পুরাণের উপাদান যখন নির্মিত হয়েছিল তখন কি সেকালের মানুষ জানত ভবিষ্যতের মহাকবি পুরাণে তাকে কীভাবে বর্ণাবেন?
পুরাণ পড়ে একদা আমার মনে হত এসব সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য। শুধু প্রশংসা করেছি পুরাণকারের কল্পনাশক্তির। আজ জানি, নিশ্চয়ই এমন কিছু ঘটেছিল যার জন্য কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়নি।
.
আগামী দিনের রূপকথার প্রসঙ্গে এসে গেল পুরাণের–নব-ভবিষ্যপুরাণের স্বরূপ-কাহিনী। কিন্তু এ দুই ইতিহাস কাব্যের সংমিশ্রণ একই উপাদানে নির্মিত হয়। একটি সম্মান পায় সাহিত্যের সিংহাসনে, অন্যটি আদর পায় ঠাকুরমার কোলে।
সাধারণজনের বিশ্বাস, মুসলমানদের পুরাণ নেই। আছে :–
রাণীর আকৃতি দেখি বিদরে পরাণ।
নাকের শোয়াস যেন বৈশাখী তুফান ॥
দুধে জলে দশ মণ করি জলপান।
আশী মণী খানা ফের খায় সোনাভান ॥
শৃঙ্গার করিয়া বিবি বামে বান্ধে খোঁপা।
তার পরে খুঁজে দিল গন্ধরাজ চাপা।
যে রানির শ্বাস কালবৈশাখীর মতো, যিনি নাশতা করেন দশমণ ওজনের দুধ-জল দিয়ে এবং মধ্যাহ্নভোজনের ওজন যার আশি মণ, তিনি যদি পুরাণের নায়িকা না হন তবে কিসের? তাই সোনাভানের পুঁথি কেচ্ছা-সাহিত্যের অনবদ্য কুতুবমিনার।
আর রূপকথা? তার তো ছড়াছড়ি। কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি!
গালেবুতুরুম বাশশা (বাদশাহ)–পাঠক, গালেবুতুরুম নামটার দিকে তোমার দৃষ্টি আকর্ষণ করি– অবশ্য বস্তুতান্ত্রিক সমালোচক আপত্তি জানিয়ে বলবেন, গালেবুতুরুম্ গাল-ভরা নাম; এটা শোনার জিনিস, দেখার নয়–অতএব পাঠকের কর্ণ আকর্ষণ কর। কিন্তু করি কী প্রকারে? ব্যাকরণসম্মত বাক্যই যে সুজনসম্মত কর্ম হবে শাস্ত্রে তো সেরকম কোনও নির্দেশ নেই।
গালেবুতুরুম বাশশা; মক্কাশশর (মক্কা শহরে) তার বারি (বাড়ি)। পাঠক সাবধান, আরবভূমির প্রামাণিক ইতিহাস অনুসন্ধান করতে যেয়ো না। এ বাশশা, এ মককাশশর বাস্তব জগৎ ছাড়িয়ে চিন্ময় দুলোকের চিরঞ্জীব আকাশকুসুম রূপে পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে।
এবং এ ন-মাসের কাহিনী তার সর্বশ্রেষ্ঠ রূপ পাবে ভাটিয়ালি গীতে। কত বিচিত্র রূপ নেবে সে আমার কল্পনার বাইরে। একটা মোতিফ যে বার বার ঘুরেফিরে আসবে সে বিষয়ে আমার মনে কোনও দ্বিধা নেই।
মুক্তিফৌজে ডাকে মোরে,
থাকুম্ ক্যামনে কও!
গামছা দিয়া পরানডারে
বাইন্ধা তুমি লও।
পাঠক আমার অনধিকার চর্চা ক্ষমা কর।
কিন্তু যেসব সমসাময়িক সাহিত্যস্রষ্টা এ যুগের ক্ষুধা এ যুগের চাহিদা মেটাতে পারতেন তাঁদের অনেকেই তো আজ আর নেই। হায়দার কোথায়, কোথায় মনির? আমি শুধু আমার অন্তরঙ্গজনের কথাই বলছি। এসব বাংলাদেশী-সাহিত্যিকদের প্রতিই তো ছিল ইয়েহিয়ার বিকটতম আসুরিক জিঘাংসাবৃত্তি।
আমার পিঠুয়া ছোট বোনের ছেলে একটি চাটগাঁয়ে ব্যবসা করত। ভালো ব্যবসা করত। সে যত না সাহিত্য সৃষ্টি করত, তার চেয়ে বেশি করত সাহিত্যসেবা। ব্যবসা থেকে দু পয়সা বাঁচাতে পারলেই বের করত ত্রৈমাসিক– প্রাচী।
এপ্রিলের গোড়ার দিকে না-পাকরা তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে গুলি করে মারে।
.
