হিমালয়ের যোগীশ্বরের রোষের কথা জানি
অনুঙ্গেরে জ্বালিয়েছিলেন চোখের আগুন হানি।
এবার নাকি সেই ভূধরে কলির ভূদেব যারা
বাংলাদেশের যৌবনেরে জ্বালিয়ে করবে সারা!
সিমলে নাকি দারুণ গরম, শুনছি দার্জিলিঙে
নকল শিবের তাণ্ডবে আজ পুলিশ বাজায় শিঙে।
এই অগ্নিগর্ভ মৃত্যুঞ্জয় কবিতাটি থেকে এ প্রবন্ধে আরও উদ্ধৃতি দিতে হবে। কিন্তু এটি এতই অনাদৃত যে আমি অভিমানভরে তার নির্দেশ দিই না। রচনাবলি থেকে খুলে বের করুন।
পটভূমি নির্মাণের জন্য একাধিক চিন্তাশীল লেখক অন্যান্য কারণ দেখান। সেগুলো একটা জাত একটা দেশকে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে, এমনকি ক্ষেপিয়ে তুলতেও যথেষ্ট। প্রত্যুত্তরে দমননীতি বরণ করে শোষকরা। এমনতরো কাণ্ড তো বার বার সহস্রবার হয়েছে পৃথিবী জুড়ে। কিন্তু প্রত্যুত্তরে পিচেশিমির যে উলঙ্গনৃত্য হল তার হদিস তো বড় একটা পাওয়া যায় না আমি কোথাও পাইনি। মাত্র একবার একজন একটা প্ল্যান করেছিলেন যার সঙ্গে ইয়েহিয়ার প্ল্যান মিলে যায় কিন্তু সেই পূর্বসূরিও সেটা কার্যে পরিণত করার জন্য এতখানি পিচেশিমি করার মতো বুক বাঁধতে পারেননি। কিন্তু সে প্ল্যান এ ভূমিকার অঙ্গ নয়। সেটা ঘটনাবলির ক্রমবিকাশের সঙ্গে এমনই অঙ্গাঙ্গী বিজড়িত যে সেটাকে বিচ্ছিন্ন করে এস্থলে সুষ্ঠুভাবে পরিবেশন করার মতো শক্তি আমার নেই– সহিষ্ণুতম পাঠক পর্যন্ত বিরক্ত হবেন। সেটি যথাস্থলে নিবেদন করব।
পূর্ব বাঙলাকে পশ্চিম পাকের একুশটি কোটিপতি পরিবার কী মারাত্মকভাবে শোষণ করেছে সে সম্বন্ধে প্রামাণিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। দু জন লোক অসীম সাহস দেখিয়ে আইয়ুব-ইয়েহিয়ার আমলেই সরকারি তথ্যের ওপর নির্ভর করে যেসব রচনা প্রকাশ করেন সেগুলো পড়ে আমার মনে ভয় জেগেছিল এঁদের ধরে ধরে না ইয়েহিয়ার চেলা-চামুণ্ডারা ফাঁসি দেয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদের প্রকৃত মূল্য উত্তমরূপেই হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন বলে ভণ্ড ইয়েহিয়া যখন আলাপ-আলোচনার নাম করে আসলে টিক্কা খান যাতে করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আরও না-পাক সেনা ঢাকায় আনতে পারার ফুরসত পায়– মার্চের মাঝামাঝি ঢাকা আসেন, তখন বঙ্গবন্ধু জনাব তাজউদ্দীনের সঙ্গে অধ্যাপক রেহমান সুবহান ও ড. কামাল হুসেনকে প্রাথমিক আলাপ-আলোচনা করার জন্য পাঠিয়েছিলেন।
এই ভণ্ডামির চমৎকার বয়ান বহুল প্রচারিত একখানি জর্মন সাপ্তাহিক নির্ভয়ে প্রকাশ করে। নির্ভয়ে এই কারণে বললুম, এই প্রবন্ধের জন্য যে জর্মন লেখক জিম্মাদার তার নাম, ইসলামাবাদে তার বাসস্থান, ফোন নম্বর ইত্যাদি সবই ভালোভাবে দেওয়া ছিল। ভাবখানা অনেকটা এই : ওহে হেইয়া খান। আমার মতে, তুমি রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে যে ভণ্ডামির ভেল্কিবাজিটি দেখালে তার হাঁড়িটি আমি হাটের মধ্যিখানে ফাটালুম। যে ভণ্ডামিটি তুমি করলে সেটা কোনও কূটনৈতিক রাষ্ট্রদূতও ইজ্জতের ভয়ে করত না কারণ দু-দিন বাদেই তো ভণ্ডামিটা ধরা পড়ে যেত। আর কেউ না হোক, আমি তো বাপু এ ব্র্যান্ডের ফক্কিকারি বিলক্ষণ চিনি। মাত্র আরেকজন রাষ্ট্রপ্রধান এ ধরনের ত্যাদড়ামি করতেন তিনি আমারই দ্যাশের লোক– নাম তার হিটলার। তা অত সব ধানাই-পানাই ক্যান? করো না আমার বিরুদ্ধে মোকদ্দমা, না হয় তাড়িয়ে দাও আমাকে তোমার সাতিশয় পাক মুলুক থেকে। হই হই পড়ে যাবে দুনিয়ার সর্বত্র। দেখি, তোমার কতখানি মুরদ!
