ঘটনাটি এইরূপ : পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে, নানাবিধ হাঁস, তন্মধ্যে ভুট্টো চিড়িয়া শিকার করার পর তিনি রওনা হলেন ঢাকা। এ সম্বন্ধে ভুট্টো মন্তব্য করেছেন, গণ-নির্বাচনের পর মুজিবকে বার বার আমন্ত্রণ জানানো সত্ত্বেও তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের কোথাও যেতে রাজি হননি। জনৈক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, গেলে ভালো হত। তিনি অতি অবশ্য সেখানে বিস্তর লোকের চিত্তজয় করতে সমর্থ হতেন ও ফলে ডবল জোরে ভুট্টো-ইয়েহিয়া-আঁতাৎ-এর মোকাবেলা করতে পারতেন। আমি নগণ্য প্রাণী, আমার মতের কিবা মূল্য! তবু বলি (আহা, বেড়ালটাও কাইজারের দিকে তাকাবার হক্ক ধরে) না গিয়ে ভালোই করেছেন। শেখ সাহেবেরও জান মাত্র একটি।
তা সে যাই হোক– শেখ-ইয়েহিয়া ভেটের পর পিণ্ডি প্রত্যাবর্তনের প্রাক্কালে ১৪ জানুয়ারি তারিখে, ঢাকা অ্যারপোর্টে সাতিশয় সদাশয় চিত্তে ইয়েহিয়া সাংবাদিকদের নানাবিধ প্রশ্নের দিল-দরিয়া উত্তর দিলেন।
তন্মধ্যে সেই ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ উত্তর আছে : শেখ মুজিবুর রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন।
এ উত্তরে কতখানি আন্তরিকতা ছিল বিচার করবে ইতিহাস! কিন্তু এহ বাহ্য।
এক সাংবাদিক শুধালেন, আপনি কি এবারে (দিস টাইম) মি. ভুট্টোর সঙ্গে দেখা করবেন? এই দিস টাইমটি পাঠক লক্ষ করবেন। যেন ইঙ্গিত রয়েছে, আমরা তো ভালো করেই জানি, একবার তার সঙ্গে আপনার কথাবর্তা হয়ে গিয়েছে। এখন যখন শেখ সায়েবকে প্রধানমন্ত্রী করবেন বলে মনস্থির করে ফেলেছেন, এ বারেও কি তার সঙ্গে দেখা করবেন?
উদার-হৃদয় ইয়েহিয়া বললেন আমি প্রত্যেক জনের সঙ্গে দেখা করি। তার (ভুট্টোর) সঙ্গে আমার অলরেডি একবার দেখা হয়ে গিয়েছে। আমি অত্যন্ত ক্লান্ত। আমি পাখি শিকার করতে যাচ্ছি সিন্ধু দেশে– ওটা ভুট্টোর এলাকায়। তিনি সেখানে থাকলে তার সঙ্গে দেখা হবে।
ন্যাকরা! তিনি সেখানে থাকলে–। ইয়েহিয়া তো ওয়াইলড ডাক খ্যাদাতে বেরুবেন না। এবং ভুট্টোও একদম সিটিং ডাক।
আগস্ট মাসে বই লেখার সময় ভুট্টো আশা করেছেন, ডিসেম্বরের ভেট লোকে স্মরণে না-ও আনতে পারে। এ বাবদে সর্বশেষ মন্তব্য এই করা যেতে পারে যে, ভুট্টো উকিল। তিনি জানেন, আসামি তার সাফাই গাইবার সময় এমন কিছু বলতে বাধ্য নয় যা তার বিরুদ্ধে যেতে পারে!
.
এ ধরনের বিস্তরে বিস্তরে সত্যগোপন, মিথ্যাভাষণ, গুজবের আড়াল থেকে কুৎসা রটনা অনেক কিছু আছে এই মহামূল্যবান ভুটাঙ্গ-পুরাণে। এবারের মতো শেষ একটি পেশ করি :
(শেখ মুজিবের) ছয় দফার নির্মাতা কে, সে নিয়ে প্রচুর কৌতূহল দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, আইয়ুব খানের ঘনিষ্ঠ কোনও বুরোক্রেট এই ফরমুলাটি বানিয়ে দেন (ফ্রেমড দ্য ফরমুলা)। উদ্দেশ্য ছিল, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণকে দুইভাগে বিভক্ত করে আইয়ুবকে বাঁচানো তথা জনগণের দৃষ্টি তাশখন্দ প্রহসন থেকে অন্যদিকে সরানো।
দুই পাকিস্তানকে লড়িয়ে দিয়ে ইয়েহিয়া গদিচ্যুত হলেন, আর আইয়ুব বাঁচতেন এই পন্থায়? এ যুক্তি শুধু উকিলের উর্বর মস্তিষ্কেই স্থান পেতে পারে!
