পাকিস্তানের ফরেন পলিটিকস অধ্যায়ে এর সবিস্তার বয়ান দেব। এই শিয়া, সুন্নি, কাদিয়ানি (স্যর জফরুল্লা কাদিয়ানি এবং সাধারণ কাদিয়ানিজন সুন্নি-শিয়া উভয়কে কাফির বিবেচনা করে) বোরা, খোঁজা, মেমনদের মতবাদ সম্বন্ধে কি দিশি কি বিদেশি সর্ব রিপোর্টার উদাসীন। এ যেন আইয়ার, আয়েঙ্গার, ব্রামিন, নব্রামিন সম্বন্ধে খবর না নিয়ে দক্ষিণ ভারতের রাজনীতি আলোচনা করা।]
(এদের ভয়ে পাসপোর্টও দেওয়া হয়েছিল। কারণ সিংহলে উড়োজাহাজে তেল নেবার সময় পালের পর পাল জঙ্গি-ইউনিফর্ম পরা সৈন্যবাহিনী যাচ্ছে দেখলে সিংহল কর্তৃপক্ষ যুদ্ধের প্রস্তুতি বন্ধ করে দিতেন। কিন্তু না-পাক জাঁদরেলদের আজব হস্তীবুদ্ধি দেখে তাজ্জব মানতে হয়! সক্কলেরই একই কাপড়ের একই কাটের একই জামা-জোড়া যদি হয় তবে সেটাও তো একটা ইউনিফর্ম। হোক না সে সিভিল। বস্তুত যে ঢাকার লোককে ফাঁকি দেবার চেষ্টা করা হয় তারা– খানদানি উর্দু ভাষায়– ফৌরনকে পাঁচ মিনিট পহলে অর্থাৎ তদ্দণ্ডেই বিলক্ষণ হুঁশিয়ার হয়ে যায় এসব ভেড়ার-ছাল-পরা নেকড়ের পাল)।
শেখ সাহেব চাণক্য মাকিয়াভেরি স্কুলে-পড়া কূটনৈতিক নন। কিন্তু গাঁয়ের লোক– ক-সের ধানে ক-সের চাল হয় অন্তত সে হিসাবটুকু তার আছে। পাঞ্জাবি পাঠানদের এই হাতি-মার্কা স্থূল প্যাঁচটি বোঝবার জন্য তাঁকে মার্কিন কমপুটারের শরণ নিতে হয়নি। কিন্তু তিনি তার দিকটা সাফসুরো রাখতে চেয়েছিলেন; ঘরে বাইরে কেউ যেন পরে না বলে তিনি অভিমানভরে গোসাঘরে খিল দিয়েছিলেন।
তাই তিনি দুই অর্থশাস্ত্রবিশারদ সুবহান, কামালকে তাজউদ্দীনের সঙ্গে পাঠিয়েছিলেন। একদিক দিয়ে দেখতে গেলে তাদের কাজটি খুব কঠিন ছিল না। কারণ ক্ষুদে হিটলার দি সেকেন্ড হওয়ার কয়েক মাস পরেই ইয়েহিয়া সর্বজন সমক্ষে (বেতার ও টেলিতে) দরদি গলায় স্বীকার করেছেন, পূর্ব পাকিস্তানিদের অসন্তুষ্ট হওয়ার যথেষ্ট ন্যায়সঙ্গত কারণ আছে। রাষ্ট্রের যে উচ্চ পর্যায়ে মীমাংসা গ্রহণ করা হয় এবং আরও কতকগুলি জাতীয় কার্যকলাপে তাদের পুরো সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি। এখন তা হলে দাঁড়াল এঁরা পিণ্ডির চেলাচামুণ্ডাদের হাতুড়ি ঠুকে ঠুকে দফে দুফে বোঝাবেন শিল্পে-বাণিজ্যে সর্বক্ষেত্রে পূর্ব বাংলা স্বাধীনতার চব্বিশ বছর পরও কী মারাত্মকরকম পঙ্গু হয়ে আছে।
কী কথাবার্তা হয়েছিল, বস্তুত তারা আদৌ সে সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, জানিনে। তবে আজ আমি এ প্রসঙ্গ তুলছি কেন?
