তবু তিনি এলেন ঢাকায়। তার একমাত্র কারণ, তার দৃঢ় বিশ্বাস, শেষটায় রাষ্ট্রের কর্ণধার হবেন তিনি– এদ্দিন যা ছিল, ঠিক তেমনি, পুব পাক থাকবে তার তাবেতে কলোনি রূপে। ইংলন্ডের রাজা যে রকম সমুদ্রের ওপারের ডমিনিয়নসেরও ম্রাট। এবং দিল্লীশ্বরো বা জগদীশ্বরো বা যেরকম কখনও-সখনও ভারতে এসে রাজানুগ্রহ দেখাতেন, ভুট্টোকেও তো সেরকম ঢাকাতে আসতে হবে মাঝেমিশেলে। তখন যেন তাঁর পূর্ব পাকিস্তানের কোনও বেয়াড়া প্রজা না বলতে পারে, তিনি মুজিবকে তার মুখারবিন্দ দর্শন লাভ থেকে অকারণ তাচ্ছিল্যে বঞ্চিত করেছিলেন।
ভুট্টোদেব ঢাকা এলেন বিস্তর সাঙ্গোপাঙ্গ সঙ্গে নিয়ে। প্রিনস অব ওয়েলস যেরকম পাত্রমিত্র নিয়ে দিল্লি আসতেন।
ইয়েহিয়া যখন ভুট্টোর পূর্বে ঢাকা আসেন তখন তার সে আসাটা আন্তরিক শুভেচ্ছাবশত ছিল কি না সে বিষয়ে মতভেদ আছে, কিন্তু এ বিষয়ে কারও মনে কোনও সন্দেহ নেই যে, ভুট্টোর আগমনটা ছিল নির্ভেজাল ধাপ্পা। কোনওপ্রকারের সমঝোতাই তার কাম্য ছিল না। তাই মারাত্মক রকমের সিরিয়াস কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনার ভড়ং চালালেন তিনি পাক্কা তিনটি দিন ধরে যে আলোচনা তিন মিনিটেই শেষ হয়ে যাবার কথা। একবার তো তিনি সে থিয়েডারিটাকে প্রায় ফার্সের পর্যায়ে নাবিয়ে আনলেন একটানা ঝাড়া আটটি ঘণ্টা শুধু তিনি আর শেখ সলা পরামর্শ করে। ও হো হো! সে কী টপমোস্ট সিক্রেসির ভান! মিঞা তাজ, নজরেরও সেখানে প্রবেশ নাস্তি। ভাবখানা এই, ভুট্টোদেব এমনই প্রলয়ঙ্করী প্রস্তাব প্রতিপ্রস্তাব পরিকল্পনা সুপারপ্ল্যানিং পেশ করবেন যে তার সামান্যতম রেশও যদি তৃতীয় ব্যক্তি শুনে ফেলে তবে ইন্ডিয়া সেই রেশের ওপর নির্ভর করে তদণ্ডেই পাকিস্তান এটাক করবে, ওয়ালস্ট্রিট, ফট করে কলাপস করবে, ইংলন্ডের মহারানি তার চাচা উইন্ডসরকে কোল-পাজা করে তুলে এনে তার হ্যাটে কোহ-ই-নূরটি পরিয়ে দেবেন।
কিবা হবে, কেবা জানে।
সৃষ্টি হবে ফট
সংক্ষেপে বলিতে গেলে
হি টিং ছট।
বিশেষ বিবেচনার পর আমি এস্থলে হি টিং ছটটি ব্যবহার করেছি কবিগুরু যে অর্থে ব্যবহার করেছিলেন ঠিক সেই অর্থে। আপাতদৃষ্টিতে অসাধারণ রহস্যময় কতকগুলি বুজরুকিকে যখন গভীর আধ্যাত্মিক তত্ত্বময় তান্ত্রিক ধ্বনির মুখোশ পরানো হয় তখন সেটা হিং টিং ছট; সায়েবি ভাষায় আবরাকাডাবরা মাম্বোজাম্বো হাকাস পোকাস।
ভুট্টো শেখের এ রাঁদেভূতে লাভবান হলেন কে?
নিঃসন্দেহে ভুট্টো।
চাঁড়াল ভুট্টো শেখের সঙ্গে একাসনে বসতে পেয়ে পৈতে পেয়ে গেলেন।
ইয়েহিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন তিনি আইয়ুবের স্বৈরতন্ত্র হটিয়ে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করবেন। তার প্রথম পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গেই দেখা গেল শেখ মুজিব নিরঙ্কুশ সংখ্যাগুরুত্ব লাভ করেছেন। তিনি স্বচ্ছন্দে একটি নিষ্কণ্টক সরকার নির্মাণ করতে পারেন। ইতোমধ্যে ময়দানের এক কোণ থেকে একটা লোক সার্কাসের ক্লাউন যেরকম ওস্তাদের কেরামতি খেল দেখে চেঁচাতে আরম্ভ করে, আমি পারি, আম্মো আছি–আমাকে ভুললে চলবে না, ঠিক সেইরকম একটা লোক হাত পা ছুঁড়ে বিকট চেল্লাচেল্পি আরম্ভ করল, শেখের পরেই আমি, আমাকে ছাড়া চলবে না। সার্কাসের ম্যানেজার সদয় মশকরার মুচকি হেসে হেসে তো, আও বেটা, বাতাও তুমহারা খেল। ম্যানেজার ইয়েহিয়া বললেন, শাবাশ বেটা ভুট্টো।
কিন্তু দীর্ঘ তৈইশ বৎসর ধরে সর্বপ্রকারের অত্যাচার অবিচারের পর এই হয়েছে গণতন্ত্রের গোড়াপত্তন। তাই গোড়া থেকেই চলতে হবে অত্যন্ত সন্তর্পণে, আইনের পথে ন্যায়ের পথে– গণতন্ত্রের নাতিদীর্ঘ ইতিহাসে ভিন্ন ভিন্ন দেশে যেসব উদাহরণ সৃষ্ট হয়েছে, নজির নির্মিত হয়েছে, সেগুলো প্রতি পদে সসম্ভ্রমে মেনে নিয়ে। এটা তো সার্কাস নয়। গণতন্ত্রে ভাড়ামির স্থান নেই– সে ছিল আইয়ুবের বেসিক ডেমোক্রাসিতে।
কে এই লোকটা?
