে দেওয়া তার রাষ্ট্রসাম্য–। প্রকৃত সোশ্যালিস্ট মাত্রই সেই আগ্রাসী গতিবেগকে সংবিধানসম্মত নিরস্ত্র পদ্ধতিতে সাহায্য করে।
আজকাল আমরা মোক্ষ, নিজাত, ফান-বাক্য, নির্বাণ ইত্যাদিতে বড় একটা বিশ্বাস করিনে। তবু একটা সমান্তরাল উদাহরণ দেখালে তথাকথিত সংস্কারমুক্ত ন-সিকে রেশনাল জনও হয়তো কিঞ্চিৎ বিস্মিত তথা আকৃষ্ট হতে পারেন। খ্রিস্টান মিশনারি, যার প্রচার করেন, মুসলমান নারীর আত্মা নেই, তারা বলেন, প্রভু বুদ্ধ নৈরাশ্যবাদী। আমরা বিশ্বাস করি তিনি ছিলেন পরিপূর্ণ আশাবাদী। তিনি বলেছেন, বিশ্বমানব এগিয়ে চলেছে নির্বাণের দিকে। আখেরে নির্বাণ পাবে সর্বজন– সর্ব মানব থেকে আরম্ভ করে সর্ব কীটপতঙ্গ। এরা চলেছে যেন নদীর ভাটার স্রোত ধেয়ে। তাকে উজানে চালানো অসম্ভব। কিন্তু স্রোতগামী কাঠের টুকরোটাকে বৃহত্তর কাষ্ঠখণ্ড দ্বারা যেরকম সেটাকে কিঞ্চিৎ ডাইনে-বাঁয়ে সরানো যায় কিংবা তার গতিবেগ বাড়ানো যায়, মানুষ ধর্মসাধনা দ্বারা ঠিক সেইরকম নির্বাণের দিকে তার গতিবেগ বাড়িয়ে দিতে পারে। এককথায়, কি ফেবিয়ান, কি কম্যুনিস্ট, কি বৌদ্ধ সকলেই চরম গন্তব্যস্থল সম্বন্ধে আশাবাদী।
.
পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, শেখ সাহেব এবং আওয়ামী লীগের প্রধানগণ ফেবিয়ান ঘেঁষা সোশ্যালিস্ট। পক্ষান্তরে প্রকৃত বামপন্থি ছিলেন মৌলানা ভাসানী। ওদিকে লেফটেনেন্ট কমান্ডার মুয়াজ্জম হুসেন যে মতবাদ পোষণ করতেন সেটা অতি সংক্ষেপে প্রকাশ করা যায়– ছয় দফা বনাম এক দফা। তিনি বলতেন, আমি পশ্চিম পাকিদের খুব ভালো করেই চিনি। ওদের সঙ্গে বাঙালির কস্মিনকালেও মনের মিল স্বার্থের ঐক্য হবে না। ছয় পয়েন্টের ধানাই-পানাই না করে সোজাসুজি এক দফায় বলে দাও, চাই স্বরাজ, পুব বাঙলায় সম্পূর্ণ স্বাধীন সবশক্তির স্বতন্ত্র রাষ্ট্র। আইয়ুব এবং ইয়েহিয়া দু জনাই মুয়াজ্জমের এককাট্টা জাতীয়তাবাদের কথা ভালো করেই জানতেন। তাই কুখ্যাত আগরতলা মামলার যে নথিপত্র আইয়ুবের আদেশে স্বয়ং ইয়েহিয়া তৈরি করেন তার আসামির ফিরিস্তিতে অন্যতম প্রধান ছিলেন মরহুম মুয়াজ্জম। টিক্কা খানও সেকথা ভোলেননি। তাই ২৬ মার্চ ভোরবেলা তাঁকে নৃশংসভাবে, তাঁর স্ত্রীর চোখের সামনে হত্যা করা হয়। জনৈক প্রত্যক্ষদর্শী সে নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের কথা আমার সঙ্গে দেখা হওয়া মাত্রই সর্বপ্রথম উল্লেখ করেন। সে কাহিনী এমনই পাশবিক যে তার বর্ণনা দেবার মতো শক্তি আমার নেই। যেটুকু পারি যথাসময়ে দেব।
অথচ মি. ভুট্টোর বিবরণী মাফিক শেখ পয়লা নম্বরি ফ্যাসিস্ট। মনে হয়, ভুট্টো প্রথম একখানি প্রামাণিক অভিধান খুলে ফ্যাশিসমো শব্দটির অর্থ দফে দফে টুকে নিয়েছেন। তার পর মুসোলিনি এবং হিটলার দুই পাড় ফ্যাসির কর্মপন্থার তসবিরের নিচে রেখেছেন একখান আনকোরা কার্বন পেপার। উপরে বুলিয়েছেন একটা দড় বলপয়েন্ট। হো প্রেন্তে! ভানুমতীকা খেল– তলার থেকে বেরিয়ে এল, মুজিবের ছবি।
যথা :
হিটলার ধনপতিদের কাছ থেকে পেতেন টাকা।
মুজিব পেতে লাগলেন অঢেল টাকা এবং অন্যান্য উপাদান। (ম্যাসিড মানিটারি অ্যান্ড মেটিরিয়াল এসিসটেন্স্)- ব্যাঙ্কার এবং ধনপতিদের কাছ থেকে (ব্যাঙ্কারস অ্যান্ড বিগ বিজনেস)। উবাচ ভুট্টো।
এই একটিমাত্র বাক্য যেন একটি জুয়েল। ন্যাড়খানাগত উজ্জ্বল নীলমণি।
যেন এক্কেবারে খাঁটি যোগশাস্ত্রের সূত্রে বাধা আস্ত একটি কণকমঞ্জরী :
যক্ষকুবের প্রসাদাত অর্থং চ বিত্তং চ।
ন-ন-নাঃ। যে ভুট্টো মিঞা বাঙলা ভাষার নামেই ফ্যাকচুরিয়াস তার পাক জবানে কাফেরি কালাম। তওবা, তওবা!
বরঞ্চ সিন্ধিভাষা ফারসির হনুকরণ করে। যেমন মি. ভুট্টোর সম্পূর্ণ অপরিচিত নয় এমন এক সম্প্রদায়কে আহ্বান করতে গিয়ে ইরানি কবি যে চারিটি শব্দ ব্যবহার করেছেন সিন্ধি ভাষাতে সেগুলো সুবো-শাম– বিশেষ করে শাম সন্ধেবেলা– এস্তেমাল হয়– রিন্দ, ম, দেওয়ানা, শাবি। তাই ফারসিতেই না হয় দোহা গাঁথি :
অমদ জর ওরা আমদ সরঞ্জাম,
আজ সররাফ ওয়াজ নিমকহারাম।
ভাণ্ড ভাণ্ড স্বর্ণ আর সর্ব অবদান।
ঢেলে দিন সুদখোর আর বিত্তবান ॥
–পাঠান্তর
ঢেলে দিল ব্যাঙ্কার, নেমকহারাম ॥
এ তো হল সূত্র নির্মাণ কিন্তু এই আজব ভুটাঙ্গপুরাণের মল্লিনাথ হবার মতো পেটে এলেম ধরেন হেন জন তো এ ঘোর কলিকালে দেখতে পাচ্ছিনে। অতঃ মধ্বভাবে গুড়ং দদ্যাৎ!
