এবং বিজ্ঞজন মৃদু হাস্য করে বলেন, তড়িঘড়ি মামেলা খতম করাই যদি সবচাইতে ভালো কায়দা হত তবে (বাইবেলে) সদাপ্রভু সৃষ্টি নির্মাণে পুরো ছটি দিন খর্চা করলেন কেন? তিনি তো আঁখির এক পলকে শতলক্ষ গুণে বৃহত্তর লক্ষ কোটি সৃষ্টি নির্মাণ করতে পারতেন।
কিন্তু প্রবাদ, ঐতিহাসিক নজির, গুণীজনের জ্ঞানগর্ভ উপদেশবাণীর ওপর নির্ভর করেই তো জননেতা সবসময় আপন পথ বেছে নেন না। তবে এ স্থলে আমরা একটি উত্তম কাব্য-কমপাস পাচ্ছি।
যাকে বলে ডে টু ডে পলিটিকস, তার কোনও গাইড-বুক শেখ-গুরু কবিগুরু রেখে যাননি। তবে যখন চিরন্তন রাষ্ট্রনীতিতে বাহুর দম্ভ, ক্রুদ্ধ প্রভু, রাজার প্রতাপ চিৎকার করে। দুঃখ দেবার বড়াই করে তখন তিনি তাঁর সর্বাগ্রজ দ্বিজেন্দ্রনাথের পৌত্র, তাঁর গানের ভাণ্ডারী দিনেন্দ্রনাথকে বেঙ্গল অর্ডিনেনসের জুলুম মদোন্মত্ত জনের আস্ফালনের মতো কত যে হেয়-বিড়ম্বিত ক্ষণস্থায়ী, পক্ষান্তরে সত্য যে নিত্যকালের সোনার রঙের লিখা তিলক ধারণ করে আছেন সে বাণী ছন্দে প্রকাশ করে বলেন :
জানি, তুমি বলবে আমায়
থামো একটুখানি,
বেণুবীণার লগ্ন এ নয়,
শিকল ঝমঝমানি।
শুনে আমি রাগবো মনে,
করো না সেই ভয়,
সময় আমার কাছে বলেই
এখন সময় নয়।
তাই দেখতে পাই,
সময়েরে ছিনিয়ে নিলে
হয় সে অসময়
ক্রুদ্ধ প্রভুর সয় না সবুর
প্রেমের সবুর সয়।
রাজপ্রতাপের দম্ভ সে তো
এক দমকের বায়ু
সবুর করতে পারে এমন
নাই তো তাহার আয়ু।
ধৈর্য বীর্য ক্ষমা দয়া
ন্যায়ের বেড়া টুটে
লোভের ক্ষোভের ক্রোধের তাড়ায়
বেড়ায় ছুটে ছুটে।
ইয়েহিয়া আর তার জুন্টা জানে পুব বাঙলায় তাদের আয়ু প্রায় শেষ,
আজ আছে কাল নাই বলে তাই
তাড়াতাড়ির তালে
কড়া মেজাজ দাপিয়ে বেড়ায়
বাড়াবাড়ির চালে!
পাকা রাস্তা বানিয়ে বসে
দুঃখীর বুক জুড়ি*
ভগবানের ব্যথার পরে
হাঁকায় সে চার-ঘুড়ি।
[*এ যেন ভবিষ্যৎদ্রষ্টা ঋষির বাণী : ঢাকার রাস্তায় নিরীহজনের বুকের উপর দিয়ে পিশাচপাল ট্রাঙ্ক চালাবে।]
পুব বাঙলার লোকের সঙ্গে তারা তো কখনও মৈত্রীর ডোর বাঁধতে চায়নি, তারা চেয়েছিল পলে পলে তিলে তিলে রক্তশোষণ করতে :
তাই তো প্রেমের মাল্যগাঁথার
নাইকো অবকাশ।
হাতকড়ারই কড়াক্কড়ি,
— দড়াদড়ির ফাঁস।
রক্ত রঙের ফসল ফলে।
তাড়াতাড়ির বীজে,
বিনাশ তারে আপন গোলায়
বোঝাই করে নিজে।
কাণ্ড দেখে পশুপক্ষী।
ফুকরে ওঠে ভয়ে,
অনন্তদেব শান্ত থাকেন,
ক্ষণিক অপচয়ে।
আদি কবি বাল্মীকি রাবণের রাক্ষস-রাজ্যের বীভৎসতা মূর্তমান করার জন্য কাব্যলোকের প্রথম প্রভাতে কাঠবেড়ালি মোতিফ অবতারণা করেছিলেন, কবিগুরু তাই সেই পন্থায় চললেন রাজেন্দ্রসঙ্গমে।
কোনও প্রয়োজন ছিল না, কিন্তু আত্মপ্রত্যয় যার আছে সে আত্মসংযম করতেও জানে বলে, শেখজি একমাস সময় দিলেন ইয়েহিয়াকে। একমাস পরে ডাকো এসেমব্লির অধিবেশন।
.
