ইস্তের রাজার সম্মুখে উপস্থিত হলেন। রাজা বললেন, ইস্তের রানি, তোমার নিবেদন কী? রাজ্যের অর্ধেক পর্যন্ত হইলেও তাহা সিদ্ধ করা যাইবে। ইস্তের বললেন, যদি মহারাজের ভালো বোধ হয় তবে ইহুদিদিগকে বিনষ্ট করণার্থে যে সকল পত্র লিখিত হইয়াছে সে সকল ব্যর্থ করিবার জন্য লেখা হউক। কেননা আমার জাতির প্রতি যে অমঙ্গল ঘটিবে, তাহা দেখিয়া আমি কীরূপে সহ্য করিতে পারি? আর আপন জ্ঞাতি কুটুম্বের বিনাশ দেখিয়া কীরূপে সহ্য করিতে পারি?
রাজা তদণ্ডেই ইহুদিদিগকে অভয় দিলেন। তার সে পত্র অহশ্বেরশ রাজার নামে লিখিত ও রাজার অঙ্গুরীয়ে মুদ্রাঙ্কিত হইল, পরে দ্রুতগামী বাহনারূঢ় অর্থাৎ বড়রাজার রাজকীয় অশ্বে আরূঢ় ধাবকগণের হস্তদ্বারা সেই সকল পত্র প্রেরিত হইল। (ধর্মপুস্তক অর্থাৎ পুরাতন ও নতুন নিয়ম, এস্টের, ১– ৮; ২-১৩)।
.
দুষ্ট মন্ত্রীর চক্রান্ত বুঝতে পেরে রাজা গণনিধনের মতো মহাপাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সমর্থ হন। বাংলাদেশের এই ন মাস-জোড়া গণনিধন প্রচেষ্টা বিশ্বজন শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল– সাহায্য করল একমাত্র ভারত। সে তার ধর্মবুদ্ধি বাইবেল থেকে সগ্রহ করে না। শুনেছি, রাষ্ট্রপতি নিকসন খ্রিস্টান; তাই বিবেচনা করি তিনি বাইবেল পড়েননি। কিন্তু এহ বাহ্য।
আমার মনে প্রশ্ন জাগে, ইয়েহিয়া যখন ব্ল্যাক বিউটির স্বজাতি, জ্ঞাতি কুটুম্বের সর্বনাশ করেছিলেন তখন তিনি কি একবারের তরেও ভাবেননি–ইস্তেরের আপন ভাষায় আপন জ্ঞাতি কুটুম্বের বিনাশ দেখিয়া কী করিয়া সহ্য করিতে পারি?
এ কাহিনীর একটি ঘটনার উল্লেখ আমি এতক্ষণ করিনি।
পিতৃব্য যখন ইস্তেরকে আদেশ দেন তিনি যেন রাজার নিকটে প্রবেশ করেন, তখন ইস্তের প্রথমটায় ভয় পেয়েছিলেন, কারণ, প্রজারা সকলেই জানে, পুরুষ কি স্ত্রী, যে কেহ আহত না হইয়া ভিতরের প্রাঙ্গণে রাজার নিকট যায়, তাহার জন্যে একমাত্র ব্যবস্থা এই যে, তাহার প্রাণদণ্ড হইবে।
পিতৃব্য ইস্তেরের ভীতির কথা শুনে তাঁকে জানান :
সমস্ত ইহুদির মধ্যে কেবল তুমি রাজবাটিতে থাকাতে রক্ষা পাইবে, তাহা মনে করিও না। ফলে যদি তুমি এ সময়ে সর্বতোভাবে নীরব হইয়া থাক তবে অন্য কোনও স্থান হইতে ইহুদিদের উপকার ও নিস্তার ঘটিবে (বাংলাদেশের বেলা তাই হল– লেখক), কিন্তু তুমি আপন পিতৃকুলের সহিত বিনষ্ট হইবে; আর কে জানে যে, তুমি এইপ্রকার সময়ের জন্যই রাজ্ঞীপদ পাও নাই (এস্থলে রাজবল্লভা হও নাই?)
বাঙালির উপকার ও নিস্তার ঘটেছে, এখন প্রশ্ন ব্ল্যাক বিউটি কি নিস্তার পেয়েছেন? কিন্তু এই সর্ব বাক্য বাহ্য।
ব্ল্যাক বিউটি গৌণ, তার বৈধব্যপ্রাপ্তি গৌণ, তাঁর সর্বৈব গৌণ।
পৃথিবীর গণনিধন ইতিহাসে ইস্তেরে তার প্রথম প্রামাণিক উল্লেখ।
অধম যখন তার প্রথম অবতরণিকায় বলেছিল, এ ন মাসের বহু বিচিত্র ঘটনা থেকে সৃষ্ট হবে পুরাণ, এপিক, রূপকথা, লোকগীতি তখন সে ক্ষণতরে বিস্মৃত হয়েছিল যে রচিত হবে সর্বোপরি নবীন শাস্ত্রগ্রন্থ।
.
