এ সখী-সংবাদ পড়ে যে কোনও গৌড়ীয় বৈষ্ণবজন উদ্বাহু হয়ে নৃত্য করবেন। তাই বলা একান্তই নিষ্প্রয়োজন যে পুর্ব বাঙলার লোক তখন উল্লাসে আত্মহারা। দু-শো বছরের পরাধীনতা শেষ হতে চলল। জয় বাংলা, জয় আওয়ামী লীগ।
এই উদ্দাম আনন্দনৃত্য দেখে কেমন যেন মনে হয়, আওয়ামী লীগের কর্তাব্যক্তিরা যেন ঈষৎ বিচলিত হন। তারা তো রাতারাতি ভুলে যাননি, পশ্চিম পাকের শকুনি মামারা কী প্রকারে শের-ই-বাংলা ফজলুল হককে পর্যন্ত বিড়ম্বিত করেছে। আর আজ? হঠাৎ
পরবর্তীকালে এটা পরিষ্কার হল। ইয়েহিয়া পঁচিশে মার্চ তার মুখোশ খুলে উৎকট প্রেতনৃত্য আরম্ভ করার পর যে বাংলাদেশ সরকার নির্মিত হল তার প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দীন আহমদ সেদিনই, ১৭ এপ্রিল এক প্রেস কনফারেনসে ইয়েহিয়া-মুজিব ভেট বাবদে যা বলেন তার একাংশের মোটামুটি সারমর্ম এই :
লীগের ছয় দফা বাবদে ইয়েহিয়ার যে বিশেষ কোনও গুরুতর আপত্তি আছে তার আভাসও তিনি দেননি। লীগ কিন্তু প্রত্যাশা করেছিল, (ছ-দফাতে ইয়েহিয়া যখন কোনও আপত্তি তুলছেন না, এবং এই ছ-দফার ভিত্তির ওপরই লীগ অ্যাসেমব্লিতে পাকিস্তানের নতুন সংবিধান নির্মাণ করবেন তখন) ইয়েহিয়া ভবিষ্যৎ সংবিধানের স্বরূপ সম্বন্ধে আপন ধারণা প্রকাশ করবেন। তা না করে তিনি শুধু ইচ্ছা প্রকাশ করলেন লীগ যেন ভুট্টোর পার্টির সঙ্গে একটা সমঝোতা করে নেয়।
তাজউদ্দীন সাহেবের এই বিবৃতিটি উল্লেখযোগ্য। ভবিষ্যৎ যুগের ঐতিহাসিকরা স্থির করবেন, হে আওয়ামী লীগ, ভুট্টোর সঙ্গে একটা সমঝোতা কর-ইয়েহিয়ার এই নির্দেশের মধ্যে তোমারে মারিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে-র মারণাস্ত্রটা লুকিয়ে রেখে গেলেন কি না?
কারণ মোটামুটি ওই সময়েই, খুব সম্ভব ১২ জানুয়ারি, জনৈক সাংবাদিক ইয়েহিয়াকে জিগ্যেস করেন, পুব পাকিস্তান যদি অ্যাসেমব্লিতে এমন একটা সংবিধান নির্মাণ করে সেটা পশ্চিম পাকিস্তানের কাছে গ্রহণযোগ্য বলে মনে না হয় তবে ইয়েহিয়া কি সে সংবিধানে সম্মতি দেবেন? ইয়েহিয়া উত্তরে বলেন, এটা একটা কাল্পনিক (হাইপথেটিকাল) প্রশ্ন; এর উত্তর তিনি দেবেন না।
মোটেই হাইপথেটিকাল প্রশ্ন নয়।
আজ যদি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে কেউ প্রশ্ন শুধোয়, কাল যদি রাশা বিনা নোটিশে ব্রিটেন আক্রমণ করে তবে প্রধানমন্ত্রী তার জন্য কোন কোন প্রস্তুতি কী কী ব্যবস্থা অবলম্বন করেছেন তবে প্রধানমন্ত্রী স্মিতহাস্য সহকারে বলবেন, এটা কাল্পনিক প্রশ্ন; কারণ বিশ্বসংসার জানে, রাশার সঙ্গে ব্রিটেনের এমন কোনও দুর্বার শক্রতা হঠাৎ গজিয়ে ওঠেনি, বা রাশার কি দোস্ত কি দুশমন কেউই হালফিল ঘুণাক্ষরে একথা বলেননি যে রাশা গোপনে গোপনে এমনই প্রস্তুতি করেছে যে দু একদিনের ভিতর বিলেতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। অতএব এ প্রশ্নটা অবাস্তব হাইপথেটিকাল।
কারণ যদিও মি. ভুট্টো তখন পর্যন্ত তাঁর সবকটা রঙের তাস টেবিলের উপর বিছিয়ে দিয়ে হুমকি ছাড়েননি যে যারা অ্যাসেমব্লিতে যাবে তিনি তাদের ঠ্যাং ভেঙে দেবেন তথাপি কোনও রাজনৈতিক, বিশেষ করে ইয়েহিয়া জানতেন না যে ভুট্টো আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তীব্রতম বৈরীভাব অবলম্বন করেছেন? নইলে স্বয়ং ইয়েহিয়াই বা কেন ওই সময়েই লীগকে নির্দেশ দিতে গেলেন, ভুট্টোর সঙ্গে একটা ফয়সালা করে নিতে? তা হলে পূর্বোক্ত প্রশ্নটি হাইপথেটিকাল আকাশকুসুম গোত্র লাভ করল কী করে?
