দুই পাক-এর সাধারণজন ইয়েহিয়ার কূটবুদ্ধির খবর রাখত না। তাই তারা অবাক হল যখন গণনির্বাচনের পরই ইসলামাবাদ ছেড়ে তিনি বেরিয়ে পড়লেন শীতের মরসুমি হিমালয় সাইবেরিয়াতে হংসবলাকা নিধনে। বলা বাহুল্য, এ ধরনের রাজসিক শিকারে তিনি জনসাধারণের সংস্রবে আসবেন না– তা তিনি চান না। তাকে আপ্যায়িত করবেন বড় বড় জমিদার যেন জ্যাক অব কেন্ট বা নবাব খঞ্জা খা এবং কেঁদে কেঁদো টাকার কুমির আদমজি ইস্পাহানিদের পাল– এঁদের একজনের নাম আবার ফাঁসি! ইয়েহিয়া বাগাবেন এদের।
পয়লা প্রেমের শিকার ছোঁড়াটা যেরকম নাক-বরাবর প্রিয়া-রাদেভু পানে সবেগে ধাওয়া করে না, এদিকে টু ওদিকে টক্কর খাওয়ার কামুক্লাজ করে মোকামে পৌঁছয়, ইয়েহিয়া শিকারি সেই রীতিতে হেথা-হোথা শিকার করতে করতে পৌঁছলেন তাঁর বল্লভ ভুট্টোভবনে। সেখানে তিনি যা খাতিরযত্ন পেলেন সে শুধু হলিউডেই হয়ে থাকে। কিংবা আইয়ুব যেরকম প্রফুমো সকাশে মিস কিলার সান্নিধ্যে পেয়েছিলেন। আইয়ুব তখন গদিতে; তাই সে সময়ে সদাশয় ব্রিটিশ সরকার আইয়ুবের সেই নিশাভিসারও বার্থডে-সুট পরে মধ্যযামিনীতে হুরীপরীদের সঙ্গে সন্তরণকেলি তার পরিপূর্ণ বাহার অসদ্ব্যবহারসহ প্রকাশ করেননি।
ইয়েহিয়া-ভুট্টোতে নিঃসন্দেহে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা হয়েছিল, কিন্তু খবরের কাগজে সেটা কামুক্লাজ করে প্রকাশিত হল, নিতান্ত যোগাযোগবশত উভয়ের মধ্যে কিঞ্চিৎ ভাবের আদান-প্রদান হয়। তা সে যে ভাষাতেই প্রকাশ করা হোক, গণনির্বাচনের পরই রাষ্ট্রপ্রধান সংখ্যাগুরু আওয়ামী নেতার সঙ্গে সর্বপ্রথম আলাপ-আলোচনা না করে নিজের থেকে প্রথম গেলেন সংখ্যালঘুর বাড়িতে। এটা কূটনৈতিক জগতে সর্ব প্রটোকলবিরোধী, সখৎ বেআদবি। এতে করে আওয়ামী লীগের কোনও ক্ষতিবৃদ্ধি হল না, তিনি হলেন হাস্যাস্পদ এবং বিড়ম্বিত। বলা বাহুল্য, এ মশকরাটা আওয়ামী লীগের দৃষ্টি এড়ায়নি, কিন্তু লীগজন যে বিচলিত হয়েছেন সেরকম কোনও লক্ষণই দেখা গেল না।
একটা বিষয়ের প্রতি আমি কিন্তু পাঠকের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করি।
পূর্ববঙ্গের সুদীর্ঘ ইতিহাসের এই অধ্যায়ের প্রধান নায়ক তিন সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের তিনজন লোক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, (বর্তমান) পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং প্রেসিডেন্ট পদচ্যুত, লাঞ্ছিত আগা মুহম্মদ ইয়েহিয়া খান।
১৯৭১ আগস্ট/সেপ্টেম্বরে জনাব ভুট্টোর আপন জবানেই পূর্ববঙ্গের অবস্থা যখন অত্যন্ত সঙ্কটজনক, অখণ্ড পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হয় তখন তিনি একখানি চটি বই লেখেন।*[* ZULFIKAR ALI BHUTTO, The Great Tragedy, Sept. 71, pp. 107, Karachi.]
