অবাঙালিদের জিঘাংসা চরমে উঠল। গণনির্বাচনে তাদের ইসলামি লিডারদের শোচনীয় পরাজয় তারা ভোলবার, ঢাকবার চেষ্টা করছে তাদের দম্ভ ঔদ্ধত্য চরমে চড়িয়ে, প্রকাশ্যে নিরীহ বাঙালিমাত্রকেই মৃত্যুভয় দেখাচ্ছে। উচ্চকণ্ঠে বলে বেড়াচ্ছে, দেখি তোমরা কী করে তোমাদের স্বায়ত্তশাসন পাও। মিলিটারি আমাদের পিছনে। তোমাদের ঠেঙিয়ে লম্বা করে ছাড়বে পয়লা, তার পর অন্য কথা। ওদেরই প্ররোচনায় ওনারাও তৈরি ছিলেন পশ্চিম পাকের একাধিক কাগজে শেখ সায়েবের প্রচুর কুৎসাসহ খবর বেরুতে লাগল– শেখ এমনই দম্ভী, ছলেবলে নির্বাচনে জয়লাভ করে এমনই উদ্ধত হয়েছে যে, সে বলে বেড়াচ্ছে যে, সে পশ্চিম পাকে তো আসবেই না, এমনকি আমাদের সদর-উস-সদর জিল্লা (এ দুনিয়ায় আল্লার ছায়া) সুলতান-ই-আজম (কাইদ-ই-আজম জিন্নার পদবি মিলিয়ে তিনি সর্বশক্তিমান সুলতান) নিতান্ত যদি কর্তব্যের দায়ে অখণ্ড পাকিস্তানের একখানা ডানা যাতে কাটা না যায় যে, ইসলাম ইন ডেনজার সে ইসলামকে ত্রাণ করতে এবং সর্বোপরি জান্-কা দুশমন ইন্ডিয়াকে প্রাণের ভয়ে থরহরি কম্পমান করার জন্য তিনি যদি সেই রদ্দি ওচা ঢাকা শহরে যান (আল্লাতালার অসীম করুণা যে সুবুদ্ধিমানের মতো অধুনা প্রলয়ঙ্কর বন্যাবিধ্বস্ত পুব পাকের না-পাক অঞ্চল তিনি পরিদর্শন করতে গিয়ে তার দূষিত বায়ু এবং বিষাক্ত পানি সেবন করে অকালমৃত্যু বরণ করে শহিদ হননি), তবে নাকি ওই গুমরাহ শেখ তার পূর্ণেন্দু-বদন দর্শন করে অক্ষয় বেহেশত হাসিল করার জন্য জনাব ইয়েহিয়ার বাসস্থল লাটভবনে যাবে না। সে বলেছে, প্রেসিডেন্টকে তার বাড়িতে যেতে হবে, তবে সে কথা কইবে। ওয়াস্তাগফিরুল্লা!
মিথ্যা নিন্দা প্রচার করার নানাবিধ পন্থা বিশ্বের ইতিহাসে ভূরি ভূরি মেলে। এ যুগের দুই ওস্তাদ দুটি ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে যশস্বী হয়েছেন। একজন ড. গ্যোবেলস। তিনি ধূলিপরিমাণ সত্যকথা নিয়ে তার ওপর নির্মাণ করতেন অভ্রংলিহ অকাট্য মিথ্যার অ্যাফেল-স্তম্ভ। এক্ষেত্রেও তাই : গণনির্বাচনের পর থেকেই পশ্চিম পাকের সর্বত্র শেখের বিরুদ্ধে যেসব চক্রান্ত করা হয়েছিল তার থেকে অনুমান করা কঠিন নয় যে সেখানে যেতে তার অনিচ্ছা ছিল। ধরে নেওয়া যাক এটুকু সত্য, কিংবা তিনি সত্যই সেখানে যাবার অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তার ওপর মিথ্যা গড়ে তোলা কঠিন নয়, ইয়েহিয়া স্বয়ং যদি ঢাকা আসেন তবে শেখ তাঁর সঙ্গে আদৌ দেখা করবেন না। সে মিথ্যার ওপর আরেকটা মিথ্যা চাপানো মোটেই কঠিন নয়; ইয়েহিয়াকে শুধু-পায়ে দাঁতে কুটা কেটে যেতে হবে শেখ-ভবনে (এস্থলে দুই প্রকারের প্রোপাগান্ডা করা যায় (ক) জরাজীর্ণ জলঝড় দুর্গন্ধময় বস্তিঘরে খেতে হবে মহামহিম রাষ্ট্রপতিকে কিংবা (খ) প্রাসাদোপম রাজসিক বিরাট অট্টালিকা ভবনে–যেটা নির্মাণের অফুরন্ত ঐশ্বর্য তিনি পেয়েছেন ইন্দিরা-বিড়লার কাছ থেকে। শেষোক্ত অংশটি পশ্চিম পাকবাসীর জন্য : সেখান থেকে কে ঢাকায় এসে যাচাই করতে যাচ্ছে, সত্য কোন হিরন্ময় কিংবা মৃন্ময় পাত্রে লুক্কায়িত আছেন?