আমি ভুট্টো; গণনির্বাচনে আমি দুই নম্বরের সংখ্যাগুরু। মুজিবের পরেই আমি। আমার সঙ্গে একটা রফারফি না করে সংবিধান বানালে চলবে না।
বা রে! এ তো বড়ি তাজ্জবকি বাত! মুজিবের পরেই তুমি! তা– সৃষ্টির ইতিহাস পড়লেই দেখি সদাপ্রভুর পরেই শয়তান। তাই বলে গড় যখন সেরাফি চেরাবি, গেব্রিয়েল নিয়ে ভগবানবাদে তার ক্যাবিনেট নির্মাণ করলেন সেখানে তো শয়তানকে ডাকা হয়নি। এসব তাবৎ জঞ্জাল জড়ো করে তিনি বানাতেন কী? ঢাকা মিরপুরের চিড়িয়াখানা?
আর, বাই দি উয়ে, তোমার পর তো সংখ্যাগুরুতে ইনডিপেনডেন্ট ক্যানডিডেটস। তাদের সঙ্গে একটা সমঝোতা করে নিয়ে তার পর এখানে এসেছ তো? তুমি যেমন আমার ঠিক ঠিক নিচে বলে আমার সঙ্গে একটা রফারফির দাবি জানাচ্ছ, ঠিক তেমনি ওরাও তোমার উপর সেই দাবি চাপাচ্ছে না তো? করে করে তার পরের দলের দাবি তার উপরের দলের ওপর চাপাবে এবং লিস্টের সর্বনিম্নে যে চোরউল আমিন লিলি করছে তাকে পর্যন্ত ভজতে পূজতে হবে। তার নামখানা থেকেই বুঝতে পারছ, ওর খাই মেটানো তোমার-আমার কম নয়– থুড়ি, আমার কম্ম নয়, কিন্তু তুমি পারবে! তুমি যখন মহামান্য সুচতুর ইয়েহিয়াকে বোঝাতে পেরেছ যে, গণতন্ত্রের পয়লা আইন হচ্ছে, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগুরুর প্রথম কর্তব্য সে যেন সংখ্যালঘুর ন্যাকরা বয়নাক্কার তোয়াজ করে করে কাজকর্মের ভার নেয়, ক্লাসের ফার্স্ট বয় যেন সেকেন্ড বয়ের সঙ্গে আলোচনা করে তার মর্জিমাফিক আসছে পরীক্ষায় (সংবিধান নির্মাণে) অ্যানসার বুক লেখে– এ রকম ভেল্কিবাজি যখন দেখাতে পেরেছ, তখন না হয় বলে দিয়ে চোর উল আমিনকে যে তুমি তাকে তোমার বাড়ির পাশের মোনজোদভোর সুলতান বানিয়ে দেবে। হ্যাঁ, আরেকটা কথা। তুমি এরকম হ্যাংলার মতো ট্যাংস্ ট্যাংস করে ঘস্টাতে ঘস্টাতে ঢাকা এলে কেন? ওই যে, তোমার হয় তো, বাপু, চেনা, শয়তান– সে-ও তো ভগবানবাদে গিয়ে গডের কাছে বায়না ধরেনি, আমাকে তোমার কেবিনেটে নাও। সে। জানে হোয়াট ইজ হোয়াট। সে তার আপন শয়তান বাদে (মাস তিনেক পরের ঘটনা জানা থাকলে এস্থলে অক্লেশে বলা যেত, টিক্কা বাদে) দিব্য তার মিতা ডেভিল, ইবলিস, বি এল জেবাব নিয়াজি, ইরফানকে নিয়ে তার আপন সংবিধান বানিয়ে নিয়েছে এবং বললে নিশ্চয়ই পেত্যয় যাবে, তার সরকার তেমন কিছু মন্দ চলছে না। তুমি বানাও না তোমার সংবিধান তোমার প্যারা ত্রিমূর্তি নিয়ে যক্ষ রক্ষ গুপ্ত দিয়ে। এরা এক-এক খানা আস্ত আস্ত চিজ। ওদের ঠেলায় দেখতে হবে না, শয়তান বাবাজিকে রাতারাতি ব্যবসা গুটিয়ে লারকানার হাইকোর্টে দেউলে হওয়ার নোটিশ টাঙাতে হবে।