এই বইখানি কত শত বৎসর ধরে ঐতিহাসিক মাত্রেরই গবেষণার প্রামাণিক কাঁচামালরূপে গণ্য হবে, আজ সেকথা বলা কঠিন।
আগস্ট মাসেই ভুট্টো বুঝে গিয়েছিলেন, পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত হওয়া থেকে আর বাঁচানো প্রায় অসম্ভব। ওদিকে পশ্চিম পাকে আরও বহু লোক, বিশেষ করে ধনপতিরাও সে তত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করে ফেলেছিলেন এবং সেই সঙ্কটের জন্য ইয়েহিয়া এবং তার দুষ্টবুদ্ধিদাতা ভুট্টো যে তার চেয়েও বেশি দায়ী সে অভিমত প্রকাশ্যে ব্যক্ত করতে আরম্ভ করলেন।
তখন আপন সাফাই গাইবার জন্য ভুট্টো এ বই লেখেন।
আজ পর্যন্ত এমন কোনও সাংবাদিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক বলতে কসুর করেননি যে, ভুট্টোর প্রতিটি রক্তবিন্দুতে, তাঁর ধ্যানে স্বপ্নে সুষুপ্তিতে সদাজাগ্রত থাকে মাত্র একটি রিপু উন্মত্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, যেটাকে প্রায় নীতিবিগর্হিত জনসমাজ বিনাশী পাপাভিলাষ আখ্যা দেওয়া যেতে পারে।
তাই সাফাই গাইতে গিয়েও আগা-পাশ-তলা জুড়ে বার বার তাঁর একই আবদারের ধুয়ো, একই সদম্ভ জিগির :
এখনও সময় আছে। এখনও ত্রাণ আছে। আমাকে রাজ্যচালনা করতে দাও। মন্ত্র উচ্চারণ কর হে প্রতি পাপী তাপী পাকী :
ভুট্টোং শরণং গচ্ছামি ॥
.
ভুট্টাঙ্গ পুরাণ
রবীন্দ্রনাথ মূলটা বাংলায় না ইংরেজিতে লিখেছিলেন, সেটা এস্থলে না জানলেও চলবে, কারণ ইংরেজিটাও অটোগ্রাফের খাতাতে লেখা, ফুলিঙ্গটি উতরেছে অত্যুকৃষ্ট রূপ নিয়ে।
হোয়াইল দি রোজ সেড টু দি সান আই শ্যাল রিমেন ইটার্নেলি ফেৎফুল টু দি, ইটস পেটালস ড্রপট!
ইতোমধ্যে আপনাদের আশীর্বাদে বাংলাটাও মনে পড়ে গেল–
চাহিয়া প্রভাত রবির নয়নে
গোলাপ উঠিল ফুটে।
রাখিব তোমারে চিরকাল মনে
বলিয়া পড়িল টুটে।
সমসাময়িক প্রায়-ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার বেলা ওই একই বিপদ! কালি শুকোতে না শুকোতেই অন্য আরেকটা ঘটনা এসে সেটাকে বাতিল করে দেয় গোলাপবালার অনন্তকালীন প্রেমাঙ্গীকার বলা শেষ হওয়ার পূর্বেই ঝুরঝুর করে পাপড়িগুলো ঝরে পড়ে গেল।
ভুট্টোং শরণং গচ্ছামি
বলা শেষ করতে না করতেই তারই কণ্ঠে শুনি, উঁহু! হল না। তার চেয়ে বরঞ্চ বল,
সঙ্ং শরণং গচ্ছামি।
অর্থাৎ তিনি ইন্দিরাজির সঙ্গে যদি কোনও ফৈসালা করে ফেলেন (আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস তিনি কোনও ফৈসালাই চান না, কারণ অবগাহি কল্পনার সীমান্ত অবধি আমি এমন কোনও সামান্যতম ফৈসালার সন্ধান পাচ্ছিনে যেটা যুগপৎ পাকিস্তানের জনগণমন প্রসন্ন করবে এবং তিনিও গদিনশিন থাকবেন। তবে তিনি সেটি এসেমব্লির সম্মুখে পেশ করবেন। ওদিকে আসন্ন মূলাকাতের পূর্বাহ্র পর্যন্ত তিনি অখণ্ড পাকিস্তানের জিগির লাগাতার গেয়ে যাচ্ছেন।