শেখের জয়
সাধারণ নির্বাচন তথা গণতন্ত্রের আশ্বাস দিয়ে পরে সে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে কেউ যে কখনও, এমনকি এ যুগে, সঁটে রাজত্ব করেননি এমন নয়। কিন্তু ইয়েহিয়া জানতেন, রাজত্ব তিনি করতে পারবেন তবে সে রাজত্ব দীর্ঘস্থায়ী হবে না– অতখানি দূরদৃষ্টি তাঁর ছিল। তদুপরি উভয় পাকিস্তানের লোক ঝাড়া সাড়ে দশটি বচ্ছর ধরে স্বাধিকারপ্রমত্ত ডিকটেটরি শাসনের চাবুক খেয়ে খেয়ে হন্যে হয়ে উঠে আইয়ুবের পতন ঘটিয়েছে; ইয়েহিয়াও যদি ডিকটেটরি করতে চান তবে তাকেও মোটামুটি আইয়ুবের প্যাটার্নই বুনতে হবে এবং জোলাপ দিতে হবে আরও বড়া এবং কড়া ডোজে। কারণ ইতোমধ্যে জনসাধারণ ডিকটেটরি ফন্দিফিকির খাসা বুঝে গিয়েছে এবং সেগুলোকে কী কৌশলে বানচাল করতে হয় সেটাও বিলক্ষণ রপ্ত করে। নিয়েছে। একটি সামান্য সরেস উদাহরণ দিই। যারা সুদুমাত্র আলা ভিনসেন্ট স্মিৎ এবং তাঁর গুরুকুল মোগল অ্যাডমিনিসট্রেশনের ওয়াকেআ-নবিস (waknis) পর্চা-নবিস সম্প্রদায়ের নিছক সন তারিখসহ ঘটনার ফিরিস্তি সর্বোৎকৃষ্ট পাঠ্যবস্তু বলে বিশ্বাস করেন আমি তাদের সেবা করার মতো এলেম পেটে ধরিনে। আমি বরঞ্চ সেইসব মোগল লেখকেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করি যারা ইতিহাসের বাহানায় গালগল্প শোনাতেন, মাঝেমিশেলে গুল তক মারতেন! অর্থাৎ ঘুমন্ত ইতিহাসের হাত দিয়ে গাঁজা খেয়ে নিতেন।
লোকটি আমার ভায়রা। গাদাগোব্দা ইয়া লাশ! রসবোধ প্রচুর। তিনি তখন মৈমনসিংয়ের সিভিল সার্জন। কী একটা ছোট্ট চাকরি খালি পড়েছে। এমন সময় আইয়ুবের প্যারা গবর্নর মোনেম খান করলেন ডাক্তারকে ট্রাঙ্ক-কল। হুঙ্কার দিয়ে বললেন, অমুককে চাকরিটা দেবে। পরিচয় যৎসামান্য কিন্তু সুবেদার মোনেম বাপের বয়সী লোককেও তুমি তুই করতেন।
ডাক্তার ফোনের ক্রেডলকে বাও বাও করতে করতে সবিনয় বললেন, নিশ্চয়, নিশ্চয়।
পরের দিনেই ফাইনাল ডিসিশন। ডাক্তার গবর্নরের প্যারাকে নোকরি দিলেন না।
সন্ধ্যার সময় ঢাকা থেকে ফের ট্রাঙ্ক-কল।
কী, তোমার এত আস্পদ্দা! আমার হুকুম অমান্যি করলে? জানো, আমি তোমার চাকরি খেতে পারি
এইটে ছিল তাঁর হট্টফেভূরেট হুমকি! জাতে ছিলেন মাছি-মারা বটতলীয় সিকি কড়ির উকিল। কাজ ছিল আদালতকে হুজুর হুজুর-এর প্রচুর তৈলমর্দন করে দু চারটে জামিন মঞ্জুর করিয়ে নিয়ে হুমা গাঁয়ের বাড়িতে হাঁড়ি চড়ানো কড়ি কামানো। এসব আমার শোনা কথা। তবে মোনেম সম্বন্ধে দশের মুখ যা বলছে তার থেকে আমার মনে কোনও সন্দেহ নেই, স্বয়ং হিটলারও এমন তাঁবেদার খিদমৎগার মোসায়েব কপালে নিয়ে ডিকটেটর হননি- আইয়ুবের কপালে যা নেচেছিল।
