এসেমব্লি শব্দের সংস্কৃত বলুন, পালি বলুন, প্রতিশব্দ সঙ্ঘ।
ওদিকে তিনি গত এপ্রিলে যে একটা টেম্পরারি জো-শো সংবিধান নির্মাণ করেছেন সেটাতে পূর্ব পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্রাংশের হাওয়ার কোমরে রশি বেঁধে সেটাকে আটকে রেখেছেন। আমি সে একটিনি সংবিধান পড়িনি; তাই আন্দেশা করে ঠাওরাতে পারছিনে সে এসেমব্লিতে আওয়ামী লীগের সাবেক ১৬৭ জন সদস্যকে আমন্ত্রণ জানানো হবে কি না, এবং রাঁদেভু হবে কোথায়? ঢাকার রোকেয়া হল হস্টেলে, যেখানে ইয়েহিয়ার পিশাচরা মিলিটারি অ্যাকশন নিয়ে, যে অ্যাকশনে ভুট্টোর সম্মতি ছিল, অসহায় ছাত্রীদের নির্যাতিত ও পরে নিহত করে? না ইসলামাবাদের সেই আইয়ুব-হল-এর বারান্দায় যেখানে গণতান্ত্রিক জুলফিকার আলী সুবো-শাম ডিকটেটর প্রভু আইয়ুবের কলিংবেলের সুমধুর টিংটিংয়ের জন্য টুলে বসে ঢুলতেন?
গত সপ্তাহে আমি এসেমব্লি নাকচ করতে না করতেই আমার পাপড়ি খসে গেল! আবার সেই এসেমব্লি! সমস্ত রাত, এস্থলে পুরো পাক্কা একটি হপ্তা– নৌকা বেয়ে ভোরে দেখি সেই বাড়ির ঘাটে! খুঁটি থেকে বাধা নৌকোর দড়ি খুলতে ভুলে গিয়েছিলুম।
.
আবার ভুট্টো সায়েবের কেতাবখানার কথা পাঠককে স্মরণ করিয়ে দিই। সে পুস্তিকা এমনই তুলনাহীন যে খুদ বইয়ের তো কথাই নেই, আমার অক্ষম লেখনী মারফত তার সামান্য যেটুকু আমি প্রকাশ করতে পারব সেটা পড়ে পাঠক রোমাঞ্চিত হবেন, তার দেহ মুহুর্মুহু শিহরিত হবে, তিনি ক্ষণে ক্ষণে দিশেহারা হবেন এবং সর্বশেষে কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা, কোনটা গণ্ডমূখের জড়ত্ব, কোনটা অতি ধূর্তের কপটতম ধাপ্পা সেগুলো বুঝতে গিয়ে কঠিন শিরঃপীড়ায় আক্রান্ত হবেন– হয়তো-বা অর্ধোন্মাদ হয়ে যাবেন। ঈশ্বর রক্ষতু!
আমি কসম খেয়ে বলতে পারি, এ পুস্তক একাধিকবার অধ্যয়ন না করে স্বয়ং চিত্রগুপ্তও ছাব্বিশ (মার্চ) থেকে ষোল (ডিসেম্বর)র খতিয়ান লিখতে পারবেন না। দুই শরিক ইয়েহিয়া এবং ভুট্টো। কার পাপ কোন খাতে লিখবেন সঠিক ঠাউরে উঠতে পারবেন না। সান্তনা এইটুকু : পুণ্যের মূল তহবিলে স্রেফ ব্ল্যাঙ্কো! সেখানে তিনি নিশ্চিন্দি।
.
