সন্দেহপিচাশ পাঠক এস্থলে আপত্তি জানিয়ে বলবে, এ-ও কখনও হয়? ঢাকাতে তাঁর লোক-লশকর গিসগিস করছে। কমপক্ষে ষাট হাজার খাস পশ্চিম পাকের সেপাই রয়েছে। সর্বোপরি টিক্কা খানের পাক্কা পাহারা।
ঘড়েল সবজান্তা : ওইখানেই তো সরল রহস্য। এত শতের মধ্যেখান থেকে। যদি ইয়েহিয়া হাওয়া হয়ে যান তবে সন্দেহটা অর্সাবে সর্বপ্রথম এবং একমাত্র মিলিটারি জুন্টার ওপর। ওরা মুজিবের সঙ্গে ইয়েহিয়ার ঢলাঢলিতে তখন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। মার্চের পয়লা থেকে পঁচিশ অবধি পূর্ব পাকের রাজা ছিল কে? ইয়েহিয়া, না টিক্কা না– রাজা তখন কে? মুজিব।
কিন্তু বৃথা তর্ক। মোদ্দা কথা এই, পশ্চিম পাকের লোক ইয়েহিয়ার রহস্য-লহরি সিরিজের নবতম অবদান বিশ্বাস করেছিল।
বস্তুত ব্যাপারটা ছিল ঠিক উল্টো। প্লট করা হয়েছিল ২৫ মার্চ সন্ধ্যার পর মুজিব-ভুট্টোতে মোলাকাত হবে আলাপ-আলোচনার জন্য। পরদিন ২৬ মার্চ সকালে তারা দু জন যাবেন গভর্নর ভবনে ইয়েহিয়ার সঙ্গে সে আলোচনার ফলাফল জানাতে। ভুট্টোর শকুনি মামা মি. Khar* নানা অজুহাতে শেখকে রাজি করাবেন, এবারের (শেষবারের মতো?) তিনি যেন ভুট্টোর আস্তানা ইন্টেরকন্টিনেনটলে আসেন। পথমধ্যে টিক্কার গেরিল্লা স্কোয়াডের গুপ্তঘাতকরা তাকে খুন করবে। ওদিকে ইয়েহিয়া বেলা পাঁচটায় সঙ্গোপনে প্লেনে উড়বেন করাচি বাগে। যদি প্ল্যানটা উৎরে যায় তবে ইয়েহিয়ার নিষ্ক্রমণক্ষণ সাড়ম্বরে প্রচার করে তাঁর জন্য নিরঙ্ক এলিবাই স্থাপনা করা যাবে। ওদিকে বলা হবে মুজিব-বিরোধী কোনও রাজনৈতিক দল তাকে খুন করেছে।
[*শব্দটার উচ্চারণ যদি খার হয় তবে অর্থ কাঁটা; যদি খ হয় তবে অর্থ গর্দভ। বাংলা খড় হওয়ার সম্ভাবনা কম।]
এ প্ল্যান তো খাঁটি হিটলারি প্ল্যানের ঝাঁ চকচকে পয়লা কার্বন কপি।
গ্যোরিং হিটলারে মিলে পোড়ালেন রাইষসটাগ। পুরো দোষটা চাপালেন কমুনিস্টদের স্কন্ধে।
গ্যোরিং হিটলার হিমলারে মিলে রোম, এনসট আর্দি, ব্রাউনশার্টকে করলেন খতম। প্রচার করলেন ব্রাউন শার্টরা সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র করেছিল, হিটলার এবং নাৎসি পার্টিকে খতম করে চতুর্থ রাইষ প্রতিষ্ঠা করার।
তবে কিজিলবাশ দারওয়ান আর অস্ট্রিয়ান করপরলে পার্থক্য কোথায়? করপরল হিটলার দুশমনকে ঘায়েল করে, তার পর কেচ্ছা রটায়। দারওয়ান সেটা আদৌ করে উঠতে পারেনি। কেন? কারণ সে প্রোমোশন পেয়ে ডিকটেটর হয়। ক্লিনার যেরকম প্রোমোশন পেয়ে হ্যাঁন্ডিমেন হয়। আইয়ুবের শূন্য গদিতে জুন্টা তাকে প্রোমোশন দিয়ে ডিকটেটর বানিয়েছিল। হিটলার, মুসোলিনি, স্তালিন বিস্তর যুঝে, প্রচুর আত্মত্যাগ করে, মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে তবে তারা ডিকটেটর হয়েছিল। আর্ম-চেয়ার পলিশিয়ানের মতো ইয়েহিয়া আর্ম-চেয়ার ডিকটেটর। কদু কুমড়ার কুরবানি হয় না।
ভেজাল, ভেজাল, কুল্লে মাল ভেজাল। ইয়েহিয়া ভেজাল হিটলার, টিক্কা ভেজাল হিমলার, পিরজাদা ভেজাল গ্যোরিং।
কিন্তু কি ভেজাল কি খাঁটি মাল এদের পরমাগতি একই;
ওই হেরো, ঘৃণ্য শব
পাপাচারী দুরাত্মার
রোস্ট করে শয়তান
খাবে তার গোস্তের ডিনার!
