সুবেদারের হুঙ্কার শুনে ডাক্তার বললেন, একশো বার পারেন, স্যর, একশত বার পারেন। কিন্তু লোকটা
আমি কিছু জানতে চাইনে–
আমার কথাটা শুনুনই না, স্যর। ছেলেটাকে আমি শুধালুম, আমাদের লাট সায়েবের নাম কি? বলে কী না, মুহম্মদ মুফিজ চৌধুরী! তার পর—
ডাক্তার বললেন, দড়াম করে শব্দ হল। ডেড কট অফফ!
আমি অবাক হয়ে বললুম, আপনার বুকের পাটা তো কম নয়!
ডাক্তার অতিশয় সবিনয় : কী যে বলেন, ভাই সায়েব। আপনি জানেন না যে যত ছোটা হিটলারের ক্ষুদে বাচ্চা হয় তার দেমাক-রওয়াব তত টনটনে। সেখানে মোকা মাফিক খোঁচা মারতে পারলেই তিনি বন-ফায়ার! কী! আমার নামটা পর্যন্ত জানে না যে বুড়বক– ইত্যাদি।
.
এরকম আরও বিস্তর কায়দা রপ্ত করে নিয়েছিল বাংলাদেশের অতিশয় নিরীহজনও– তবে হিউমার দিয়েও যে হিটলারি হুকুম বানচাল করা যায়, আমার কাছে এই তার প্রথম ও শেষ উদাহরণ।
তাই ইয়েহিয়া স্থির করলেন, ভিন্ন মুষ্টিযোগ প্রয়োগ করতে হবে। দাও গণতন্ত্র, হাতে। রাখ কলকাঠি।
বয়স্ক পাঠকের স্মরণ থাকতে পারে, ইংরেজের কাছে স্বরাজের কথা তুললেই সে বলত, আলবাৎ স্বরাজ দেব। হিন্দু চায় অখণ্ড ভারত, মুসলমান চায় পাকিস্তান, আর নেটিভ স্টেটের মহারাজারা চান যেমন আছে তেমনি থাক, তোমাদের সঙ্গে সন্ধির শর্ত ছিল, আমরা তোমাদের ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার স্বার্থে হাত দেব না, আর তোমরা আমাদের রক্ষা করবে। তোমরা চলে গেলে আমাদের রক্ষা করার জিন্মেদারি নেবে কে? তাই তোমরা তিন দল একমত হয়ে এক গলায় বল, কোন ঢঙের, কোন সাইজের কোন রঙের স্বরাজ চাও তোমরা। একমত হলেই আমরা খালাস।
এটা ডিভাইড অ্যান্ড রুল নয়, এটা ডিভাইড অ্যান্ড ডোন্ট কুইট ইন্ডিয়া।
ইয়েহিয়া সেই মতলবই আঁটলেন। ইংরেজ তাঁর ফাদার মাদার গর্ভস্রাব জারজ-সন্তানও প্রকৃত পিতার হদিস পেলে তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে। আর কে না জানে, তাবৎ নৃতত্ত্ববিদ একবাক্যে বলেন, ইয়েহিয়ার যে অঞ্চলে জন্মভূমি সেখানে বিস্তর জাত-বেজাত এসে মিশেছে দেদার বর্ণসঙ্কর।
ইয়েহিয়া হিসাব করে দেখলেন, গণনির্বাচনে কোনও দলই সংখ্যাগুরু হবে না। পূর্ব আর পশ্চিম পাকিস্তান তো এক হতেই পারে না। এক পশ্চিম পাকিস্তানি ওয়াকিফহাল সজ্জন বলেছেন, পাকিস্তানের দুটো ডানা (উইং)- পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তান। আমি দুটো পাখাই দেখেছি, কিন্তু পাখিটাকে কখনও দেখতে পাইনি। তাই যে পাখিটা আদৌ নেই তার দুটো ডানা পলিটিকাল পার্টি মাফিক টুকরো টুকরো করতে কোনও অসুবিধা তো নেই। ইংরেজের মতো তিনিও বহুধা বিভক্ত উভয় পাকিস্তানের ওপর বহুকাল ধরে রাজত্ব করে যাবেন। ইনশাল্লা সুবহানাল্লা!
