গুণী বললেন, আপনি খবর নিন, জানতে পারবেন, শুধু যে পাঠানরা, পাঞ্জাবিরা, বেলুচরা এদেশ সম্বন্ধে কিছুই জানত না তা নয়, এদেরকে দিনের পর দিন শেখানো হয়েছিল, বাঙালিরা পাকিস্তানি নয়, এবং তার চেয়েও বড় কথা মুসলমান নয়। এরা হিন্দুদের জারজ সন্তান। এরা আল্লা-রসুল মানে না, নামাজ-রোজার ধার ধারে না–
আমি বললুম, বা রে! এ আবার কী কথা! শুধু বললেই হল। পাঞ্জাবি-পাঠান কি মসজিদও চেনে না। গম্বুজ রয়েছে, মিনার রয়েছে, ভিতরে মিহরাব রয়েছে, বাইরে ওজু করার জন্য জলের ব্যবস্থা রয়েছে, জানি, ওদের দেশে বাংলার তুলনায় মসজিদ অনেক কম। তাই বলে মসজিদ চিনবে না।
বললেন, মসজিদ চেনার কী বালাই ওরা শুনেছে, এককালে এগুলো মসজিদ ছিল কিন্তু ইন্ডিয়ানদের পাল্লায় পড়ে ওসব জায়গায় এখন নামাজটামাজ আর পড়া হয় না। শুধু কী করে পাকিস্তান ধ্বংস করতে হবে তাই নিয়ে ইন্ডিয়ান এজেন্টদের সঙ্গে আলোচনা হয় ওইখানে। উত্তর বাংলার এক টাউনে এক প্রৌঢ়া মহিলা সন্ধ্যার আধা-অন্ধকারে বেরিয়েছেন তার কিশোরী কন্যার সন্ধানে। পাড়ার মসজিদ পেরিয়ে কিছুটা যেতে না যেতেই– সামনে খান সেনা, জনা পাঁচেক! মহিলা পিছন ফিরে ছুটলেন বাড়ির দিকে। মসজিদের পাশ দিয়ে ছুটে যাবার সময় করলেন চিৎকার। মুসল্লিদের নামাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল। তারা ছুটে এল বাইরে। খান সেনাদের বাধা দেবার চেষ্টা করতেই তারা চালাল গুলি। কয়েকজন পড়ে গেল রাস্তার উপর। বাকিরা দৌড়ে ঢুকল মসজিদের ভিতর। না-পাকরা সেখানে ঢুকে সবাইকে খতম করল। ইমাম সাহেবও বাদ যাননি।
আমি বললুম, আমার কাছে তো এসব কথা সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য ঠেকছে।
গুণী বললেন, কিন্তু এত শত বজ্র-বাঁধন দিয়ে বাঁধা সত্ত্বেও মাঝে মাঝে ফাটল ধরত।
গাঁ থেকে জোয়ান জোয়ান চাষাদের ধরে আনা হচ্ছে একসঙ্গে গুলি করে খতম করে না-পাকরা গাজি হবেন। একটি ছোকরাকে ধরে এনেছিল, সঠিক বলতে গেলে, প্রায় তার মায়ের আঁচল থেকে। সে কান্নাকাটি চিৎকার চেঁচামেচি কিছুই করেনি। শুধু যখন তাকে না-পাকরা দাঁড় করাতে যাচ্ছে, গুলি করার জন্য, তখন ফিসফিস করে সেপাইটাকে বললে, আমার আম্মাকে বল, আমার রুহ (আত্মা)-র মগফিরাতের (সদৃগতির) জন্য দোয়া (প্রার্থনা) করতে। রুহ, মগফিরাত, (যেমন সাধনোচিত ধামে প্রস্থান) এগুলো প্রায় টেকনিকাল কথা, সব ধর্মেই থাকে। সেপাই আম্মা, রুহ, দোয়া কথাগুলো বুঝতে পেরে একেবারে হতবাক হয়ে গেল। অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর সামনে অতিশয় পাষণ্ডও তো ঝুটমুট কুট কথা বলে তার পরকাল নষ্ট করতে চায় না। আবার জিগ্যেস