হ্যাঁ, আজই তুলছি। আজ জষ্টি মাসের পয়লা তারিখ আপনি যান ঢাকার নিউ মার্কেটে। সেখানে জলজ্যান্ত পষ্ট দেখতে পাবেন এই দুই পণ্ডিতের গভীর গবেষণা কীভাবে জলজ্যান্ত চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। শুনেছি, বিলেতের কোন এক কোম্পানি ছুঁচ থেকে আরম্ভ করে হাতি পর্যন্ত বিক্রি করে। এখানে করে না। একদা করত। আজ কোনওকিছু চাইলেই সে এক পেটেন্ট উত্তর পশ্চিম পাকিস্তানে তৈরি হত : এখন আর আসছে না। বিশ্বাস করবেন পকেট সংস্করণ শোভন গীতাঞ্জলি হাতে নিয়ে বললুম ইটি একটু ধুলোমাখা। তাজা হলে ভালো হয়। বলল এই শেষ কপি; লাহোরে ছাপা, আর আসবে না। পাঁচমেশালির দোকানেও নেই, নেই শুনে বিরক্ত হয়ে বললুম, আরে মিঞা মধু মধু চাইছি। সে তো আসত সেঁদর বন থেকে, বোতলে পোরা হত ঢাকায়… লালবাগ না কোথায় যেন? কাঁচুমাচু উত্তর, জি, ঠিক বলেছেন। তবে না, কারখানার মালিক ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানি। তিনি হাওয়া। দোকানে তালা পড়েছে। মনে মনে কাষ্ঠহাসি হেসে বললুম, পাট তো এদেশের ডাল ভাত। মশকরা করে এক গাঁট পাট চাইলে হয়তো বলবে, জী আদমজি দাউদ মিলের কর্তা তো ভাগ গিয়া; গুদোম বন্ধ।
শেষটায় খাস ঢাকায় তৈরি ঢাকাই মালিকানায়– কী পেলুম জানেন? ওটার আমার দরকার ছিল না। মার্কিং ইন। লনড্রিতে যে কালি দিয়ে কাপড়ে নম্বর লেখে। এদেশের ধোপানি যেটা আপন কুঁড়েঘরে বানায়। প্যোর কটিজ ইনডাসট্রি!
কান্না পেল।
হ্যাঁ, একদা এরাই দুনিয়ার সেরা মসলিন– যার তরে দুনিয়ার সবচেয়ে ডাঙর বাদশা চীনের বাদশা এদেশে রাজদূত পাঠিয়েছিলেন।
.
০৪.
গোড়াতেই সরল সাধুতা ও সহজ ভাষায় পুনরায় স্বীকার করে নিই, বাংলাদেশের অনবিস্মরণীয় ন মাসের ইতিহাস লেখার মতো পাণ্ডিত্য, তথ্যানুসন্ধান করার মতো শক্তি, দূর তথা গভীর দৃষ্টিনিক্ষেপজনিত দার্শনিক বিজ্ঞতা আমার নেই। বস্তুত এদেশের স্কুলবয় পর্যন্ত হেন কর্ম করার মতো দুরাকাক্ষী জনকে বলে দিতে পারবে, দিনাজপুর থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট থেকে রবিশাল জুড়ে ন মাস ধরে যে ভূতের নৃত্য হয়ে গিয়েছে তার সাক্ষ্যস্বরূপ মানুষের মনে, মাটির উপর-নিচে যেসব সরঞ্জাম-নিদর্শন সঞ্চিত হয়ে আছে সেগুলো আংশিকভাবে সংগ্রহ করাও কঠিন কর্ম। গুণীজন বলবেন, করতে পারলেও অতঃপর শিখাগ্রে আরোহণ করে তার প্রতি সিংহাবলোকন* নিক্ষেপ দ্বারা সেগুলো আপনার অন্তরে সংহরণ করে তার প্রতি ঐতিহাসিক তথা দার্শনিক সুবিচার করা অসম্ভব উপস্থিত। বলা বাহুল্য আমা দ্বারা কস্মিনকালেও এহেন কর্ম সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না। শতায়ু হলে না সহস্ৰায়ু হলেও না। তবু কেন যে যে-টুকু পারি লিখছি সেটা ধীরে ধীরে স্বপ্রকাশ হবে। উপস্থিত পাঠকের কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ, এ বয়ান থেকে কেউ যেন প্রামাণিকতা প্রত্যাশা না করেন। একই ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন লোকের কাছ থেকে ভিন্ন ভিন্নভাবে শুনেছি। খুঁটিনাটিতে পার্থক্য থাকার কথা। সাজানো মিথ্যা সাক্ষ্যের বেলাতেই খুঁটিনাটিতেও কোনও হেরফের থাকে না। সত্য সাক্ষ্যে মূল ঘটনাতে নড়চড় হয় না; ডিটেলে বেশকিছুটা থাকবেই। এছাড়া যেসব কাহিনী-কেচ্ছা মুখে মুখে এখনও বিচরণ করছে তার অনেকগুলিই কবিজনের কল্পনাবিলাস বা আকাশকুসুম। কিন্তু তারও মূল্য আছে। ব্রজবিহারীকে সত্য সত্যই বিহারবাসী মনে করে রামপঠা পাঠান ছেড়ে দিয়েছিল কি না তাতে বিন্দুমাত্র আসে-যায় না– আসল তত্ত্বকথা এই : গল্পটা ক্যারেক্টারিস্টিক কি না, অর্থাৎ গল্পটাতে পাঠান ক্যারেকটারের নির্যাস, তার রাম পন্টকামি ফুটে উঠেছে কি না। কাঠবেরালি সত্য সত্যই সর্বাঙ্গে ধুলো মেখে সেতুবন্ধের উপর সে-ধুলো ঝেড়ে রামচন্দ্রকে সাহায্য করেছিল কি না সেটা বিলকুল অবান্তর। গল্পটা বোঝাতে চায়, রাবণের ডিকটেটরির বিরুদ্ধে তখন জনসাধারণ কী রকম উঠেপড়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। অবশ্য সেটা যদি সত্য হয় তবে তো প্ল্যাটিনামে ডায়মন্ড! নিয়াজির কোলে ফরমান আলী, পিছনে দাঁড়িয়ে পাখা দোলাচ্ছেন, যশোবন্ত শ্রীমান গভর্নর ড. (?) মালিক!
