ইয়েহিয়া উপরে উল্লিখিত চালের দ্বিতীয়ার্ধ সুসম্পন্ন করেননি, তবে এস্থলে কালো মানিক কাহিনীর কালানুক্রমিক ক্রমবিকাশ ছিন্ন করে পরবর্তী একটি ঘটনার উল্লেখ করলে কাহিনীটির পরম্পরা অক্ষুণ্ণ থাকে : ভুট্টো রাজা হয়ে ইয়েহিয়ার চরিত্রদোষ নিয়ে গবেষণা করার জন্য পরশ্রীকাতরদের যে সময় লেলিয়ে দিলেন ঠিক সেই সময়ে ব্ল্যাক বিউটির কাবিননামা-সম্মত স্বামী অস্ট্রিয়ার পদস্থলে অকস্মাৎ হার্টফেল করে সাধনোচিত ধামে প্রস্থান করেন। বিবির ওপর সে ঘটনা কী প্রকারের প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল সে বিষয়ে সমসাময়িক ইতিহাস নীরব।
তবে তিনি তার বহু পূর্বেই ইয়েহিয়ার গৌরবসূর্যের মধ্যগগনকালে মাদাম পম্পাদুরে পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছেন।
যে বাড়ির উপরের তলায় বসে ইয়েহিয়া দোর্দণ্ড প্রতাপে রাজত্ব করতেন তার নিচের তলায় বসতেন আর্মির হোমরা-চোমরারা। তারা সরকারি তাবৎ কাগজপত্র, বিশেষ করে সরকারি বেসরকারি স্পাইদের রিপোর্ট পড়তেন, আপসে আলোচনা করে সিদ্ধান্তগুলো পেশ করতেন হুজুরের কাছে দোতলায়, তার শেষ হুকুমের জন্য সে বাবদে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ স্বাধীন। নিচের তলায় আঁদরেলদের মোড়ল ছিলেন ইয়েহিয়ার সর্বোচ্চ পদধারী স্টাফ অফিসার লেফটেনেন্ট-জেনারেল পিরজাদা। ইনিই ছিলেন রাজা ইয়েহিয়ার চাণক্য– কদর্থে।
কিন্তু যে-ই হোন, আর যা-ই হোন, সব্বাইকে প্রথম যেতে হত কালো মানিকের খাস-কামরায়– এস্তেক পিরজাদাকেও। সে যাওয়াটা নিতান্ত একটা লৌকিকতা ছিল বলে মনে হয় না। তবে কি তিনি ইয়েহিয়াকে ততখানি গ্রাস করতে পেরেছিলেন, যতখানি সেক্রেটারি বরমান নাটকের শেষাঙ্কে হিটলারকে কজায় এনেছিলেন? এ বিষয়ে আমার অসীম কৌতূহল। কারণ যে বাইবেল থেকে আমি অল্পক্ষণ আগে একটি উদাহরণ দিয়েছি সেই বাইবেলেই আরেকটা উদাহরণ আছে সেটা কালো মানিকের সঙ্গে টায় টায় মিলে যায়। পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি হতে পারে, কিন্তু আমি নিরুপায়। রগরগে কেলেঙ্কারি কেচ্ছার কাহিনী লেখার জন্য আমার চেয়ে যোগ্যতর অনেক গুণী আছেন। অধম সর্বক্ষণ সর্ব ঘটনার পূর্ব উদাহরণ খোঁজে ধর্মের তুলনাত্মক ইতিহাসে।
ইরানের দিগ্বিজয়ী সম্রাট অশ্বেরশ- Artaxerxes আপন রানির ব্যবহারে ক্রুদ্ধ হয়ে অন্য রানির সন্ধানে রাজপ্রাসাদে অসংখ্য সুন্দরী সমবেত করলেন তাঁর বিশাল রাজত্বের ভিন্ন। ভিন্ন প্রদেশ থেকে। এঁদেরই একজন ইহুদি তরুণী সুন্দরী ইস্তের। নম্র স্বভাব ধরে ও অল্পে সন্তুষ্ট। রাজা স্বয়ং বিশুদ্ধ আর্য বংশীয়; পক্ষান্তরে ইহুদিদেরও জাত্যাভিমান কিছুমাত্র কম নয়– তারা সদাপ্রভু যেহোভার স্বনির্বাচিত সর্বশ্রেষ্ঠ জাত। ইস্তেরের সৌন্দর্যে ও আচরণে মুগ্ধ হয়ে রাজা স্বহস্তে তার মাথায় রাজমুকুট পরিয়ে দিলেন।
