ইয়েহিয়া আসনে বসামাত্রই ভুট্টো মারলেন ডুব। তার লক্ষ্য ছিল দুটি : আয়ুবকে সরিয়ে জিন্না দিয়ে সেকেন্ড হওয়ার পথ সুগম করা। দুই : কিন্তু জিন্না ছিলেন পুব-পশ্চিম দুই পাক-ডানার উপর সওয়ার ফাদার অব দি নেশন। এর একটি ডানা অটনমি পেয়ে গেলে তিনি হয়ে যাবেন এজমালি জুনিয়ার ফাদার অব দি নেশন। অতএব ঘায়েল করতে হবে আওয়ামী লীগকে। মূলত ভুট্টো-পার্টির একটা শাখা পূর্ব পাকেও ছিল। তার চেয়ারম্যান ছিলেন মুসলিম শাস্ত্রে সুপণ্ডিত বাঙালি মৌলানা নুরজ্জমান। ভুট্টো দেখলেন, বাংলাদেশের সর্বনাশ করে তাকে পশ্চিম পাকের চিরন্তন ক্রীতদাস বানাতে হলে তার পার্টিতে পুব পাকের কোনও সদস্য রাখলে সে তার হুকুমমতো নেমকহারাম কুইজলিং সাজতে রাজি না-ও হতে পারে। তাই তিনি তাঁর পার্টিকে নবরূপে দিলেন- আপন প্রদেশ সিন্ধুর কোনও নগরে নয় তাঁর আরাধ্যা, বলুভা নগরী পাঞ্জাবি লাহোরে। মৌলানা নুরজ্জমান তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ভুট্টোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলেন এবং স্পষ্ট ভাষায় বললেন, ভুট্টো লাহোরে তাঁর পার্টিকে নবরূপ দেবার সময় পুব পাকের কোনও নেতা বা সাধারণ জনকে আহ্বান জানাননি; তার একমাত্র উদ্দেশ্য বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করা।
ভুট্টোর যে নিষ্ক্রিয় আঠারো মাস সম্বন্ধে অর্থপূর্ণ কুটিল প্রশ্ন শুধিয়েছিলেন অ্যার মার্শাল নূর খান সে আঠারো মাস ভুট্টো ছিলেন নীরব কর্মী; তিনি তখন ষোড়শোপচারে পূর্বোক্ত ত্রিমূর্তির পূজার্চনায় নিরতিশয় নিমগ্ন। ভুল করলুম, ষোড়শ নয়, সপ্তদশ– বোতলবাসিনী তরলা-ভৈরবী। আর কে না জানে, সপ্তদশেই বঙ্গজয় সম্ভবে।
প্রথমেই নমো যক্ষায়। ধনপতিদের বোঝতে রত্তিভর সময় লাগল না– পুব পাক হাতছাড়া হয়ে গেলে তুমি খাবে কী? কা তব কান্তা নয়–কা তব পন্থা হবে তখন?
যে অর্থপ্লাবন ধেয়ে এল ভুট্টো ব্যাঙ্কের দিকে, কোথায় লাগে তার কাছে হিমাদ্রি শৃঙ্গ থেকে নেবে আসা পঞ্চনদের বন্যা!
এখানে হিটলারের সঙ্গে ভুট্টোর একটা সাদৃশ্য আছে। এদিকে হিটলারের পার্টির নাম ওয়ার্কারস্ পার্টি, ওদিকে কড়ি ঢালল কলোনের যক্ষ ব্যাঙ্কাররা! ওয়ার্কারসদের বুঝিয়েছেন, তোমাদের বাঁচাব ধনপতিদের শোষণ থেকে, আর ধনপতিদের সমঝালেন, তোমাদের বাঁচাব শ্রমিকদের ইউনিয়ন-নামক নুইসেন্স্ থেকে। ভুট্টো কী দিয়ে না-পাক ধনপতিদের বাগালেন সে তো বলেছি, তাঁর পিপলস পার্টির পিপলকে বোঝালেন হুবহু হিটলারি কায়দায় গরম গরম লেকচার ঝেড়ে! পিপলকে অবহেলা করা চলে না, কারণ তার পার্টি-ইষ্টমন্ত্র।
ইসলাম আমাদের ধর্ম।
গণতন্ত্র আমাদের রাষ্ট্রনীতি।
সমাজতন্ত্র আমাদের অর্থনীতি।
সর্বপ্রভুত্ব জনগণের।
হায় রে পূর্ব বাংলার জনগণ।
ব্যুরোক্রেটদের বললেন, ইংরেজ আইসিএসের চেয়েও রাজার হালে আছ পূর্ব পাকে। পশ্চিম পাকের কড়িটাও আসে পুব পাক থেকে। বাঙালরা অটনমি পেলে যাবে কোথায়?