পূর্বেই নিবেদন করেছি, কেতাবের ধুয়া ভুট্টোং শরণং গচ্ছামি। (এদানির : সংঘং শরণং গচ্ছামি), তাই এ কেতাবের বৃহদংশ নিয়েছে ভুট্টোদেবের গুণ-কীর্তনে বা সাফাই গাওয়াতে। বস্তুত এটা পড়ে সরল বিদগ্ধ তাবজ্জন তাজ্জব মেনে মাথা চুলকোবেন : তাই তো! এমন সত্যবাদী, নিরহঙ্কার, আত্মত্যাগী, পুরদুঃখকাতর দয়ার সাগর, যিনি ভাজা মাছটি উল্টে খেতে পারেন না তাকে নিয়তি রাজনীতিতে নামালেন কেন? কূটনীতির দাবা খেলা তো তার জন্য নয়– তাঁর কথা বিশ্বাস করলে তো নিঃসন্দেহে বলা যায়, এই প্রাপ্ত বয়সেও তিনি যদি লারকানার রাস্তার ছোঁড়াদের সঙ্গে মার্বেল খেলতে নাবেন তবে তারা তাঁকে বেমালুম বোকা বানিয়ে পকেটের সব কটা মার্বেল গাড়া মেরে দেবে।
তবে কি না, নিতান্ত আপন-ভোলা সজ্জন এই লোকটি। মাঝে-মিশেলে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ সত্য কথা বলতে তিনি ভুলে যান ইস্তক ইতি গজঃটুকু। পূর্ববর্তী সংখ্যায় বলেছিলুম কী কৌশলে এদিক-ওদিক বুনোহাঁস শিকার করতে করতে ইয়েহিয়া তাঁর ব্লদেভু ভুট্টার মোকামে পৌঁছে সেখানে তার সঙ্গে ভবিষ্যতের প্ল্যান কষলেন। এই পিয়া মিলনকো অবশ্যই হানিমুন অব দি টু- দু জনার মধুচন্দ্রমা বলা যেতে পারে। হানিমুন অব্ দি টু বাক্যটি আমি শ্রীভুট্টোর গ্রন্থ থেকে নিয়েছি। তিনি লিখেছেন আমাতে-মুজিবেতে (ঢাকাতে, পরবর্তীকালে– লেখক) বারান্দায় কথাবার্তা বলার পর আমি যখন ইয়েহিয়াকে সেটার রিপোর্ট দিতে গেলুম তখন তিনি সবিস্ময়ে আমাদের ভেটকে হানিমুন বিটউইন দি টু অব ইউ বলে উল্লেখ করলেন। কিন্তু এহ বাহ্য।
আসল কথা এই : ভুট্টো তাঁর কেতাব আরম্ভ করেছেন লেট জিন্নার পাকিস্তান স্থাপনা করা থেকে! তার পর অনেকানেক ঘটনার কালানুক্রমিক নির্ঘণ্ট তথা বিবৃতি দেওয়ার পর তিনি বলছেন তেসরা জানুয়ারি ১৯৭১-এ শেখ মুজিবুর রহমান তার বিখ্যাত ভাষণ দেওয়ার অল্প কিছুদিন পর প্রেসিডেন্ট ইয়েহিয়া তাঁর উপদেষ্টামণ্ডলীসহ ঢাকা গেলেন। ঢাকা থেকে ফেরার পর প্রেসিডেন্ট ইয়েহিয়া ও তার কিছু উপদেষ্টা ১৭ জানুয়ারি তারিখে আমার হোম টাউন লারকানাতে এলেন। প্রেসিডেন্ট আমাকে মুজিবের সঙ্গে ঢাকাতে তার আলোচনার বিষয় জানালেন… ইত্যাদি।
আশ্চর্য এই সত্য গোপন! ইয়েহিয়ার সঙ্গে প্রায় মাসখানেক পূর্বে, অর্থাৎ ইয়েহিয়ার সঙ্গে ঢাকাতে মুজিবের মোলাকাত হওয়ার পূর্বেই যে তিনি (ভুট্টো) ইয়েহিয়ার সঙ্গে ওই লারকানাতেই দুহুঁ দুহুঁ কুহুঁ কুহুঁ করেছেন সেটা একদম চেপে গেলেন।
কেন চেপে গেলেন?
কারণ ওই সময়েই সেই শয়তানি প্ল্যান আঁটা হয়, কী পদ্ধতিতে বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসন প্রচেষ্টা (অটোনমি স্বাধীনতা নয়) নস্যাৎ করা যায়। (কে কাকে কতখানি দুষ্টবুদ্ধি যুগিয়েছিলেন সেটা আজও আমরা জানিনে– একদিন হয়তো প্রকাশ পাবে) এই প্রাথমিক প্ল্যান নির্মাণকাহিনী যাতে করে ধামাচাপা পড়ে যায় তার জন্যই এই সত্য গোপনের প্রয়োজন।
ওদিকে ইয়েহিয়াই তার তিন দিন পূর্বে, ১৪ জানুয়ারিতে ঢাকা শহরে ফাঁস করে বসে আছেন যে মুজিবের সঙ্গে তাঁর প্রথম মোলাকাতের পূর্বেই ভুট্টোর সঙ্গে তাঁর আলাপচারি হয়ে গিয়েছে।