রাজার প্রধানমন্ত্রী হামন ইহুদিদের প্রতি এতই বিরূপ ছিলেন যে, সে জাতকে সম্পূর্ণরূপে বিনাশ করার উদ্দেশ্যে রাজার সম্মুখে নিবেদন করলেন :
(বাইবেলের ভাষায়) আপনার রাজ্যের সমস্ত প্রদেশস্থ জাতিগণের মধ্যে বিকীর্ণ অথচ পৃথককৃত এক জাতি আছে (বাঙালরা সর্বত্র বিকীর্ণ না হলেও তারা যে অত্যন্ত পৃথককৃত সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই– লেখক); অন্য সকল জাতির ব্যবস্থা হইতে তাহাদের ব্যবস্থা ভিন্ন (পাঞ্জাবি পাঠান বেলুচদের ব্যবস্থা থেকে বাঙালির ব্যবস্থা যে ভিন্ন সে-কথা তারাও জানে, আমরাও জানি। হামন বলেননি, কিন্তু এস্থলে আমরা, বাঙালিরা বলি, এবং তাই নিয়ে আমরা গর্ব অনুভব করি লেখক); এবং তাহারা মহারাজের ব্যবস্থা পালন করেন না। হামনের মতে এইটেই তাদের সর্বপ্রধান পাপ। আমরা বাঙালিরা বলি, পালন করেছি, পালন করেছি– সাধ্যমতো পালন করেছি, ঝাড়া তেইশটি বছর ধরে। নিতান্ত যখন সহ্যের সীমানা পেরিয়ে গিয়েছে তখন আপত্তি জানিয়েছি অত্যন্ত অহিংসভাবে; খানরা যখন নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালিয়েছে।
হামন তাই সর্বশেষে সম্রাট অহরেশের সামনে নিবেদন করলেন :
যদি মহারাজের অভিমত হয়, তবে তাহাদিগকে বিনষ্ট করিতে লেখা হউক।
ম্রাট সেই আদেশ দিলেন। এবং যেহেতু তিনি সম্রাট তাই লুকোচুরির ধার ধারেন না। তাই তার লিখিত আদেশ ধাবকগণ দ্বারা রাজার অধীন সমস্ত প্রদেশে প্রেরিত হইল যে একই দিনে, অদর মাসের ত্রয়োদশ দিনে যুবা ও বৃদ্ধ, শিশু ও স্ত্রী সুদ্ধ সমস্ত ইহুদি লোককে সংহার, বধ ও বিনাশ এবং তাহাদের দ্রব্য লুট করিতে হইবে।
ইয়েহিয়া রাজা নয়। দারওয়ান বংশের দাস। সে ২৫ মার্চ শেখ মুজিব এমনকি তার ইয়ার ভুট্টোকে না জানিয়ে– ভুট্টোকেও বিশ্বাস নেই, পাছে সে ফাঁস করে দেয়– ঢাকা থেকে পালিয়ে যাবার সময় তার কসাই টিক্কা খানকে আদেশ দিয়ে যায়, আমি নির্বিঘ্নে করাচি গিয়ে পৌঁছই– বলা তো যায় না, দ্যাট উয়োমেনের হুকুমে ইন্ডিয়ানরা আমার প্লেনে বঙ্গোপসাগরে বা আরব সাগরে হামলা করতে পারে। করাচি গিয়ে মাত্র তিনটি শব্দের একটি কোড রেডিয়োগ্রাম পাঠাব–সর্ট দেম আউট- টেনে টেনে বের কর বাছাই বাছাই মাল। বাকিটা যথাস্থানে হবে। ইস্তেরের কাহিনীতে ফিরে যাই।
বলা বাহুল্য, ইহুদিদের ভিতর হাহাকার পড়ে গেল।
ইস্তেরের পিতৃব্য তখন রাজার কঠোর আদেশ তাঁকে জানালেন এবং তিনি যেন রাজার নিকটে প্রবেশ করিয়া তাহার কাছে বিনতি ও স্বজাতির জন্য অনুরোধ করেন, এমন আদেশ করিতে বলিলেন।