গুপ্তচরদের শুধোলেন, পাকা খবর নিয়ে বল দেখি, কোন পার্টি কত ভোট পাবে বলে অনুমান করা যায়।
এস্থলে ওয়াকিফহাল মহলে নানা মত প্রচলিত। এক দল বলেন, ডিকটেটরদের সঙ্গে যারাই কাজকারবার করেছে তারাই জানে, ডিকটেটররা শুনতে চান সেই রিপোর্ট যেটা আপন মনের মাধুরীর সঙ্গে মিশে যায়। ডিকটেটররা চিরকালই দাবি করেন তারা এক অলৌকিক যষ্ঠেন্দ্রিয় দিয়ে ভবিষ্যতে কী ঘটবে তা দেখতে পান। গুপ্তচরের রিপোর্ট যদি সেই ভবিষ্যৎকে সায় দেয় তবে উত্তম, নইলে সেটা গডড্যাম অবজেকটিভ, বাস্তব কিন্তু বর্তমানের বাস্তব। আখেরে ভোটের ফলাফল কী হবে সেটা এ রিপোর্ট প্রতিবিম্বিত করছে না। তবে গুপ্তচরদের। কাছ থেকে রিপোর্ট চাওয়ার প্রয়োজনটা কী? সেটা শুধু সন্দেহপিচেশ দু একটা মূর্খ জেনারেলদের বোঝাবার জন্য যে কোনও পার্টিই মেজরিটি পাবে না।
১৯৭০-এর মাঝামাঝি– আমার মতো কিংবা হেমন্তে-শীতে যারাই এদেশে বেড়াতে এসেছেন তাদের মনে কোনও সন্দেহ হয়নি যে শেখ না-ও জিততে পারেন। তবে তিনি যে আখেরে গণতন্ত্রের ইতিহাসে অভূতপূর্ব এরকম একটা থান্ডারিং মেজরিটি পেয়ে যাবেন সেটা বোধহয় কেউই কল্পনা করতে পারেননি। তৎসত্ত্বেও ইয়েহিয়ার টিকটিকিরা নির্বাচনের শেষ ফল কী হবে সে সম্বন্ধে যে ভবিষ্যৎ রাশি গণনা পাঠালেন সেটা ইয়েহিয়ার দোস্ত-দুশমন উভয়কেই আজ অবিশ্বাস্য বিস্ময়ে বেকুব বানিয়ে দেবে।
অ্যাসেমব্লিতে সিট ৩০০টি। তদুপরি আরও তেরোটি সিট বেগমসায়েবাদের জন্য সংরক্ষিত; ইয়েহিয়ার স্টাটিসটিশিয়ান বা বৈজ্ঞানিক গণৎকার টিকটিকিরা নিম্নের ছক কেটে দিলেন। উভয় পাকিস্তান মিলে সিট পাবেন–
আওয়ামী লীগ–৮০
কয়ুমের মুসলিম লীগ–৭০
মুসলিম লীগ (দৌলতনা দল)–৪০
ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ওয়ালি দল)–৩৫
পাকিস্তান পিপলস পার্টি (ভুট্টো)–২৫
বাদবাকি সিটগুলো মোটামুটি এই হারেই হবে– আভাস দিলেন ফলিত জ্যোতিষীরা।
ইয়েহিয়া উর্দু বলার সময় হনুকরণ* করেন যুক্তপ্রদেশের (সেটা ইন্ডিয়ায় তওবা, তওবা!) উর্দুভাষীদের। সেই উচ্চারণে সানন্দে হুঙ্কার ছাড়লেন ইয়েহিয়া ইয়েছ! নামের সঙ্গে আনন্দসূচক বিস্ময়বোধক ধ্বনি হুবহু মিলে গেল।
[*১. রবীন্দ্রনাথের সর্বগজ দ্বিজেন্দ্র একদা লেখেন : টু ইমিটেট = অনুকরণ : টু এপ (ape) = হনুকরণ। ইংরেজি ধ্বনি-তাত্ত্বিকরা এই ককনি H হ-টি লক্ষ করবেন।]
কিন্তু হায়, কাশীরাম দাস এই গৌড়ভূমিতেই আপ্তবাক্য বলে গিয়েছিলেন :
কতক্ষণ জলের তিলক থাকে ভালে?
কতক্ষণ থাকে শিলা শূন্যে মারিলে?