আর্মিকে শুধোলেন, তোমাদের সৌরী-সেনীয় শ্বেতহস্তীর মিলিটারি বাজেটের টাকাটা যে পুবালি চিড়িয়া সোনার ডিম পেড়ে সামলায় তার যে উড়ু উড়ুক্কু ভাব! সে পালালে পট্টি মারবে কী দিয়ে?
এবং এদের আরও মোলায়েম করার জন্য তাদের পদপ্রান্তে রাখলেন পঞ্চমকারের বহিয়া বঢ়হিয়া সওগাত। ধনপতিগণ প্রসাদাৎ পূর্বলব্ধ অর্থদ্বারা।
ঝাড়া আঠারোটি মাস ভুট্টো করলেন এই তপস্যা। এবারে অ্যার মার্শাল নূর (= জ্যোতি)-এর রহস্যান্ধকারময় বঙ্কিম প্রশ্নের উপর সরল জ্যোতি বর্ষিত হল।
তপস্যান্তে যক্ষ রক্ষ গুপ্ত সমন্বিত ত্রিমূর্তি বদ্ধমুষ্টিতে ধারণ করে তিনি বেরুলেন জয়যাত্রায়।
যে সম্প্রদায় মনে করেন বাংলাদেশকে ক্রুশে চড়াবার চড়ক-বাদ্যে ইয়েহিয়া মূল গায়েন নন তিনি মাত্র দোহার, বিলিতি বাদ্যে সেকন্ড ফিড় তারা বলেন ভুট্টো যখন আজ হেথায় ব্যুরোক্রেট হুতোমদের ব্যানকুয়েট খাওয়াচ্ছেন, কাল হোথায় জাদরেল কর্নেলদের নৃত্য সম্বলিত ককটেল পার্টি দিচ্ছেন, পরশু খোঁজা-বোরো-মেমন ধনপতিদের গোপন জলসাতে তার পিপলস পার্টি পিপলদের কুরবানি দিচ্ছেন যক্ষদের দরগাহতে–ইয়েহিয়া তখনও এসব পূজা-আচ্চা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীন। কারণ এসব গুণীনদের মতে ইয়েহিয়ার তখনও সঙ্কল্প আওয়ামী লীগকে তার ন্যায্য প্রাপ্য যথাসময়ে দিয়ে দেবেন। অর্থাৎ কূটনৈতিক ভুবনে তার তরে তখন গভীর নিস্তব্ধ তৃতীয় যান। তিনি গভীর নিদ্রায় সুষুপ্ত চতুর্দিকে অবশ্য হুরী পরীরা তাঁর সেবাতে লিপ্ত।
এহেন সময়ে ভুট্টো দেবের আবির্ভাব।
.
সংখ্যালঘুর অনধিকারমত্ততা
জেনারেল কল-এর পুস্তকখানি প্রধানত রণনীতি সম্বন্ধে। তাই সেখানে রাজনীতির উল্লেখ কম– নিতান্ত যেটুকু পটভূমি হিসেবে বলতেই হয়, আছে মাত্র সেইটুকু। কারণ রণপণ্ডিত ক্লাউজেভিৎস তার প্রামাণিক গ্রন্থে বলেছেন, পলিটিকস যখন আর এগোতে না পেরে অন্য বস্তুর সাহায্যে এগিয়ে চলে তখনই তার নাম যুদ্ধ।
কল বললেন ইয়েহিয়া-মুজিবে মিলে গণতন্ত্রের যে কচি কোমল চারাটি পুঁতলেন সেটাকে উপড়ে ফেললেন ভুট্টো। তিনি তখন পশ্চিমা সেনাবাহিনীর আদরের দুলাল। তার আপন ক্ষমতার নেশা তখন মাথায় চড়েছে। তিনি এখন আর এসেম্বলিতে বিরোধী দলের পাণ্ডা সেজে মুজিব মূল গায়েনের পিছনে পিছনে দোহার গাইতে রাজি নন।
