.
০৩.
মার্চ থেকে ডিসেম্বরের কাহিনী এমনই অবিশ্বাস্য, এমনই অভূতপূর্ব যে সে কালটা বুঝতে গেলে তার পূর্বেকার ইতিহাস পড়ে খুব একটা লাভ হয় না। কারণ এটা তো এমন নয় যে তার পূর্বে দু বছর হোক পাঁচ বছর হোক বেশ কিছু কাল ধরে পূর্ব বাংলায় মোতায়েন পাঞ্জাবি-পাঠান পাক সেনা আর সে-দেশবাসী বাঙালিতে আজ এখানে কাল সেখানে হাতাহাতি মারামারি করছিল এবং একদিন সেটা চরমে পৌঁছে যাওয়াতে এক বিরাট বিকট নরহত্যা নারীধর্ষণ আরম্ভ হয়ে গেল। বস্তুত যে দু তিন হাজার পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্য বাংলাদেশে বাস করত তাদের সঙ্গে কখনও কোনও মনোমালিন্য হয়েছিল বলে শুনিনি। আমি এদেশে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে একবার পূর্ব পাকিস্তান দেখতে আসি এবং ১৯৫১ থেকে ১৯৭০ অবধি পারিবারিক কারণে প্রতি বৎসর দু একবার এসেছি এবং প্রতিবারই একটানা কয়েক মাস কাটিয়ে গিয়েছি। আমার গুষ্টিকুটুমে তাবৎ বাংলাদেশ ভর্তি। তাই রাজশাহী থেকে চাটগাঁ-কাপ্তাই, সিলেট থেকে খুলনা অবধি মাকু মেরেছি। মাত্র একবার দু জন পশ্চিম পাকিস্তানি জোয়ানকে রাজশাহীতে পদ্মর একটা শাড়ির পারে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি– অতি অবশ্য পাড় থেকে হাত দশেক দূরে জল থেকে খুব সন্তর্পণে গা বাঁচিয়ে; একটি কিশোর সেখানে জলে ডুবে মরেছে শুনে সে তামাশা দেখতে এসেছিল।
আরেকবার ট্রেনে ঢাকা থেকে মৈমনসিং যাবার সময় ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে দু জন সুবেদার উঠেছিল। তার একজন মৈমনসিংহ-এর লোক, অন্যজন বেলুচ। এটা ১৯৬৬ সালের কথা। মৈমনসিংহি আর পাঁচজনের সঙ্গে গালগল্প জুড়ে দিল এবং স্বভাবতই ৬৫-র যুদ্ধের কথা উঠল। বাঙালরা তখন পশ্চিম পাকিস্তানে কীরকম জোর লড়াই দিয়েছিল সে কাহিনী সে যেমন-যেমন দফে দফে বলে যায়, সঙ্গে সঙ্গে বেলুচ ঠিক বাত, বিলকুল সহি বাত ম্যায় ভি তো থা, ম্যায় নে ভি দেখা মন্তব্য করে। এস্থলে সম্পূর্ণ অবান্তর নয় বলে উল্লেখ করি, ওই যুদ্ধে বাঙালি রেজিমেন্টই আর সব রেজিমেন্টের চেয়ে বেশি মেডল ডেকরেশন পায়। এবং অপ্রাসঙ্গিক হলেও উল্লেখ করি, ১৯৭১-এর গরমিকালে রাজশাহীতে বেলুচ জোয়ানদের এক বাঙালি প্রসেশনের উপর গুলি চালাবার হুকুম হলে অগ্রবর্তী জোয়ানরা শূন্যে গুলি মারে, আর জনতাকে বার বার বলতে থাকে, ভাগো, ভাগো।… সে যাত্রায় বিস্তর লোক বেঁচে গিয়েছিল।
মোদ্দা কথা সেপাইদের সঙ্গে এদেশবাসীর কোনও যোগসূত্র ছিল না। কোনও প্রকারের মনোমালিন্যও ছিল না। সেটা হয়েছিল মার্চ মাসের গোড়ার দিকে সে কাহিনী যথাস্থানে হবে।