তবু যদি ইয়েহিয়া জেদ ধরে বলেন, না, তিনি ভুট্টোর কোনও বৈরীভাবের কথা জানেন না, তা হলে তো জনাব তাজ অনায়াসে বলতে পারেন, তবে তো হুজুরের নির্দেশ একদম খাঁটি হাইপথেটিকাল নির্দেশ। আপনি যখন বলতে পারবেন না, ভুট্টো দুশমনির অমুক অমুক স্টেপ নিয়েছেন (পূর্বের উদাহরণ অনুযায়ী কেউ যখন আদৌ কোনও খবর পায়নি যে রাশা কাল ব্রিটেন আক্রমণ করবে) তা হলে আমরা, মেজরিটি পার্টি অযথা কান-না-লেনেওয়ালা চিলের পিছনে ছুটে ছুটে শেষটায় মিনরিটির হাওয়াই কোমরে রশি বাঁধতে যাব কোন হাইপথেটিকাল ত্রাসের তাড়নায়? ও করে কাল আমার চারখানা হাতও গজাবে না, তার জন্য আজ চারখানা দস্তানাও কিনব না।
.
ওদিকে বাংলাদেশের যুব-সমাজ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে বিশেষ করে যখন বার বার প্রশ্ন করা সত্ত্বেও ইয়েহিয়া ঢাকাতে কখন অ্যাসেমব্লি ডাকবেন সে সম্বন্ধে কোনও উত্তর দিতে কিছুতেই সম্মত হলেন না। ওদের বক্তব্য তাদের ছয় পয়েন্টের বিরুদ্ধে ইয়েহিয়া যখন কোনও আপত্তি তোলেননি– আর এ-খ-ন তুললেই বা কী— তবে অ্যাসেমব্লি ডাকতে এত দেরি হচ্ছে কেন?
যুগ যুগ ধরে ইতিহাসে বার বার এ ঘটনা ঘটেছে। জনতা অসহিষ্ণু; নেতারা দেখছেন, আঘাত করার মতো সময় এখন আসেনি। বিকল্পে : নেতা আহ্বান করছেন, ওঠো, জাগো; জনতা তন্দ্রাচ্ছন্ন।
মূল কথা, মূল তত্ত্ব টাইমিং। বহু ক্ষেত্রে পরবর্তীকালে পরিষ্কার ধরা পড়ে, সমস্ত পরিকল্পনাটা ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল টাইমিঙের গোলমালে।
ইংরাজিতে তাই বলে :
লোহা গনগনে থাকতে থাকতেই মারো হাতুড়ির ঘা।
সংস্কৃত সুভাষিত বলে :
যৌবন থাকতেই কর বিয়ে। পিত্তি চটিয়ে খেয়ো না।
কিন্তু যে নেতার মনে দৃঢ় প্রত্যয় আছে যে তার কাছে অগ্নি নির্মাণের যথেষ্ট সামগ্রী সঞ্চিত আছে, যদৃচ্ছ লৌহখণ্ডকে তপ্তাতিতপ্ত করতে পারেন তার তনুহূর্তেই হাতুড়ির আঘাত হানবার কী প্রয়োজন?