তাই বোধহয় কবি বায়রন গেয়েছিলেন :
শেষ হিসেবেতে তবে
মিথ্যাই বা কী?
মুখোশ পরিয়া সত্য
যবে দেয় ফাঁকি।
And, after all, what is a lier
Tis but
The truth in masquerade
পক্ষান্তরে হিটলার মারি তো হাতি পন্থায় বিশ্বাস করতেন। তাঁর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ মাইন কামপুফে তিনি বলেছেন :
ক্ষুদ্রাকার মিথ্যার চেয়ে বিরাট কলেবর মিথ্যাকে জনসাধারণ অনেক অনায়াসে মেনে নেয়।
তার আড়াই হাজার বছর পূর্বে রাষ্ট্রের স্বরূপ সম্বন্ধে আত্মচিন্তা করতে গিয়ে প্লাতো প্রশ্ন শুধোচ্ছেন, এমন একটা জাজ্বল্যমান মহৎ মিথ্যা কী কৌশলে নির্মাণ করা যায় না যেটা এমনই স্বতঃসিদ্ধ বলে মনে হবে যে সমাজের তাবজ্জন সেটা মেনে নেবে।
ইয়েহিয়া ডিকটেটর। হিটলারের তুলনায় যদিও তার উচ্চতা ব্যাঙের হাতে সাত হাত। তাই তিনি হিটলারি পন্থায় গণনিধন পর্ব আরম্ভ হওয়ার পর তার নীতির সাফাই গাইতে গিয়ে একাধিক কারণের সঙ্গে এটাও উল্লেখ করেন যে, তিনি ঢাকাতে থাকাকালীন শেখ মুজিব তাঁকে বন্দি করার চেষ্টা করেছিলেন। সাধারণজন এ বাক্যটি লেখার পর অতি অবশ্যই বিস্ময়বোধক চিহ্ন দেবেন। আমি দিইনি কারণ বুদ্ধিমান না হয়েও নিতান্ত যোগাযোগবশত আমি হিটলারি কায়দা-কেতার সঙ্গে সুপরিচিত। এমনকি এরকম একটা প্লীহাচমকানিয়া বম্বশেল ফাটানোর পর আরও এক কদম এগিয়ে গিয়ে ইয়েহিয়া যে আধুলি দামের টিকটিকির উপন্যাসকে টেক্কা মারার জন্য বলেননি, তার পর আওয়ামী লীগের কসাইরা আমাকে নিয়ে কী করত সেটার কল্পনাতেই আমার গা শিউরে উঠে; আমি অতিশয় বিশ্বস্তসূত্রে অবগত হই, শেখ ঢাকেশ্বরী মন্দিরে হিনড় গডেস-এর সামনে কিরে কেটেছে সে আপন আঙুল দিয়ে আমার চোখ দুটি ওপড়াবে, বেঙ্গলি উয়োমেনস মাছকাটার বিগ নাইফ দিয়ে আমার কলিজা বের করে গয়রহ, ইয়াল্লা আল্লা বাঁচানেওলা –এসব যে বলেননি তাতেও আমি বিস্মিত হইনি। কারণ আমি জানি, ইয়েহিয়া নিতান্তই একটা ছ্যামড়া ডিকটেটর, এবং সে-ও নির্জলা ভেজাল ডিকটেটর। হত হিটলার, হত মুসসোলিনি তবে জানত কী করে মিথ্যের পুরা-পাক্কা মনোয়ারি জাহাজ বোঝাই করতে হয়, আলিফ বে থেকে ইয়া ইয়ে তক।
