[*গুরুগম্ভীর পাণ্ডিত্যপূর্ণ প্রবন্ধে যেখানে ফুটনোট অবর্জনীয় সে স্থলেও ওই প্রতিষ্ঠানটি আকছারই পীড়াদায়ক। আমার আটপৌরে হাবিজাবির বেলা তো কথাই নেই। তাই সরল পাঠককে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, তিনি আমার রচনার ফুটনোট না পড়লে মোটেই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না– (আসল না পড়লেও হবেন কি না সেটাও বিতর্কাতীত নয়)। আসলে ফুটনোটে এমন কিছু থাকা অনুচিত যেটা না পড়লে পরের মূল লেখা বুঝতে অসুবিধা হয়। অবশ্য মূলে (টেকসটে) কোনও তারাচিহ্ন দেখে যদি পাঠকের মনে হয় এই বিষয়ে কিঞ্চিৎ আশকথা-পাশকথা শুনতে চান তবে সেটি সাধু প্রস্তাব। কিংবা আপনি রোক্কা একটি টাকা খরচা করেছেন বলে পত্রিকার বিজ্ঞাপন তক বাদ দিতে চান না তবে সেটা সাধুতর প্রস্তাব। কিন্তু পুনরপি হা–ফি–জ! ফুটনোট পড়ার বাধ্যবাধকতা নেই। সার্ভে শব্দের গুজরাতি অনুবাদ সিংহাবলোকন। সিংহ যেরকম পাহাড়ের উপরে উঠে মাথা এদিকে-ওদিকে ঘুরিয়ে চতুর্দিকে বিস্তৃত দৃষ্টিনিক্ষেপ করে সবকিছু দেখে নেয়। শব্দটি পর্যবেক্ষণজাত এবং সুন্দও বটে, বাঙলায় চালু হলে ভালো হয়।]
১৯৬৯ সালের ২৫/২৬ মার্চ সকালবেলা পূর্ব পশ্চিম উত্তর পাকিস্তানের জনসাধারণ শুনতে পেল ছোট হিটলার ডিনেস্টির পয়লা চোট্টা-ওয়ালা হিটলার স্বপ্রশংসিত স্বনির্বাচিত উপাধি ফিল্ড মার্শাল বিভূষিত, পৃথিবীর অন্যতম কোটিপতি, মার্কিন প্রেসিডেন্টের দোস্ত, মহামহিম শ্ৰীযুত আইয়ুব খানের পশ্চাদ্দেশে একখানি সরেস পদাঘাত দিয়ে জেনারেল আগা মুহম্মদ ইয়েহিয়া খান সুবে পাকিস্তানের চোটা হিটলার দি সেকেন্ড রূপে গদিনশিন হয়েছেন। কিন্তু বিসমিল্লাতেই গয়লৎ (গলৎ)। আগা উপাধি সচরাচর ধারণ করেন ইরানবাসী শিয়ারা– খান উপাধিধারী হয় সুন্নি পাঠানেরা। এ যেন সোনার পাথরবাটি। কিন্তু খান অনেক সময় সম্মানার্থে সকলের নামের পিছনেই জুড়ে দেওয়া হয়– কাবুলে আমার এক জনপ্রিয় সখা বারেন্দ্র ব্রাহ্মণের নামের পিছনে কাবুলিরা খান জুড়ে দিত। সেটা কিছু আশ্চর্য নয়। এই সোনার বাংলাতেই পশুপতি খান গয়রহ আছেন।
আইয়ুবের পতনে পূর্ব বাংলায় যে মহরমের চোখের পানি ঝরেনি সেটা বলা বাহুল্য। একে তো তিনি আহাম্মুখের মতো কতকগুলি মিলিটারি ইডিয়টের পাল্লায় পড়ে শেখ সাহেবের বিরুদ্ধে একটা সম্পূর্ণ মনগড়া ষড়যন্ত্রের মামলা খাড়া করার হুকুম দেন, তদুপরি বিশ্বাসভাজন এক মার্কিন পত্রিকা হাটের মধ্যিখানে একটি প্রকাণ্ড বিষ্ঠাভাণ্ড ফাটিয়ে দিয়ে প্রকাশ করে দেয় যে মাত্র সাত বছর রাজত্বকালের মধ্যেই (১৯৬৫) তিনি কুল্লে পঁচিশ কোটি টাকার ধনদৌলত, ইতালির একটা দ্বীপে বিশাল জমিদারি (ওই অঞ্চলে টুরিজম-এর জন্য ইতালীয় সরকারের বিস্তর কড়ি ঢালার মতলব ছিল যার ফলে ধূলি-মুষ্টি রেডিয়াম-মুষ্টিতে পরিণত হত) সাপটে নিয়েছেন আর ইওরো-মার্কিন ব্যাঙ্কে ব্যাঙ্কে কত ডলার পাউন্ড, সুইস ফ্রাঁ জমা আছে তার হিসাব বের করা অসম্ভব। কোনও কোনও দেশের ব্যাঙ্ক সে-দেশের ইনকাম ট্যাক্স বিভাগ, অর্থাৎ স্বয়ং সার্বভৌম সরকার জানতে চাইলেও ঠোঁট সেলাই করে বসে থাকে।