ইয়েহিয়া বাপ-পিতেম-র ব্যবসাটি ডোবালেন। পাকিস্তানের রক্ষক ভক্ষক হলেন। বদহজমি হল। কবরেজ ভুট্টো তাকে প্যাঁজ পয়জারের জোলাপ বড়ি দিলেন ঠেসে। ইয়েহিয়ার ব্যক্তিগত চরিত্র বয়ান একটু পরে আসছে।
.
ইয়েহিয়া অবতীর্ণ হলেন মূর্তিমান কল্কিরূপে। একহস্তে গণতন্ত্র অন্যহস্তে পুব বাংলার প্রতি বরাভয় মুদ্রা। পূর্বেই নিবেদন করেছি, তিনি স্বীকার করলেন, পুব বাংলার প্রতি অবিচার করা হয়েছে। তিনি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে তাবৎ মুশকিল আসান করে দেবেন। যেসব মিলিটারি পিচেশ তাঁকে গদিতে বসিয়েছিল তারা ঘেন্নার সুরে বললে, বটে!
বহু লোকের বিশ্বাস ইয়েহিয়া সেপাই; সেপাই মাত্রই বুদ্ধ হয়, অন্তত সরল তো বটে। তদুপরি তিনি মদ্যপান করেন প্রচুরতম। একবার নাকি সন্ধ্যাবেলা তার একটা বেতার ভাষণ দেবার কথা ছিল। ইংরেজ বলে, গড় মেড় সিক্স ও ক্লক ফর হুইস্কি। সে সিক্স সন্ধ্যার ছটা। ইয়েহিয়া ঘুলিয়ে ফেলে সেটা সকাল ছটায় সরিয়ে এনেছেন। তদুপরি তখন বাস করেন পাঞ্জাবে এবং পঞ্চনদভূমি যে পঞ্চম-কারের পীঠস্থল সেকথা ক্রমে ক্রমে ঢাকা চাটগাঁর ধর্মভীরু মুসলমান পর্যন্ত জেনে গিয়েছিল ক্লাবে ক্লাবে পাঞ্জাবি সিভিলিয়ান অফিসারদের মেয়েমদ্দে হইহই বেলেল্লাপনা করা দেখে। বিস্ময় মেনে একে অন্যকে শুধিয়েছে এরাও মুসলমান? সেকথা উপস্থিত থাক। সাঁঝের ঝোঁকে ইয়েহিয়ার বেতার ভাষণ দেবার কথা। কিন্তু তিনি তখন এমনই বে-এক্তেয়ার যে কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। মুলতবি করা হল ঘণ্টা দুয়েকের তরে। তখনও অবস্থা তদবৎ। শেষটায় রাত দশটা না বারোটায়, বার দুই মুলতবি রাখার পর আমি সঠিক জানিনে– মাই-ডিয়ার-মাই-ডিয়ার জড়ানো গলায় তিনি লিখিত ভাষণের পঠন কর্মটি সমাধান করে পাক বেতার কর্তৃপক্ষকে চিরকৃতজ্ঞতাপাশে বন্ধন করলেন।
অথচ লোকটা অতিশয় ঘড়েল, কুচক্রী, বিবেকহীন এবং পাশবিকতম অত্যাচারের ব্যবস্থা করাতে অদ্বিতীয়। আমি ভেবে-চিন্তেই অদ্বিতীয় বললুম। একাধিক ফ্রয়েডিয়ান ঐতিহাসিকের মুখে আমি শুনেছি–আর নিজে তো পড়েছি ভূরি ভূরি তাদের জানা মতে, কিংবদন্তীর ওপর বরাত না দিয়ে, কেবলমাত্র প্রামাণিক ইতিহাসের ওপর নির্ভর করে বলতে গেলে পৈশাচিক নিষ্ঠুরতায় হাইনরিষ হিমলার অদ্বিতীয়। ১৯৭১-এর পর এদের সঙ্গে দেখা হয়নি। আমার মনে কণামাত্র সন্দেহ নেই, এখন তারা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করবেন ইয়েহিয়ার তুলনায় হিমলার দুগ্ধপোষ্য শিশু শিশু শিশু।
কারণ হিমলারের বিরুদ্ধে কি ন্যুর্নবের্গ, কি হল্যান্ড বেলজিয়ম বা অন্যত্র এ অভিযোগ কস্মিনকালেও উত্থাপিত হয়নি যে তার চেলাচামুণ্ডারা নারীধর্ষণ করেছে। তাদের স্তনকর্তন, দেহে উত্তপ্ত লৌহ দ্বারা লাঞ্ছন-অঙ্কন এবং অবর্ণনীয় অন্যান্য অত্যাচারের কথাই ওঠে না।
ইয়েহিয়ার পৈশুন্য গ্রামে এ আইটেম ছিল। এবং সর্বপ্রকার পৈশাচিক ক্রুরতায় দক্ষতা লাভের জন্য কোনও এক দেশে বিশেষ একটা প্রতিষ্ঠান আছে। ইয়েহিয়া তার জোয়ান এবং অফিসারের বাছাই বাছাই স্যাডিস্টদের সেখানে পাঠায়।
কিছুদিন পূর্বে ভুট্টো প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশে ইয়েহিয়ার মিলিটারি বলপ্রয়োগে আমার সম্মতি ছিল তবে অ-ত খানি না।
.
