ভোটাভুটির শেষ ফল যখন বেরুল তখন দেখা গেল :
আওয়ামী লীগ–১৬০
ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস্ পার্টি–৮১
কয়ুমের মুসলিম লীগ–৯
মুসলিম লীগ (দৌলতনা দল)–৭
ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ওয়ালি দল)–৬
পাঁচটা ভিন্ন ভিন্ন পার্টিতে সর্বসাকুল্যে–২১
ইনডিপেনডেন্ট–১৬
—————————–
মোট–৩০০
দুই হিসাব মেলালে কার না চক্ষু স্থির হয়!
মহিলাদের সংরক্ষিত তেরোটি সিট থেকে আওয়ামী লীগ পেল আরও সাতটি সিট–একুনে ১৬৭। পূর্ব বাঙলায় সিট ছিল সর্বসমেত ১৬৯; অর্থাৎ মাত্র দুটি সিট আওয়ামী লীগ পায়নি।
বিগলিতাৰ্থ অ্যাসেমব্লিতে ভুট্টোকে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের সব দল এক গোয়ালে ঢুকলেও আওয়ামী লীগকে হারাতে পারবে না।
লেগে গেল ধুন্দুমার। ইয়েহিয়া স্পষ্ট দেখতে পেলেন অ্যাসেমব্লিতে এখন তিনি গোটা পাঁচেক দলকে বাদর নাচ নাচিয়ে আপন ডিকটেটরি অক্ষুণ্ণ রেখে ভারতের সঙ্গে হাজার বছর ব্যাপী মোকাবেলা করে যেতে পারবেন না।
আইনত ভুট্টো কেবলমাত্র বিরোধী দলের নেতৃত্ব করতে পারেন। কিন্তু তিনি উচ্চকণ্ঠে বলে বেড়াতে লাগলেন, মুজিব যে রকম পূর্ব পাকিস্তানের নেতা, তিনিও তেমনি পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা। এখন এসে গেছে দুই পাকিস্তানের মোকাবেলার লগ্ন।
এস্থলে প্রথমেই বলতে হবে, উভয় পাকিস্তানের মোকাবেলা বা সংঘর্ষের আশা বা আশঙ্কার কথা শেখ সাহেব কখনও তোলেননি। ভোটাভুটিতে বিরাট সংখ্যাধিক্য পাওয়ার পরও তিনি কখনও বলেননি– এইবারে আমরা তাবৎ সমুচা পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের ওপর রাজত্ব করব– যদিও সেটা বলার আইনত ধৰ্মত সর্ব হক্ক আওয়ামী লীগের ছিল। ভুটো যদি এখনও বলেন পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হয়নি, জিন্দাবাদ অখণ্ড পাকিস্তান তবে আওয়ামী লীগের এখনও সেকথা বলার হক আছে।
বস্তুত জনাব ভুট্টো যদি নিজের জীবন্ত-সমাধির তামাসা নিজে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে চান, তবে অখণ্ড পাকিস্তান সরকারের কানুন অনুযায়ী তিনি ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লির অধিবেশন ডাকুন ঢাকায়, যেটা ৩ মার্চ ১৯৭১ হওয়ার কথা ছিল। তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট কি না সেটা সাংবিধানিক আইনে যদিও বিতর্কাধীন– আমরা না হয় তাঁকে আবু হোসেনের মতো একদিনের তরে খলিফে বানিয়ে দিলুম। ভয় নেই পাঠক, পশ্চিম পাকিস্তানের বিস্তর মেম্বরও গুঁড়ি গুঁড়ি হামাগুড়ি দিয়ে আসবেন– সে ব্যবস্থা সেই হারাধনের একুশটি পরিবার পরমানন্দে করে দেবেন। পাঠকের স্মরণ থাকতে পারে, ৩ মার্চের অধিবেশনে পশ্চিম পাক থেকে কোনও সদস্য যদি ঢাকা আসার চেষ্টা করেন, তবে ভুট্টো তাদের ঠ্যাং ভেঙে দেবার হুমকি দেন। তৎসত্ত্বেও বেশ কয়েকজন অক্ষত ঠ্যাং নিয়েই এসেছিলেন। বাকিরা আসতে পারেননি– প্লেনে সিট পাননি বলে। বস্তুত