Here lies the carcass
of a cursed sinner.
Doomed to be roasted
for the Devils dinner.
.
‘বীরের সবুর সয়।’
মহাড়ম্বরে প্রেসিডেন্ট ইয়েহিয়া খান ঢাকায় পৌঁছলেন।
শেখ সাহেব ইতোপূর্বেই প্রকাশ্যে একাধিকবার বলে রেখেছিলেন, প্রেসিডেন্ট পুব। বাঙলায় আসছেন সম্মানিত মেহমান রূপে।
কাজেই উভয়ের মধ্যে মতবিনিময় এবং ছয় দফা নিয়ে আলোচনা হার্দিক বাতাবরণের ভিতর দ্রুতগতিতে একদিনের ভিতর সুসম্পন্ন হল। এস্থলে স্মরণ রাখা ভালো যে এ মোলাকাতের প্রায় দু মাস পর ইয়েহিয়া যখন ফের শেখের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য ৮/৯ মার্চে ঢাকা আসেন তখন আলোচনার সময় লেগেছিল প্রায় ষোল দিন। পুরো পাক্কা পক্ষাধিক কাল। এই বৈষম্যের কারণটি অতি সরল। প্রথম ভেটে ইয়েহিয়ার উদ্দেশ্য ছিল শেখ মুজিবকে মাত্র একটি সরল ধাপ্পা দেওয়া : আমি আপনার ছয় দফা কর্মসূচিতে আপত্তিকর কিছুই দেখতে পাচ্ছিনে তবে কি না ভুট্টোর সঙ্গে… ইত্যাদি। অর্থাৎ আওয়ামী লীগকে ভুট্টোর সঙ্গে একটা ফয়সালা করে নিলে ভালো হয়।
এটা ১৩/১৪ জানুয়ারি ১৯৭১-এর ঘটনা।
১৪ তারিখে ইয়েহিয়া রওনা দিলেন পিণ্ডিপানে। ঢাকা অ্যারপোর্টে তিনি যে, খোলাখুলি দিলদরিয়া মেজাজে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথনে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটালেন তার একটুকরো– ভুট্টো সংক্রান্ত– পূর্বেই উল্লেখ করেছি। বাকির আরও কিছুটা এস্থলে কীর্তনীয়। যথা :
ইয়েহিয়া : শেখ সাহেব আমাদের আলোচনা সম্বন্ধে যা বলেছেন তা অক্ষরে অক্ষরে (এবসটলি) সত্য। তিনিই এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন।
জনৈক সাংবাদিক : আপনি এখন দেশের প্রেসিডেন্ট। শেখ মুজিবের সঙ্গে আপনার যে আলোচনা হল, সে সম্বন্ধে আপনার ধারণার কিছুটা আমরা শুনতে চাই।
ইয়েহিয়া : শেখ সাহেব যখন কর্মভার গ্রহণ করবেন (টেকস্ ওভার) আমি তখন থাকব না (আই উনট বি দ্যার)। শিগগিরই এটা তার গভর্নমেন্ট হবে।
জনৈক রিপোর্টার : শেখ মুজিব বলেছেন, আপনার সঙ্গে আলোচনা করে তিনি সন্তুষ্ট। আপনিও কি সন্তুষ্ট।
ইয়েহিয়া : হ্যাঁ।
