মশকরাটার বাড়াবাড়ি হচ্ছে? মোটেই না। পাঠক, একটু পরেই বুঝতে পারবেন! আমি এই ব্যাপারটা নিয়ে কতখানি জীবন-মরণ সিরিয়াস। আচ্ছা, তা হলে না হয় আমি একটা সিরিয়াস উদাহরণ নিচ্ছি। মনে করুন, বছর কয়েক পূর্বে উইলসনের পরিবর্তে মি. ভুট্টো ছিলেন বিলেতের প্রধানমন্ত্রী। উইলসন-ভুট্টো নির্বাচনে হেরে গেলেন মি. হিথের কাছে। বিশ্বসংসার জানে চব্বিশ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে উইলসন প্রধানমন্ত্রী ভবন ১০নং ডাউনিং স্ট্রিট থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে সরে পড়লেন। ভুট্টো সে স্থলে কী করতেন? নিশ্চয়ই আবদার ধরতেন, হিথের পরেই আমার ভোটাধিক্য। ও পেয়েছে ইংলন্ডে সবচেয়ে বেশি ভোট, আমি পেয়েছি স্কটল্যান্ডে সবচেয়ে বেশি ভোট (ইংলন্ড স্কটল্যান্ড আমি কথার কথা কইছি)। আমার সঙ্গে একটা সমঝোতা না করে দেখি হিথ কী করে ১০ নম্বরে ঢোকে? আমি বলছি কী, সে যদি নেয় ডাইনিংরুম আমি নেব ড্রইংরুম, তাকে দেব গাইয়ের মুখের দিকটা আমি বাঁটের দিকটা, সে নেবে কল্কে সাজানোর দিকটা আমি মুখে পুরব গড়গড়ার নলটা। সে কী! পূর্ব পাক কি আমার পর– একেই বলে সত্যকারের অনেট ব্রাদারলি ডিভিশন।
.
ভুট্টো জানতেন, বিলক্ষণ জানতেন, গণতন্ত্রের কি আইনত (ডি জুরে) কি কার্যত (ডি ফাঁকটো) আওয়ামী লীগের গণদরবারে (ভিজা আ ভি) পয়লা সারিতে তার কোনও আসন (লকাস স্টেভি) নেই। তাই তাঁর ছিল আপ্রাণ চেষ্টা, কোনও গতিকে আওয়ামী লীগের দরবারের এক কোণেও যেন একটা আসন যোগাড় করে নিতে পারেন। তাই যদিও তিনি এলেন ঢাকঢোল বাজিয়ে প্রয়োজনাতিরিক্ত সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে, ভিতরে ভিতরে তিনি এলেন আতুর ভিখিরির মতো হামাগুড়ি দিতে দিতে।
পাঠক, আপনি যতই অতিষ্ঠ হয়ে থাকুন না কেন, আমি এই লিগেল, মরাল, সাংবিধানিক প্রতোকলীয় পয়েন্টটি কেচে ধুয়ে ইস্ত্রি চালিয়ে ভাঁজ করে পকেটে না ঢোকানো পর্যন্ত ছাড়ছিনে। কারণ এটা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এক অশিব মূর্তি নিয়ে বার বার দেখা দেবে। যারা বাংলাদেশের মঙ্গল কামনা করেন তাদের এ বিষয়ে পরিপূর্ণ সচেতন হওয়া উচিত। আমার অজানা নয়, বিষয়টি অত্যন্ত নিরস কিন্তু সে কারণে আমি যদি এটা এড়িয়ে যাই তবে উভয় বাঙলার যে দু-একজনের সঙ্গে আমি এ নিয়ে তুমুল তর্কাতর্কি করেছি তারা আমাকে আস্তো একটা এসকেপিস্ট, ভঁড়ামি ভিন্ন অন্য কোনও সিরিয়াস বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চায় না বলে আমাকে প্রাগুক্ত সার্কাসের ওই ক্লাউনের সঙ্গে তুলনা করে পাকিস্তানে নির্বাসিত করবেন। আমি যে ভঁড় ক্লাউন সেটা আমি অতীব শ্লাঘার বিষয় বলে মনে করি, কিন্তু একটি নিবেদন এস্থলে আমাকে পেশ করতেই হল : সার্কাসের ক্লাউন তো এসকেপিস্ট হয় না– সে তো কুল্লে ওস্তাদের তাবৎ কেরামতি দেখাবার জন্যে সদাই শশব্যস্ত।