বঙ্গবন্ধু ওই সময়ে, ৩ মার্চ ১৯৭১-এ বলেন, এটাকে ট্র্যাজিক বলতে হয় যখন প্লেনগুলো (মিলিটারি প্লেন নয়– লেখক) পশ্চিম পাকের সদস্যদের নিয়ে আসার কথা তখন সেগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে মিলিটারি আর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আসাতে। আসবেন আসবেন, মেলা সদস্য আসবেন। ওখানে তো প্রাণের ভয়ে কাঁপছেন। এখানে সদস্য হিসেবে অন্তত জান-মাল সে। চাকরির তরে তদ্বিরও করা যাবে। সত্য বটে বন্ধুবন্ধু বলেছেন, এখন আর তদ্বির চলবে না। অধম সক্কলের কাছে মাপ চেয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে একটি সমসাময়িক নীতিবাক্য স্মরণ করে : একদা বসুন্ধরা ছিলেন বীরভোগ্যা– এখন তিনি তদ্বির-ভোগ্যা।
এবং বিশেষ করে দর্শক হিসেবে নিমন্ত্রণ জানাতে হবে বার অব বেলুচিস্তান বুচার অব বেঙ্গলকে। তার যথেষ্ট কারণ আছে। মুক্তিযুদ্ধ যখন চরমে, তখন টিক্কা খান ফরমান জারি করে স্বাধীন বাংলাদেশের কমান্ডার-ইন-চিফ জেনারেল আতাউল গনী মুহম্মদ ওসমানীকে তার সম্মুখে ঢাকাতে উপস্থিত হবার হুকুম ঝাড়েন। ওসমানী সাহেব ভদ্রসন্তান। অতিশয় ভদ্র ভাষায় উত্তর দেন– যদূর মনে পড়ে কে কাকে ডেকে পাঠাবে সেটা না হয়… (অর্থাৎ বিতর্কাধীন, কিংবা ওসমানীরই বেশি, কিংবা উপস্থিত সেটা মুলতুবি থাক; আমার সঠিক মনে নেই বলে দুঃখিত- লেখক)। তবে আমি ঢাকা আসছি, কিন্তু প্রশ্ন, মহাশয় কি সে সময় ঢাকায় থাকবেন?
এই উত্তরটি গেরিলারা ঢাকার দেয়ালে দেয়ালে সেঁটে দেয়।
বলা বাহুল্য জেনারেল ওসমানী এক কথার সেপাই। তিনি ঢাকা এসেছিলেন, কিন্তু টিক্কা তখন সেখানে নেই।
বেধড়ক মার খেয়ে ইংরেজ সৈন্য যখন ডানকার্ক থেকে নিম্নপুচ্ছ হয়ে সবেগে পলায়ন করে তখন বিবিসি-র পাঠান সংবাদদাতা বুখারি বলেন, হমারে সিপাহি বাহাদুরিকে সাথ হট গয়ে। বাহাদুরির সঙ্গে হটনা– সোনার পাথরবাটি।
টিক্কা খান বাহাদুরিকে সাথ হটতে হট্টতে পৌঁছে গেলেন রাওয়ালপিণ্ডি।
ব্লদেভুটা মিস করার জন্য টিক্কার ক্ষোভ থাকতে পারে। যাদের নিমন্ত্রণ করা হবে তার মধ্যে টিক্কা একজন মাস বইকি!
অধিবেশনের কর্মসূচি (আজেন্ডা) এবং সেটা কীভাবে রূপায়িত হবে তার ভার, কল্পনাবিলাসী পাঠক, তোমার হাতে ছেড়ে দিলুম। কিন্তু এটা শুধু কল্পনা-বিলাসই হবে না। পাঠক পরের সংখ্যায় দেখতে পাবেন, ভুট্টো সাহেব এই যে মুসলিম জগতে সফর করে এলেন সেখানে কোন পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে শেখ সাহেবের ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে এলেন। একদিকে নিদারুণ হাহাকার, আওয়ামী লীগ একটি বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র নষ্ট করেছে; অন্যদিকে নিদারুণতর হাহাকার যে বাইশটি ধনপতির অর্থানুকূল্যে তিনি ছোটা হিটলার দি থার্ড হলেন তাদের দোকানপাট বন্ধ। তারা যে রদ্দিমাল পূর্ব বাঙলায় চড়া দরে ডাম্প করত সেগুলো এখন করাচির পেভমেন্টে নেমেছে; আরবরা যদি দয়া করে কেনে।