০২.
না-পাক অফিসারদের ভিতর এক ধরনের চটি ত্রৈমাসিক বিলি করা হয়। আষ্টেপৃষ্ঠে কড়া পাঠনাই জবানে ছাপা থাকে অনধিকারীর হস্তে এ কেতাব যেন কস্মিনকালেও না পড়ে; ফালতো কপি যেন ফলানা ঠিকানায় পাঠানো হয়। কিন্তু প্রাণের ভয়ে যখন মোগল পাঠান তুর্ক আফগান (অবশ্য পাকিস্তানিরা) মুক্তকচ্ছ হয়ে বাপ্পো-বাপ্পো রব ছেড়ে পালাচ্ছেন তখন টপসিক্রেটই হয়ে যায় বটমলেস। শুনেছি, শেষ খালাসি লাইফবোটের শরণ না পাওয়া পর্যন্ত মাল জাহাজ এমনকি আধা-বোটের কাপ্তেন তক্ জাহাজ ছাড়ে না– মানওয়ারি জাহাজের কথা বাদ দিন। আর এসব কাপ্তেন-রা জোয়ানদেরও না জানিয়ে রেতের অন্ধকারে, অ্যারোপ্লেন হেলিকপটার যা পান তাই চুরি করে বর্মা বাগে পাড়ি দেন– এগুলো যুদ্ধের কাজে এমনকি আহত সৈন্যদের সরাবার জন্যও যে দরকার হতে পারে সেকথা মনের কোণেও ঠাই না দিয়ে। জোয়ানরা তাই টপসিক্রেট চোখের মণি এইসব বুলেটিন ঠোঙাওলাদের কাছে বিক্রি করেছিল কি না জানিনে* কিন্তু পাকেচক্রে এরই দু চারখানা আমার হাতে ঠেকেছে। যে খায় চিনি তাদের যোগায় চিন্তামণি।
[*সেবারে (১৯৭১-এ) ঈদ পড়েছিল ২০/২১ নভেম্বরে। সেই বাহানায় পাঞ্জাবি মহিলারা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করতে আরম্ভ করেন। কিন্তু কিছু অফিসারও সময় থেকে গা-ঢাকা দেবার প্র্যাকটিস রপ্ত করতে থাকেন। ১৬ ডিসেম্বর না-পাক আঁদরেলরা আত্মসমর্পণ করেন। আপিসরেরা তার আগের থেকেই দুই দল নারায়ণগঞ্জ খুলনা থেকে জেলেনৌকোয় করে, তৃতীয় দল প্লেনে করে পালাতে শুরু করেছেন দেখে তাদের বাড়ির পাহারাওলা সেপাইরা হুজুরদের মালপত্র বিক্রি করতে থাকে। পরে আত্মসমর্পণ করার প্রাক্কালে কেউ কেউ গাদা গাদা নোট বাঙালিদের সামনে পোড়ায়– বরঞ্চ যমকে সোয়ামি দেব, তবু সতীনকে না ভাবনা অনেকটা ওই। অন্যরা গোপন জায়গায় পুঁতে রেখে গেছে। শান্তি তো একদিন ফিরে আসবেই; তখন কাবুলিওলার ছদ্মবেশে কিংবা তীর্থযাত্রী রূপে মরে যাই, কী ধর্মপ্রাণ! এদেশে এসে উদ্ধার করবে।]
যেমন আপিসরকে উপদেশ দেওয়া সেই টপসিক্রেট চোখের মণিতে তুমি যদি কোনও নদীপারে পোস্টেড হও তবে জোয়ানদের সাঁতার শেখাবে। ওহ! কী জ্ঞানগর্ভ উপদেশ!
