যে অধিবেশনে ভুট্টো শেষের আইটেম না বললেও প্রথমটা বলবেনই বলবেন। তা তিনি যা-বলুন যা-করুন কোনও আপত্তি নেই। শুধু একটা শর্ত যেন থাকে। তিনি গত বছর ইউনাইটেড নেশনে যেরকম গোসসাভরে কাগজপত্র ছিঁড়ে দুমদুম করে সভাস্থল ত্যাগ করেছিলেন, এখানে যেন সেরকমটা না করেন।
.
ইয়েহিয়া-ভুট্টো
আজ জ্যৈষ্ঠ মাসের ৩১শে। কাজেই আষাঢ়স্য প্রথম দিবস বলতেও বাধা নেই। অন্তত আষাঢ়ের প্রথম দিবসে বর্ষা আগমনের যেসব লক্ষণ নিয়ে আবির্ভূত হয় আজ ঢাকাতে সেই বর্ষা এসেছেন বৃষ্য সর্বলক্ষণসম্পন্না শ্যামা সুন্দরীর ন্যায়। তাহাজ্জুদ নামাজের ওয়াকত থেকেই শুনতে পাচ্ছি বাড়ির পাশের নিমগাছ, বাংলাদেশ রাইফেলসের চাঁদমারি ঘিরে যে ঘন বাঁশবন, গ্রীষ্মের অত্যাচারে ফিকে বেগুনি রঙের পুস্পরিক্ত জারুল এবং কৃষ্ণের চূড়ার পর অবিরল রিমঝিম রিমঝিম বারিপতনের মৃদু মর্মরধ্বনি। আর
মেঘের ছায়া অন্ধকারে
রেখেছে ঢেকে ঢাকা-রে—
এতদিনে ঢাকা ছিল খোলা রৌদ্রতপ্ত বিবর্ণ আকাশের নিচে। আজ ক্ষীণ বরিষণে জলকলকলে নাম তার সার্থক হল।
এমন দিনে নমো ইলিশায়
খিচুড়ি তার সাথে এ ঢাকায় ॥
গত বৎসর এইদিনে কার সাধ্য ছিল এ বাড়িতে বসে জানালা দিয়ে তাকিয়ে কবিত্ব করে? বাড়ির বাগানের শেষ প্রান্তে ছোট্ট একটি নালা বয়ে গিয়ে একটু দূরে একটা ঝিলের রূপ নিয়েছে। গজ তিনেক চওড়া নালার পরেই খাড়া উঁচু টিলার উপর বাঁশবন ঘেরা চাঁদমারির পাঁচিল। এ বাড়ি থেকে ধানমণ্ডি নিবাসিক অঞ্চলের আরম্ভ। ধানমণ্ডির ঘন বসতিতে মুক্তির দু পাঁচজন হেথা-হোথা সর্বত্রই আত্মগোপন করে থাকত। চাঁদমারি ঘিরে টিক্কার না-পাকদের অহরহ ছিল ভয়, রাতের অন্ধকারে মুক্তি-রা হঠাৎ কখন না পাকিস্তানের রাইফেলসের হেড-কোয়ার্টারের ওপর হামলা চালায়। নালার পাশেই তাই খুঁড়েছিল বিরাট এক বাঙ্কার। তার ভিতরে বিজলিবাতি ফ্যান রেডিয়ো, রমণী, উত্তম উত্তম শয্যা সবকিছুই ছিল। আর টিলাটার সানুদেশে বাঁশবনের ভিতরে আড়ালে সুবো-শাম রাইফেল হাতে পাহারা দিত–পাকরা। সামান্যতম প্রদীপ-রশি দেখতে পেলেই সঙ্গে সঙ্গেই ফায়ার! এমনকি দূরের কোনও মিলিটারি জিপের হেড-লাইট বাড়ির কোনও শার্সির উপর অতি সামান্য চিলিক মারলেই জাস্ট টু বি শ্যোর, চালাও ধনাধন গোলি– কাপুরুষের লক্ষণ ওই, বুকের ভিতর বলা তো যায় না; ক্যা মালুম ক্যা হ্যায়-এর ধুপুস-ধাপুস ছুঁচোর নৃত্য, ঘামের ফোঁটায় দেখে সোঁদরবনের কেঁদো কুমির!