আর আর্মি অফিসারদের তো কথাই নেই। যে সামান্য কজন আপন মিলিটারি গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এদের সিভিলিয়ান অফিসারদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন তারা ছিলেন ভদ্র, খামোখা গায়ের জোরে যেখানে কমন ল্যাঙুজ ইংরেজিতে কথাবার্তা হচ্ছে সেখানে উর্দু ভাষা চালিয়ে উঁচু ঘোড়া চড়তে যেতেন না।
অভদ্র ইতর ছিল পাঞ্জাবিরা এবং তৎসঙ্গে যোগ করতে হয় দম্ভ, অহংকার, গায়ে পড়ে অপমান করার প্রবৃত্তি। বেহারিদের– এরা অসামরিক। ভাবখানা, এনারা খানদানি মনিষ্যি, কুরানশরিফের আরবি, রুমি-হাফিজের ভাষা ফার্সি এগুলোকে প্রায় ছাড়িয়ে যায় তেনাদের নিকষ্যি কুলীন উর্দু ভাষা। পাটনা, বেহারে এনাদের অন্য রূপ! ঢাকাতে একদা এক বাঙালির ড্রইংরুমে যখন উর্দু নিয়ে এনাদের এক প্যাকম্বর বড় বেশি বড়ফাট্টাই করতে করতে থামতেই চান না তখন আমি তার নভলোকে উড্ডীয়মান বেলুনটিকে চুবসে দেবার জন্য মাত্রাধিক মোলায়েম কণ্ঠে শুধুলুম, আচ্ছা আপনার সঠিক মাতৃভাষাটি কী? ভোজপুরি মৈথিলি না নগৃহই? আর যাবে কোথায়? ছাতুখোর তো ফায়ার! হাজার দুই ফারেনহাইট।… উপস্থিত সেটা থাক।
তাই পঁচিশের পিচেশিমির পয়লা নম্বরি মদ্দি ছিলেন এঁরাই। অল-বদর, অশ-শমস এবং প্রধানত রাজাকরদের সম্মানিত সভ্য ছিল এরাই। পঁচিশের পিচেশিমির পটভূমি অধ্যয়ন করলে মাত্র এইটুকু আমাদের কাজে লাগে। কিন্তু ভুললে চলবে না, এহ বাহ্য। কারণ গণনিধনের প্রধান পাণ্ডা-পুরুত না-পাক সেনা এবং ইসলামবাদ-নশিন ফৌজি জাঁদরেলরা।* এঁরা যদি পুরো মিলিটারি তাগদ খাঁটিয়ে নিরস্ত্র সিভিলিয়ানদের কচুকাটা (কল-ই-আম) কর্মে সমস্ত শক্তি নিয়োগ না করতেন তবে এ দেশের নুন নেমক খেয়ো পোস্টাইপেট জারজ বিহারিদের (আমি বিহার বাসিন্দা, বিহারি বা কলকাতাবাসী বিহারিদের কথা আদৌ ভাবছি না, এবং বাংলার বিহারিদের ভিতরও যে আদৌ কোনও ভদ্রসন্তান ছিলেন না সেকথা বলছিনে) কী সাধ্য ছিল বাংলাদেশীর সঙ্গে মোকাবেলা করে!
[*এঁদের নাম টুকে রাখলে পশ্চিমবঙ্গীয় পাঠক রেসকোর্সে না গিয়ে, রক-এ বসেই বাজি খেলতে পারবেন শ্ৰীযুত ভুট্টোর পর কোন বাজিরাজ পাকিস্তানের গদিতে সোওয়ার হবেন– বাংলাদেশে এঁদের নাম ডাল-ভাত, থুড়ি!– ছাইভস্ম। লেফ-জেনারেল রিজাদা হামিদ খান টিক্কা খান (এর গৌরবাৰ্জিত খেতাব বমর অব বেলুচিস্তান), (বুচর অব বেঙ্গল) মেজর জেনারেল আকবর খান, মেজর জেনারেল উমর খান, লেফ-জেনারেল গুল হাসান।]
এটা নিয়তির পরিহাসই বলতে হবে, যে জোয়ান, যে অপিসারদের সঙ্গে বঙ্গজনের কোনও দুশমনি ছিল না তারাই নাচল তাণ্ডব নৃত্য, বেহারিরা শুধু বাজাল শিঙে। বেঙ্গল অর্ডিনেনস বঙ্গদেশের ওপর চাপানোর সময় রবীন্দ্রনাথ শিখেছিলেন :