তা সেকথা থাক। আমি এ প্রস্তাবনা উত্থাপন করেছি গুণীদের মুখ থেকে সুদ্ধমাত্র শোনবার জন্য, গণনির্বাচনে নিষ্কণ্টক সংখ্যাগুরুত্ব লাভ করার পর বিজয়ী পার্টির কি কোনও দায় আছে, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় পার্টির সঙ্গে সলাপরামর্শ করার-জাহান্নমে যাক তাদের সঙ্গে সমঝোতা করার। অতি অবশ্য একথা সত্য, ভুট্টো যদি তাঁর পার্টির প্রতিভূ হিসেবে আমি ভোটে দুই নম্বরি হয়েছি বা আমি সমুচা পশ্চিম পাকিস্তানের মোড়ল সে হিসেবে নয়– আওয়ামী লীগ প্রধানের কাছ থেকে একটা ইন্টারভিউর প্রার্থনা জানান তবে শেখ-চরিত্র আমরা যতখানি চিনতে পেরেছি তার থেকে বলতে পারি তিনি বদান্যতার সঙ্গে সেটা মঞ্জুর করবেন।
কিন্তু সেটা হবে শেখের ব-দা-ন্যতা।
মি. ভুট্টোর হ-ক নয় ॥
.
পিণ্ডির পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে
রোমান সেনাপতি কুইনটু ফাবিয়ুস যখন হানিবালের সঙ্গে সংগ্রামে লিপ্ত তখন তার রণকৌশল ছিল সম্মুখযুদ্ধে মরণ-বাচন লড়াই না লড়ে ক্রমাগত সুযোগের অপেক্ষায় দেরি করে করে যখন সুযোগ আসত তখন মুখোমুখি না লড়ে শত্রু-সেনার বাজুতে যেখানে সে দুর্বল সেখানে আঘাত হানা কিন্তু সে আঘাতটা হত মোক্ষমতম। তাই সুযোগের অপেক্ষা করে আখেরে দুশমনকে ঘায়েল করার চাল বা স্ট্র্যাটেজিকে আজও বলা হয় ফেবিয়ান পদ্ধতি। মারাঠারা হুবহু, ওই একই পদ্ধতিতে ঔরংজেবকে রণক্লান্ত ও পরবর্তীকালে মোগলবাহিনীকে পরাজিত করে। একদিক দিয়ে দেখতে গেলে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা ওই নীতির অবলম্বন করে সফলকাম হন।
এস্থলে কিছুটা অবান্তর হলেও ইংলন্ডের ফেবিয়ান সোসাইটির উল্লেখ করতে হয়। মার্কস-এঙেলস যখন আসন্ন রক্তাক্ত শ্রেণি-সংগ্রামের প্রোপাগান্ডা করে যাচ্ছেন তখন তার শেষের দিকে বিলেতে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে (১৮৮৪) ওই নাম নিয়ে। এঁদের নীতি নির্দেশ আছে : হানিবালের সঙ্গে সংগ্রাম চালিয়ে যাবার সময় ফাবিয়ুস যে নীতি অবলম্বন করেছিলেন তোমাকে অসীম ধৈর্যসহকারে সুযোগের সেই শুভ লগ্নের জন্য প্রতীক্ষা করতে হবে– যদিও বহু লোক তখন ফাবিয়ুসের সেই দীর্ঘসূত্রতাকে নিন্দাবাদ করেছিল; কিন্তু সে লগ্ন যখন আসবে তখন হানবে বেধড়ক মোক্ষম ঘা— নইলে তোমার সর্ব প্রতীক্ষা সবরের (সবুরতার সমাপ্তি ঘটবে হাহাকার ভরা নিষ্ফলতায়।
আওয়ামী লীগের গোড়াপত্তন থেকে ২৫ মার্চ ১৯৭১ পর্যন্ত তার রণনীতি ছিল ফেবিয়ান– একথা বললে মোটামুটি ঠিক কথাই বলা হয়। বিশেষ করে ১৯৭০ ডিসেম্বরে নিষ্কন্টক মেজরিটি পাওয়ার পর থেকে ১৯৭১-র ২৫ মার্চ পর্যন্ত।