… ইয়েহিয়া রাজা হয়ে আইয়ুবের দৌলতের খোঁজে বেরিয়েছিলেন বলে কোনও খবর অন্তত আমি পাইনি। এটা পশ্চিম পাকের একটা সাদা-কালিতে লেখা আইন; ইসকন্দর মির্জাকে গদিচ্যুত করার পর আইয়ুব তাঁর ধনদৌলতের সন্ধান নেননি। ইয়েহিয়াও আইয়ুবের হাঁড়ির চাল হাঁড়িতেই রাখতে দিলেন। শুধু তাই নয়। আগাপাশতলা হাতের কজায় পোরা পাকিস্তানি প্রেসকে জবানি হুকুম দেওয়া হল, আইয়ুব খানের খেলাপে যেন উচ্চবাচ্য না করা হয়। ইনি মিলিটারির জাদরেল, উনিও মিলিটারি আঁদরেল– কাকে কাকের মাংস খায় না বাংলা কথা।
ইয়েহিয়া জাতে কিজিলবাশ। তিনি দাবি ধরেন, তিনি নাদিরের বংশধর। ওই নিয়ে গবেষণা করার মতো দলিল-দস্তাবেজ আমার নেই। তাঁর আদত পিতৃভূমি নাকি নাদিরের দেশে! ভুট্টোর বাস্তুভিটে লারখানাতে। তার অতি কাছে মোন-জো-দড়ো।* তিনি যদি আজ দুম করে দাবি জানান মোন-জো দড়োতে গলকম্বল দাড়িওলা যে রাজপানা চেহারার মূর্তিটি আবিষ্কৃত হয়েছে তিনি তার বংশধর, তবে ওই মোন-জো দড়োর আবিষ্কর্তা স্বয়ং রাখালদাস বাঁড়ুয্যে কি ধরাতলে অবতীর্ণ হয়ে বুক ঠুকে প্রমাণ করতে পারবেন তিনি আর পাঁচটা সিন্ধির মতো সাড়ে বত্রিশ ভাজার বর্ণসঙ্কর।
[*টীকা-পাঠ-নীতি উপেক্ষা করে যারা এটি পড়ছেন তাঁদের জানাই, শব্দটা এমনি ভিন্ন ভিন্ন। বিদকুটে ঢঙে উচ্চারিত হয় যে তার শুদ্ধ উচ্চারণ নিয়ে আলোচনা সম্পূর্ণ অবান্তর নয়। সিন্ধি ভাষায় মো=মৃত (সংস্কৃত মৃ বাংলা মৃত) মোন-এর ন বহুবচন বোঝায়। জা= –দের (S)। দড়ো=টিলা। একুনে মৃতদের টিলা। এক অত্যুৎসাহী সংস্কৃতজ্ঞ এটা লিখেছেন মহেন্দ্রদ্বার।]
কিন্তু কিজিলবাশ শব্দটি বাংলা ভাষায় সম্পূর্ণ অপরিচিত নয়। ভারতচন্দ্র লিখেছেন, রাজা বসে আছেন; তার চতুর্দিকে কিজিলবাশ। টীকাকার ভেবেছেন কিজিল কথাটা কাজল হবে– লিপিকারের ভুল। আর বাস মানে তো কাপড়। কালো পর্দার মাঝখানে রাজা বসে আছেন। আসলে কিজিল-বাশ মানে লাল টুপি (আমি যদূর জানি, চুগতাই তুর্কি ভাষায়)। কিজিল-বাশরা লাল টুপি পরত এবং ভারতবর্ষে প্রধানত দেহরক্ষী বা দরোয়ানের কাজ করত। আজ আমরা যেরকম ভোজপুরি বা নেপালি দরওয়ান রাখি, বিদেশি বলে এ দেশের চোর-চোট্টারা চট করে এদের সঙ্গে দোস্তি জমাতে পারবে না বলে। কিজিল-বারা শিয়া। এ দেশের সুন্নিদের ঘেন্না করে। ষড়যন্ত্রকারী বা চোর-চোট্টাদের পাত্তা দেবে না।