করে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে তাকে নিয়ে গেল অফিসারের সামনে। বললে, এ তো মুসলমান। অফিসার সরকারি নির্দেশমতো ইসলামের স্বরূপ সম্বন্ধে তাঁর তোতার বুলি কপচাবার পূর্বেই হই হই রব উঠেছে, মুক্তি (গ্রামের লোক মুক্তিফৌজ মুক্তিবাহিনী বলে না, বলে মুক্তি) এসে গেছে, মুক্তি এসেছে। সঙ্গে সঙ্গে ভাগে ভাগো চিৎকার। আর ধনাধন একই সাথে সে কী সাম্যবাদ। আপিসরকে ধাক্কা মেরে জোয়ান দেয় ছুট, জোয়ানকে ঠেলা মারে অল্-বদর, তাদের ঘাড়ে হুড়মুড়িয়ে পড়ে অশৃশস্। এস্থলে রণমুখো বাঙালি আর ঘরমুখো সেপাই।
ছোঁড়াটাকে আখেরে অফিসার মুক্তি দিত কি না সে সমস্যার সমাধান হল না বটে কিন্তু সে যাত্রায় সে সুঘ্ন বেঁচে গিয়েছিল বেশ কয়েকজন।
এ তো গেল মামুলি উদাহরণ।
আরেক জায়গায় না-পাকরা মেরেছে গাঁয়ের কয়েকজন মুরুব্বিকে। তার পর এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেসব মৃতের আত্মার সদ্গতির জন্য শেষ উপাসনা (জানাজা) করার সাহস কার? মৃতদেহগুলো সামনে রেখে সারি বেঁধে সে জানাজার নামাজ পড়তে হয়। খানেরা তৈরি, জড় মাল পটপট গুলি করে ঝটপট গাজি হয়ে যাবে। কিন্তু তবু জনাদশেক সার বেঁধে নামাজ আরম্ভ করে দিল।
পাঞ্জাবি, পাঠান, বেলুচে পাঁচ ওকতো দৈনন্দিন নিত্য নামাজের বড় একটা ধার ধারে না। চোদ্দ আনা পরিমাণ নামাজের সংক্ষিপ্ততম মন্ত্রও জানে না। বাঙালি মুসলমান ওদের তুলনায় কোটিগুণে ইনফিনিটি পার্সেন্ট আচারনিষ্ঠ। কিন্তু পাঠান-বেলুচ আর কিছু জানুক আর নাই জানুক, মৃতের জন্য শেষ উপাসনায় সে যাবেই যাবে। তার মন্ত্র জানুক আর না জানুক। ইহসংসারে সর্ব পাপকর্মে সে বিশ্বপাপীকে হার মানায়। তাই এই নামাজে তার শেষ ভরসা। নামাজিদের দোওয়ায় সে যদি প্রাণ প্রায়।
গুলি করার আগেই তারা লক্ষ করল, এ নামাজ তো বড় চেনা লাগছে। এ নামাজ নিয়ে তো কেউ কখনও মশকরা করে না। জানের মায়া ত্যাগ করে যারা এ নামাজে এসেছে তারা তো নিশ্চয়ই মুসলমান। মৃতের জন্য মৃত্যুভয় ত্যাগ!
এরা সেদিন গুলি করেনি।
কিন্তু তাই বলে ওরা যে সেদিন থেকে প্রহ্লাদপালে পরিণত হল সেটা বিশ্বাস করার মতো অতখানি বুড়বক আমি নই। এটা নিতান্তই রাঙা শুক্কবারের, ওয়ানস্ ইন এ ব্লু মুনের ব্যত্যয়।
লুটতরাজ খুন-খারাপির সময় কে হিন্দু কেবা মুসলমান!
কাশ্মিরে ঢোকার পূর্বেই তো পাঠানরা আপন দেশে লুটতরাজ করেছে। আর কাশ্মিরের মুসলমানদের ওপর অত্যাচারের তো কথাই নেই। ওদিকে লেট জিন্নাহ তো ওদের দিব্যি দিলিশা দিয়েছিলেন, কসমফতোয়া ঝেড়েছিলেন– পাঠানরাই দুনিয়ার সবচেয়ে বহিয়া মুসলমান, তাদের ওপরই পড়ল নিরীহ কাশ্মিরিদের জান-মান বাঁচাবার দায়িত্ব। আমেন! আমেন!!
