সর্বশেষে, প্রকাশ থাকে যে ইয়েহিয়ার চেলাচামুণ্ডা টিক্কা নিয়াজি, এস্তেক তেনার এক ভাড়ের ইয়ার মিস্টার ভুট্টো জগঝম্পসহ হুহুঙ্কারে যেটিকে ঘোষণা করতেন সর্বপ্রথম ঠিক ২৫ মার্চ তারিখে, দু-বৎসর পূর্বে ১৯৬৯ সালে আইয়ুবের স্থলে কাফির নিধনাৰ্থে কল্কিরূপে ইসলামাবাদ সিংহাসন আরোহণ করেন শিয়া পোপ ইয়েহিয়া। অকৃপণ প্রসাদপ্রাপ্ত ওয়াকিফহাল মহল আজও সে মহালগনের স্মরণে বলেন, সেদিন পাক ইসলামাবাদে যে পাকনাপাকাতীত শ্যামপেন বুদ্বুদ উত্থিত হয়ে আসমান-জমিন ত-র-র-র করে দিয়েছিল তারই ফলে রাওয়ালপিণ্ডির আবহাওয়া দফতর সবিস্ময়ে প্রচার করে যে নর্মাল ১০% থেকে সে রাত্রে বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা ৯৯%-এ পৌঁছেছিল এবং পূর্বাভাসে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় যে আগামী চব্বিশ ঘণ্টার ভিতরে শ্যামপেন-বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। এটা অবশ্য ১৯৬৯-এর মার্চের কথা।
১৯৭১-এর ২৫ মার্চে কিন্তু ইয়েহিয়া খান যখন পিণ্ডি যাবার জন্য বেলা পাঁচটায় ঢাকা বিমানবন্দরে প্লেনে ওঠেন, তখন সে প্লেনের দরজা বন্ধ হতে না হতেই প্লেন টেক্-অফের কড়া কানুন হেলা-ভরে উপেক্ষা করে অ্যার হোসটেস প্রেসিডেন্টের হাতে তুলে দিলেন হুইস্কি সোডা। ঝটপট দ্বিতীয়টা। এবারে শ্যামপেন নয়। সে সুধা মোলায়েম। এবারে রুদ্রাগ্নি হুইস্কি।
শুনেছি, রোম ভস্মীভূত করার আদেশ দেবার সময় নিরোর এক হাতে ছিল বেহালা অন্য হস্তের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ পদনিম্নের ভূমির দিকে অবনত করে প্রচলিত রুদ্রমুদ্রা দেখান, যার অর্থ ভস্মীভূত কর রোম!
কিন্তু এখন যেটা বলছি সেটা শোনা কথা নয়। নিরেট সত্য।
ইয়েহিয়ার এক হাতে ছিল হারাম শরাব, অন্য হাত দিয়ে কৃতান্ত মুদ্রা দেখালেন জল্লাদকে কল-ই-আম্ চালাও বাঙ্গালমে। সট দেম আউট।
কোথায় গেল শোকাশ্রুসিক্ত মহরমের অশৌচ, কোথায় গেল ধর্মের বিধিনিষেধ? হে হবু পলিটিশিয়ান, শিখে নাও তবে দক্ষযজ্ঞের উচাটন মন্ত্রারম্ভের পূর্বে ইয়েহিয়ার নর্ম ললিতা গীতি।
বিধিবিধানের শীত-পরিধান
ফাগুন আগুনে দহন কর
বিহঙ্গযানে মোরা দুই জান্
ফাগুন আগুন দহন কর।
ইরানের শীতকালে প্রকৃতি অতিশয় অকরুণ– অসংখ্য প্রাণী মৃত্যুবরণ করে। তাই ধর্মের বিধিবিধানকে দুর্বিষহ শীতবস্ত্রের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। তার পর আসে নবজীবনদায়িনী ফাগুন আগুন। তাই নিবন্ধারম্ভে চিন্তা করেই বলেছি, মধু ঋতুতে বাংলাদেশকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়।
বাংলাদেশের ৯৯% নরনারীর দৃঢ়বিশ্বাস এই কুশপর্বের কাঁপালিক ইয়েহিয়া এবং তার মিলিটারি জুন্টা। পাকিস্তানের ওয়াকিফহাল মহলের এক নাতিবৃহৎ অংশ ভিন্নমত পোষণ করেন।
