এক ওকিবহাল গুণী ব্যক্তিকে সাঁতার কাটা সম্বন্ধে সেই সদুপদেশের উল্লেখ করতে তিনি মৃদু হেসে বললেন, অইছে, অইছে– জানতি পারেন না। এই যে আপনাদের বাড়ির পিছনে ছোট একটি নালা এসে ঝিলের মতো হয়ে গিয়েছে ওইটে ঈসট পাকিস্তান রাইফেলসের হেড-কোয়ার্টার। ২৫ মার্চের গভীর রাত্রে না-পাকরা কেন্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে ট্যাঙ্ক মর্টার মেশিনগান কামান দিয়ে আক্রমণ করে বাঙালি জোয়ানদের। ওরাও রুখে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ওরা পারবে কী করে? ওদের ফায়ার পাওয়ার কোথায়? আট আনা পরিমাণ কচুকাটা হয়– ভাগ্যিস বাকিরা পেছন বাগে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে ঘাঁটি থেকে বেরিয়ে বুড়িগঙ্গা সাঁতার কেটে পেরিয়ে–
সাঁতার কেটে?
এজ্ঞে হ্যাঁ। তার থেকেও না-পাকদের শিক্ষে হয়, এদেশে সাঁতার না-জানাটা কত বড় বেকুবি– রীতিমতো বেয়াদবি!!
আমি তাড়াতাড়ি বললুম, তা বটেই তো, তা বটেই তো! তবে ভাগ্যিস চলে গিয়েছিল বললেন কেন?
গুণী বিরক্তির সুরে বললেন, ঝকমারি! ঝকমারি– আপনাকে এ ন মাসের ইতিহাস শেখানো। এ বি সি দিয়ে তাবৎ বাৎ আরম্ভ করতে হয়। এদেশের শিশুটি পর্যন্ত জানে, এরা এবং (দুই) পুলিশের যে কটি লোক ওই একই ধরনের কিন্তু অনেক মোক্ষমতর হামলা থেকে গা বাঁচাতে পেরেছিল, (তিন) বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে যারা এসে জুটল– এরাই ট্রেনিং দিল ছাত্রদের– তারাও ইতোমধ্যে এসে জুটে গিয়েছে এদের সঙ্গে, খুঁজে বের করেছে ওদের। আর কস্মিনকালেও চাষাভূষো, জেলে-হেলেদের কথা ভুলবেন না। ওদের সাহায্য না পেলে ওই যে তেসরা ডিসেম্বরে মরণকামড় দিলে তিন দল, মুক্তিবাহিনী, ভারতীয় সেনা, পেছনে-সামনে চাষাভূষোর মদত–সেটা না থাকলে সেটা তেরো দিন না হয়ে কত দিন ধরে চলত কে জানে!
আমি সোল্লাসে বললুম, বর হ বর হ! একদম খাঁটি কথা। এটা মেনে নিতে আমার রক্তিভর অসুবিধা হচ্ছে না। এই ফেব্রুয়ারিতে দেখা হয় আমাদের সিলটা কর্নেল রব-এর সঙ্গে। ইনি ছিলেন জেনারেল ওসমানির চিফ অৰ্ব স্টাফ। এর ওপর ছিল চাটগা-নোয়াখালি-সিলেটের ভার। প্রধান কাজ ছিল, চাটগাঁ বন্দরে না-পাকরা জাহাজ থেকে যেসব জঙ্গি মাল-রসদ নামাবে সেগুলো যেন ঢাকা না পৌঁছাতে পারে। সে কর্মটি এঁর নেতৃত্বে সুষ্ঠুরূপে ন-মাস ধরে সুসম্পন্ন হয়। বিদেশি সাংবাদিকরা একবাক্যে স্বীকার করেছে, মার্চ থেকে ডিসেম্বর না-পাকরা জখমি রেল-লাইন মেরামত করতে না করতেই এঁরা উড়িয়ে দিতেন আবার রেলের ব্রিজ।… তিনি আমাকে বলেছিলেন, ২৬-২৭ মার্চ থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত গেছে সবচেয়ে সঙ্গিন সময়। স্বাধীন-বাংলাদেশ সরকার তখনও তৈরি হয়নি। দেশের ভবিষ্যৎ কোন দিকে, প্রত্যেকের আপন কর্তব্য কী সে সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকা সত্ত্বেও সেই দিনাজপুর থেকে সিলেট চাটগাঁ বরিশালের লোক অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে যদি সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে জান কবুল করে শয়তানের মোকাবেলা না করত তবে পরিস্থিতিটা কী রূপ নিত কে জানে?
তা সে কথা থাক। আপনি বলছিলেন–
হুঁ! সেকথা থাক। তবে এ বিশ-বাইশ দিনের ইতিহাস তার পরিপূর্ণ সম্মান তার পরিপূর্ণ মাহাত্ম্য দিয়ে লেখা উচিত। আমি বিশেষ করে জানতে চাই, তারা এ মনোবল পেল কী করে, কোথা থেকে?