যক্ষ রক্ষ গুপ্ত
এইবারে সেই বিষয়টির অবতারণা করতে হয় যেটি নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ আমরা পাইনি।
কোনও সন্দেহ নেই, ভবিষ্যকালের ঐতিহাসিকরা দুই দলে বিভক্ত হয়ে এই গুরুতর বিষয়টি নিয়ে বিস্তর মাথা-ফাটাফাটি করবেন। খ্রিস্টকে ক্রুশবিদ্ধ করার জন্য ইহুদিরা দায়ী, না অন্য কেউ, সে নিয়ে যেরকম দু হাজার বছর ধরে শব্দার্থে প্রাচ্যে-প্রতীচ্যে পণ্ডিতে পণ্ডিতে অকৃপণ মাথা-ফাটাফাটি হয়েছে এবং হবে, তথা পরোক্ষভাবে হিটলারের গ্যাস চেম্বার নির্মাণে যার পরিণাম। এস্থলে সমস্যা, একাত্তরের মধু ঋতুতে বাংলাদেশকে ক্রুশবিদ্ধ করার জন্য দায়ী কে? এস্থলে লক্ষণীয় প্রায় ওই একই ঋতুতে খ্রিস্টকে হত্যা করা হয়। এবং চরম লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশটাকে জবাই করা হয় মহরম মাসে যে মাসে তেরশো বছর পূর্বে, হজরত ইমাম হুসেনকে ইয়েজিদের জল্লাদরা কারবালাতে জবাই করে। বস্তৃত আমার আচারনিষ্ঠ ছোটবোনকে ২৫ মার্চের উল্লেখ করতে বললে, আমাদের মধ্যে তখন বলাবলি হয়েছিল, ইয়েহিয়া শিয়া। শিয়ারা আপ্রাণ চেষ্টা দেয় পাক মহরমের চাদে যেন কোনওপ্রকারের অপকর্ম, গুনাহ না করে আর ইয়েহিয়া শিয়া হয়ে এই পবিত্র মাসেই যে কবিরা গুনাহ। (মহাপাপ) করলেন সেটা যে সুন্নি ইয়েজিদকেও নৃশংসতায় ছাড়িয়ে গেল।
অবশ্য সে সময়ে সামান্যতম মুষ্টিমেয় বাঙলাবাসী জানত যে ইয়েহিয়া শিয়া এবং ভিতরে ভিতরে কট্টরতম শিয়া।
কিন্তু ৭১-এর মার্চে ওই বৎসর সূর্য ও চন্দ্রের এক বিপরীত যোগাযোগের ফলে উভয়ের মধ্যে এক সংঘর্ষ উপস্থিত হয়। সে সংঘাতের কাহিনী অতি সংক্ষেপে এই :
ধর্মকর্মের পালপার্বণ, তাবৎ অনুষ্ঠান ইরান-তুর্কমান মাত্রই চান্দ্রমাস পঞ্জিকা অনুযায়ী সুন্নিদের মতোই পালন করে। কিন্তু নিত্যদিনের মৃত লবণ তৈল তণ্ডুল বস্ত্র ইন্ধন সমস্যার সমাধান করে সৌর গণনা অনুসারে। ফলে চান্দ্রমাস, শোকাশ্রুসিক্ত মহরম, বছর তিরিশেকের মধ্যে একবার না একবার মোটামুটি একই সময়ে হাজির হবেন ইরানিদের জাতীয়, দ্বিসহস্র বৎসরাধিক কালের ঐতিহ্য-সম্বলিত নওরোজ = নববর্ষ পর্বের সময়। সেটা আসে মোটামুটি ২১ মার্চ নাগাদ। সেদিন ইরান তুরানে যা আনন্দোৎসব হয় তার সঙ্গে বড়দিন বা হোলি পাল্লা দিতে পারে না। বিশেষ করে তামাম দেশটা জুড়ে সেদিন যে শরাবের বান জাগে তার মুখে দাঁড়ায় কোন পরবের সাধ্যি!