এই বাড়ির ঘরের ভিতরে দুটো বুলেটের ইঞ্চি তিনেক গভীর ফুটো। জানালার শার্সি পর্দা ফুটো করে থানা গেড়েছে। আরেকটা জানালার চৌকাঠে লেগে সেটার ইঞ্চি দুয়েক উড়িয়ে টাল খেয়ে কঁহা কঁহা মুল্লুকে চলে গিয়েছে।
কোথায় গেল সেসব রোয়াব, বড়-ফাট্টাই!
এ বাড়ির বাগানের কোণে কিন্তু নববরিষণের সঙ্গে সঙ্গে ফুটছে লাজুক জুঁই!
ইংরেজের অত্যাচারের সময় রবীন্দ্রনাথ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন,
টুটল কত বিজয় তোরণ, লুটল প্রাসাদ চুড়ো,
কত রাজার কত গারদ ধুলোয় হল গুঁড়ো।
আলিপুরের জেলখানাও মিলিয়ে যাবে যবে
তখনো এই বিশ্ব-দুলাল ফুলের সবুর সবে।
রঙিন কুর্তি, সঙিন মূর্তি রইবে না কিছুই,
তখনো এই বনের কোণে ফুটবে লাজুক জুঁই।
মাত্র তিন গজের তফাৎ। এদিকে ফুটছে লাজুক ভূঁই। ওদিকে কোথায় রঙিন কুর্তি সঙিন। মূর্তি হেইয়া খানের ভুই?
অবিরত বৃষ্টিধারা ঝরছে।
এ বাড়ির নিচের তলাটা জোরদখল করেছিল এক পাঞ্জাবি মেজর। আমার ছোট ছেলে বললে মেজর হুজুর বাড়ি ফিরবেন কখন ঠিক নেই। তার ব্যাটমেনের মাথার টুপিতে পড়েছিল প্রথম আষাঢ়ের আড়াই ফোঁটা জল। কোঁকাতে কোঁকাতে চারপাইয়ে কুকুরকুণ্ডলী হয়ে শুয়ে পড়ে বলে তার বহুৎ জুকাম (সর্দি) হুয়া, জোরসে খাসি হুই এবং জবরদস্ত বুখার চড়হা। কিন্তু তখনও তিনি এদেশের রাজা। পুনর্মুষিক হলেন কী প্রকারে সে কাহিনী অন্য অনুচ্ছেদে আসবে এ ইতিহাসের শেষ অধ্যায়ে ততদিন এ পরিবারের সসৰ্প-গৃহে বাস, সে কাহিনী তার সঙ্গে বিজড়িত।
আমার পরিকল্পিত এসেমব্লির সেশনটা উপস্থিত মুলতুবি আছে। কারণ ভুট্টো এখন অন্তত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। শুনলুম, হিটলার ডিনেস্টির চতুর্থ ছোটা হিটলার তাঁকে যখন গদিচ্যুত করবেন তখন তার কপালে অবশিষ্ট রইবে শুধু ওই এসেমব্লির সদস্যপদ। তারই হক্কে তিনি দাবি জানাবেন তখন এসেমব্লির সেশন। এখনও তিনি রাজা। তবে হিটলার নাটকের সর্বশেষ অঙ্ককে যেমন বলা হয়, দি কিং উইদাউট হিজ রোবৃস। সেই যে হুলুধ্বনি মুখরিত জনতার মাঝখান থেকে পুঁচকে একটা ছোঁড়া চেঁচিয়ে উঠেছিল, কিন্তু রাজামশাইয়ের পরনে যে কিচ্ছুটি নেই!
পূর্বেই বলেছি, ডিসেম্বরের গণ-নির্বাচনের ফলে ইয়েহিয়া যখন দেখতে পেলেন যে এসেব্লিতে তিনি গোটা পাঁচ-সাত দলকে একে অন্যের বিরুদ্ধে নাচাতে পারবেন না তখন তিনি লক্ষ করলেন যে, আওয়ামী লীগ পশ্চিম পাকিস্তানে কোনও সিট পায়নি এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ভুট্টো পার্টি পূর্ব পাকিস্তানে কোনও সিট পায়নি।
অতএব পাঁচ-সাতটা পার্টি না নাচিয়ে তিনি নাচাবেন– দুই পার্টিকে নয়-দুই উইংকে। দুই পাকিস্তানে লাগিয়ে দেবেন মোষের লড়াই। অতএব তার হাতের কাছে আছে যে পশ্চিম পাকিস্তান সেটাকে তৎপূর্বে বেশ ভালো করে তাতাতে হবে।