না, না। সাতারের কথা বলছিলম। হারামিরা স্পষ্ট চোখে দেখতে পেল, বাঙালি সমুচা বন্দুক হাতে নিয়ে গপাগপ ডুবসাঁতার দিয়ে বুড়িগঙ্গার জল পেরুল তথাপি বাবুদের কানে জল গেল না। কে জানে, কে বোধহয় হুকুম দিয়েছিল–-ব্যবস্থা করা হল, জোয়ানরা সাঁতার কাটা শেখবেন! আরে মশয়, কাঁচায় না নুইলে বাশ! তদুপরি আরেক গেরো। যে আপিসর হুজুররা ডেঙায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হুকুম কপচাচ্ছেন, তেনারাই যে জলে নাবলে পাথরবাটি। বাজি ছুঁড়ি পয়লা পোয়াতিকে শেখাচ্ছে বাচ্চা বিয়োবার কৌশল।
তদুপরি আরেক মুশকিল, জল পদার্থটা বড় ভেজা।
আমি বললুম, হ্যাঁ, আইরিশম্যান রবারের দস্তানা দেখে বলেছিল, খাসা ব্যবস্থা। দিব্য হাত ধোওয়া যায় জলে হাত না ভিজিয়ে।
গুণী বললেন, আইরিশম্যানের হেড-আপিসে বিস্তর ঘিলু। এদের আণ্ডা সাইজের মাথাভর্তি ঠকঠকে খুঁটে। এদের বেশ কিছু জোয়ান অনেকদিন ধরে এদেশে আছে কিন্তু কোনওপ্রকারের কৌতূহল নেই। শোনেননি বুঝি সেই কুট্টি রসিকতা? ওদিকে কখন যে গুলির ঘায়ে ঘায়েল হবে সে খেয়াল আছে ন সিকে, এদিকে কিন্তু মশকরা না করতে পারলে পেটের ভাত চালভাজা হয়ে যায়।… কুট্টির গণিভাই বাড়ি থেকে বেরুতে ভয় পাচ্ছে। মোগলাই কণ্ঠ বললে, পাঠানগো অত ডরাইস ক্যান– বুদু, বুদু, বেবাক লাইন বুদু। হোন্ কথা। কাইল আমাগো আটকাইছে ইস্কাটনের ধারে। একেক জনরে জিগায়, নাম কিয়া হ্যায়? হিন্দু নাম। অইলেই সর্বনাশ তার লাইগ্যা সাক্ষাৎ কিয়াম (মহাপ্রলয়)। পয়লা তারে দিয়া কবর খোরাইবো। তার বাদে একড়া গুলি। যদি না মরে– বাবুগো হাতের নিশানা, হালা আইনুধারে তেলা হাতে বিল্লির নেঙ্গুর ধরার মতো তো বন্দুকের কোন্দা দিয়া ঠ্যাঙাইয়া ঠ্যাঙাইয়া মারে, নাইলে হালা জিন্দা মানুষ কবরে পুত্যা দেয়।… আমার পিছে আছিল আমাগো মহল্লার বরজো। মনে মনে কই, ইয়াল্লা, এর তো কিয়ামৎ আইয়া গেল আইজই। আলিশা করলুম, দেহি, না, হালা, আমাগো পাঠান সম্বন্ধী কোন পয়লা নম্বরি পাক মুসলমান হিন্দু মাইরা দাবরাইয়া বেরাইতাছে?– আমাকে যে ওক্তে জিগাইল তুমারা নাম কিয়া হ্যায়? আমি কইলাম- কিয়ামৎ মির্জা বুক চিতাইয়া! হোনো কথা– কিয়ামৎ বুঝি নাম অয়? কইল, বোহৎ ঠিক হ্যায়। যাও! তার বাদে আইল বরজো– বিবি শিরনির পাঠিটার মতোন কাঁপতে কাঁপতে। আমি তার চেহারার বাগে মুখ তুল্যা চাইতা পারলাম না। ক্যা নাম হ্যায়? আরে মুসলমান নাম কইলে কী হয়? না ডরের তাইশে আচম্বিতে কইয়া ফালাইছে ব্রজবিহারী বসাক। খান সায়েব খুশি অইয়া কইল, বিহারি হ্যায়? তো যাও, যাও। বাচ্যা গেল বরজো হালা। তারে কইলাম, আ মে বরজা, বিহারি হইয়া বাচ্চা গেল।… গল্প শেষ করে গুণী বললেন, কিন্তু মাঝে মাঝে বিপদও আসে প্রদেশের নামে। সাজের ঝোঁকে মসজিদে ঢুকছে এক মোল্লাজি। পাশের পকেটটা বড় ফোলা-ফোলা দেখাচ্ছে বলে খানের মনে হল সন্দেহের উদয়। হাঁক ছেড়ে শুধোল, জেবমে ক্যা হ্যায়। থতমত খেয়ে বললে, কুছ নহি হুজুর, একটু পাঞ্জাবি হয়। খান তো রেগে খান খান। কী! তোর এত গোস্তাকি! পাঞ্জাবের খানদানি একজন মনিষ্যিকে তুই পুরেছিস জেবে! মসজিদের ইমাম তখন ছুটে এসে এক হ্যাঁচকা টানে বের করলেন পাঞ্জাবিটা। খানকে বললেন, হুজুর, আপনারা পাঞ্জাবিরা– প্রথম আমাদের কুর্তা পরতে শিখিয়েছিলেন কি না, তাই আমরা সব কুর্তাকেই পাঞ্জাবি বলি– আপনাদের ফখরের তরে।