ইস্তের
পূর্ব-পশ্চিম উভয় পাকিস্তানের পয়লা নম্বরি নটবর ছিলেন– এখানে সীমিতভাবে আছেন– ইয়েহিয়া খান। তিনি তাঁর হারেমের জন্য জড়ো করেছিলেন দেশ-বিদেশ থেকে হরেক রকম চিড়িয়া। এরকম একটা আজব কলেকশন কে না একবারের তরে নয়ন ভরে দেখতে চায়? ইয়েহিয়ার কাবেল ব্যাটাও দেখলেন, এবং একটিতে মজেও গেলেন। কুলোকে বলে বাপ-ব্যাটাতে নাকি তাকে নিয়ে রীতিমতো ঝগড়া-কাজিয়া হয়। আখেরে বাপই নাকি জিতেছিলেন। এই নিয়ে পাকিস্তান বাংলাদেশ উভয় মুল্লুকের সংবাদপত্রে মেলা রগরগে কেচ্ছা বেরোয়। আমাকে এক সাংবাদিক শুধোলেন, মেয়েটা এ লড়ায়ে নিল কোন পক্ষ? আমি বললুম, দুটো কুকুর যখন একটা হাড্ডির জন্য লড়ে তখন হাড্ডিটা তো কোনও পক্ষ নেয় না। এটা আপ্তবাক্য; আমার আবিষ্কার নয়। সাংবাদিক তখন আরও বিস্তর নয়া কেচ্ছাকাহিনী শোনালেন।
তবে হ্যাঁ, একথা নাকি কেউই অস্বীকার করেনি যে তার হারেমের মুকুটমণি নাকি পুব বাঙলার একটি মেয়ে। তিনি শ্যামা। তাই তার পদবি ব্ল্যাক বিউটি–কালো মানিকও বলতে পারেন। তাঁর স্বামী একদা পূর্ব পাকিস্তানের পুলিশ অফিসার ছিলেন এবং ইয়েহিয়া একবার সে শহর পরিদর্শন করতে গেলে তার গৌরবে চিরপ্রথানুযায়ী বিরাট এক পার্টি দেওয়া হয়–কিংবা তিনিই দেন। সে পার্টির প্রাণ ছিলেন ব্ল্যাক বিউটি। বর্ণনাতীত স্মার্ট। ইয়েহিয়া মুগ্ধ হলেন। উভয়কে ইসলামাবাদে বদলি করা হয়। পুলিশম্যানকে অস্ট্রিয়া না কোথায় যেন রাজদূতরূপে পাঠানো হল। এটা কিছু নতুন পদ্ধতি নয়। তিন-চার হাজার বছর পূর্বে ইহুদিদের রাজা ডেভিড এক বিবাহিত রমণীতে মুগ্ধ হয়ে তাকে গর্ভদান করেন। এবং যে রণাঙ্গনে তখন যুদ্ধ চলছিল সেখানে (বাইবেল থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি) দায়ূদ মোয়ারের নিকটে (সেনাপতিকে) এক পত্র লিখিয়া উরিয়ের (ওই রমণীর স্বামীর হাতে দিয়া পাঠাইলেন। পত্রখানিতে তিনি লিখিয়াছিলেন, তোমরা এই উরিয়কে তুমুল যুদ্ধের সম্মুখে নিযুক্ত কর, পরে ইহার পশ্চাৎ হইতে সরিয়া যাও, যেন এ আহত হইয়া মারা পড়ে। (শমুয়েল ১১, ৮-২৪)।