নিরপেক্ষ জনৈক ভারতীয় চিন্তাশীল সেনাপতি গত এপ্রিলে পরলোকগত লেফটেনেন্ট জেনরেল ব. ম. কল (B, M. Kaul) সদ্যোক্ত ওয়াকিফহালদের মতোই ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন জুলাই ১৯৭১-এ প্রকাশিত তাঁর উত্তম গ্রন্থ কনটেশন উইদ পাকিস্তান-এ। পিণ্ডি ইসলামাবাদের মিলিটারি জুন্টার বহু সিনিয়ারতম শিকরে পাখিকে তিনি অতি ঘনিষ্ঠভাবে চেনেন। তিনি বলেন :
১৯৭০-এর গণনির্বাচনের পর একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র থেকে জানা গেল শেখ মুজিব এবং ইয়েহিয়া খানের মধ্যেই এই মর্মে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা হয়ে গিয়েছে যে, শেখ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পদ গ্রহণ করবেন এবং ইয়েহিয়া পূর্বের ন্যায় প্রেসিডেন্ট থাকবেন।
সেনাপতি কল তার পর বলছেন, কিন্তু যখন এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, তখন দুই নেতার কেউই ভুট্টোর দুষ্ট চক্রান্ত করার সামর্থ্য যে কতখানি সেটা হিসাবে ধরেননি (মেক এলাওয়েনস্ ফর দি মিস-চিফ-মেকিং কেপাসিটি অব ভুট্টো।)
কী সে মিসচিফ বা নষ্টামি? তার পটভূমি কী?
গণনির্বাচনের প্রায় দুই মাস পূর্বে, অক্টোবর ১৯৭০ সালেই পশ্চিম পাকবাসী অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তান অ্যারফর্সের প্রধান, অ্যার মার্শাল নূর খান লাহোরের নিকটে এক জনসভায় বলেন, মি. ভুট্টো দীর্ঘকাল ধরে সরকারি মহলের সঙ্গে দহরম মহরম জমিয়ে এখন চেষ্টা করছেন পাকিস্তানে যেন ডিক্টেটরি শাসন কায়েম থাকে এবং চালবাজি মারফত তিনি যাতে করে খিড়কির দরজা দিয়ে ক্ষমতা লাভ করে ফেলেন। একদম খাঁটি কথা। কিন্তু এর পর নূর খান যে প্রশ্ন শুধোচ্ছেন সেটির দিকে আমি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।
ভূতপ্রাপ্ত এক ডিক্টেটরের এই শাগরেদ ভুট্টো যবে থেকে তার প্রভুকে গুত্তা মেরে নর্দমায় ফেলে দেওয়া হল সেই থেকে নাগাড়ে ঝাড়া আঠারোটি মাস ইয়েহিয়া শাসনের সবকিছু ধৈর্যসহ বরদাস্ত করার পর এখন আচমকা কেন আর কুছতি বরদাস্ত করতে চাইছেন না? এ প্রশ্ন শুধোবেন যে কোনও স্থিতধী জন।
নূর এ-প্রশ্নের উত্তর জানতেন।
আমরাও কিছুটা জানি।
আইয়ুবের পতনের পর এক পশ্চিম পাকি কাষ্ঠরসিক ঠোঁট-কাটা মন্তব্য করেন, বহুবার কোটিপতি, সার্ডিনিয়ার গোপন গহ্বর ধনপতি আলিবাবা তো গেল, কিন্তু চল্লিশটে চোর রেখে গেল যে। এরা ছড়িয়ে আছেন সর্বত্র। ব্যুরোক্রেট ব্যাঙ্কপতি সদাগর ইত্যাদি করে করে খুদ আর্মি তক্। এই গেল পয়লা নম্বর।
দোসরা : সর্বদেশপ্রেমী দ্বারা অভিশপ্ত বাইশটি শোষক পরিবার।
হরেদরে গলাজল হয়ে একুনে দাঁড়ায় কিন্তু এক বিকট ত্রিমূর্তি।
যজ্ঞ (ধনপতি- বিশেষ করে সেই ২২), রক্ষ (আর্মি) এবং চিত্রগুপ্ত (আমরা পাল)।