অতি অবশ্য ভারিক্কি ওজনের ইয়েহিয়া অনভ্যাসের (ফোঁটা) অসামরিক ড্রেস পরে উড়োজাহাজে করে পৌঁছলেন পুব-দেশের রাজধানী ঢাকায় (সে আরেক মিনি ধাপ্পা; ভাবখানা, আমি মিলিটারি ডিকটেটর নই, আমি সাদামাটা নাগরিক মাত্র।–শেখ মুজিবের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করার জন্য। কিন্তু প্রকৃত সত্য, ওই আসাটাই ছিল দীর্ঘসূত্রতার কৌশল। পূর্ব প্রদেশ কেটে পড়তে চায়; তাকে তখনকার মতো কোনও গতিকে ঠেকিয়ে পরে ডাণ্ডা মেরে ঠাণ্ডা করা।
কারণ, পাঠান জাদরেল (ইয়েহিয়া পাঠান নন। তিনি জাতে কিজিলবাশ এবং সুন্নিবৈরী শিয়া সম্প্রদায়ের লোক* কিন্তু তিনি পাঠানদের ভাষা পশতু অনর্গল বলতে পারেন বলে অতি অল্প লোকেই জানেন যে, তিনি পাঠান নন–অনুবাদক) যে কটা দিন জেনেশুনে তিনি হাবিজাবি এ-প্যারাগ্রাফ ও-প্যারাগ্রাফ নিয়ে বাংলার জননেতার সঙ্গে বেকার আলোচনা চালাচ্ছিলেন ঠিক সেই সময়ে বেসামরিক পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনালের উড়োজাহাজ নিরবচ্ছিন্ন ধারায় বাংলাদেশে নিয়ে আসছিল উচ্চদেহ বাছাই বাছাই যুবক–পরনে একদম একই ধরনের বেসামরিক বেশ।
[*পাকিস্তানের সৌভাগ্য বলুন, দুর্ভাগ্যই বলুন, তার জন্মদাতা মরহুম জিন্না শিয়া, ইসকন্দর মির্জা ও ইয়েহিয়াও শিয়া। ইসকন্দর মির্জা ও ইয়েহিয়া পীরিত করতেন শিয়া ইরানের সঙ্গে এবং তাচ্ছিল্য করতেন সুন্নি আফগানিস্তানকে। ডিসেম্বর ১৯৭১-এর প্রথমার্ধে যখন পশ্চিম পাকবাসী জেনে গেল, পুব পাক যায়-যায়, তখন ইয়েহিয়ার চরিত্র-দোষ, কুলদোষ এসবের সন্ধান অকস্মাৎ আরম্ভ হল। তখন— যদিও ইয়েহিয়া কখনও সেটা গোপন করেনি– সবাই চেঁচাতে আরম্ভ করল, ব্যাটা ইয়েহিয়া শিয়া। তাই আমাদের আজ এই দুর্গতি। সে পাপ স্খলনের জন্য তিনি এক শুকুরবারে জাতধর্ম খুইয়ে সুন্নিদের মসজিদে গিয়ে জুম্মার নামাজ পড়লেন। এ যেন কোনও পরম নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব রক্ষাকালীর মন্দিরে পাঁঠা বলি দিলেন! কিন্তু হায়, সবাই জানেন জাত গেল, পেটও ভরল না…ভুট্টো সুন্নি, তাই তিনি ক্ষুদে হিটলার দি থার্ড হয়েই ছুটলেন সুন্নি কাবুল বাগে।