এবং তার পর ভুট্টো বলছেন, একটা জনরব এখনও প্রচলিত আছে যে, ওই ছয় দফা মুশাবিদা করাতে একটা বিদেশি হাতও ছিল।
দুষ্টবুদ্ধি প্ররোচিত প্যাচালো দলিলের মুশাবিদা করার জন্য ঘড়েল নায়েব ঝানু উকিলের শরণাপন্ন হয়। আওয়ামী লীগের ছয় দফাতে আছে স্বাধীনতাকামী জনসাধারণের মৌলিক সরল দাবি। এর মুশাবিদা করতে পারলেন না জনাব তাজউদ্দীন বা রেহমান সুবহান? এই সাদামাটা দাবির কর্মসূচি তৈরি করার জন্য দরকার হল ফরেন হ্যান্ড! পেটের ভাত আর গায়ের কাপড় চাই এ কথা কটি তো গায়ের চাষাও জমিদারের সামনে আকছারই বলে– আপন সরল গাঁইয়া ভাষায়। তবে কি মি. ভুট্টো বলতে চান, এ দুটো যে তার চাই-ই চাই সেকথাটা পূর্ব বাঙলার লোকের মাথায় খেলেনি? সেটা টুইয়ে দেবার জন্য কুটিলস্য কুটিল ফরেন হ্যান্ডের প্রয়োজন হয়েছিল? আল্লায় মালুম, মি. ভুট্টোর মাথায় কী খেলে?
হিটলার ডিকটেটর হওয়ার পর একাধিকবার আপসোস করেছেন, তাঁর মাইন কাম্পফ প্রকাশ না করলেই সুবিবেচনার কাজ হত। মি. ভুট্টো ছোটা হিটলার দি থার্ড হওয়ার পর সে। আপসোস করেছেন কি না, বলা যায় না। তবে ভবিষ্য যুগের কারসিক পাঠক হয়তো বইখানার নাম দি গ্রেট ট্র্যাজেডি পাল্টে দি স্মল কমেডিয়ান নয়া নামকরণ করতে পারে।
.
‘বিচিত্র ছলনাজাল’
মৃগয়া সমাপনান্তে প্রেসিডেন্ট ইয়েহিয়া রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করলেন। সেই সুবাদে একটি প্রাচীন চুটকিলা পুনর্জীবন পেল।
জনৈক পেশাদার শিকারি হুজুরকে শিকারের ফন্দি-ফিকির বালাবার জন্য সঙ্গে গিয়েছিল। তাকে তার এক চেলা শুধাল, শিকারি হিসেবে হুজুর কীরকম? ওস্তাদ আসমানের দিকে তাকিয়ে বললেন, মাশাল্লা! একদম উদাসে উদা, বেনজির। কিন্তু হুজুরের ব্যাগ খালি রইল, আল্লা পাখিদের প্রতি মেহেরবান ছিলেন।
প্রচুরতম মদ্যপান করার পর উষসূদেবীর প্রথম আলোয় চরণধ্বনির শুভলগ্নে হস্তযুগল নিষ্কম্প প্রদীপ শিখাবৎ ধীর স্থির অচঞ্চল থাকে না।
প্রেসিডেন্ট ঢাকা যাত্রা করলেন।
.
এদিকে পুব বাঙলা অত্যন্ত বিক্ষুব্ধ চঞ্চলিত হয়ে উঠেছে। দেশের লোক দলে দলে শেখ সায়েবের পতাকার তলে জমায়েত হচ্ছে কিন্তু ওদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যুরোক্রেসি ধনপতির গোষ্ঠী এবং সর্বোপরি মিলিটারি জুন্টা উঠেপড়ে লেগেছে, কী করে আওয়ামী লীগের সর্বনাশ করা যায়, গণতন্ত্র পুনরায় প্রতিষ্ঠিত না হয়। কাঁড়া কাঁড়া টাকা আসতে লাগল সোনার বাংলায় স্পাই, গুণ্ডা এবং ভ্রষ্ট রাজনৈতিক কেনার জন্য। অবাঙালিরা তাদের সাহায্য করেছে প্রকাশ্যে। গায়ের জোরে বাহানা তৈরি করে পেটাচ্ছে আওয়ামী লীগের কর্মীদের। আওয়ামী লীগের পাবনার এমএলএ এবং খুলনার একজন লীগ কর্মীকে গুমখুন করা হল। স্বয়ং শেখকে গুপ্তহত্যা করার চেষ্টা করা হল– সে চেষ্টা চালু রইল।
