আমি কোনও প্রশ্ন শুধোইনি। কোনওকিছু জানতে চাইনি।
আমার নির্বাক স্তম্ভিত ভাব দেখে আর সবাই আপন আপন কথাবার্তা বলা বন্ধ করে দিলেন। কিছুক্ষণ পরে সে জড় নিস্তব্ধতা ভাঙবার জন্য আমিই প্রথম কথা বলেছিলুম। মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণে এনে প্রার্থনা করছি, হে আল্লাতালা, এ সন্ধ্যাটা তুমি আমাকে কাটিয়ে দিতে দাও, কোনও গতিকে।
আমার বিহ্বলতা খানিকটে কেটে গিয়েছে ভেবে–আল্লা জানেন, এ বিহ্বলতা কালধর্মে ক্রমে ক্রমে ক্ষীণতর হবে কিন্তু এটাকে সমূলে উৎপাটিত করার মতো যোগীশ্বর আমি কখনও হতে পারব না– এক দরদি শুধোল, আপনারও এ ন-মাস নিশ্চয়ই দুশ্চিন্তায় কেটেছে। আপনার স্ত্রী আর দুটি ছেলে তো ছিল ঢাকায়।
আমি বললুম, আপনাদের তুলনায় সে আর তেমন কী? সেকথা না হয় উপস্থিত মুলতুবি থাক।
নানা জাতের আলোচনা ভিড় জমাল। তবে ইয়েহইয়ার আহাম্মখী, ভুট্টোর বাঁদরামি, পাকিস্তানের (বাংলাদেশ রাহুমুক্ত হওয়াতে পাকিস্তানের যে অংশটুকু বাকি আছে তাই নিয়ে এখন বাকিস্তান) ভবিষ্যৎ মাঝে মাঝে ঘাই মেরে যাচ্ছিল। কথাবার্তার মাঝখানে আমার মনে হল, এঁরা যেন আমাকে স্পেয়ার করতে চান বলে আপন আপন বীভৎস অভিজ্ঞতার কথা চেপে যাচ্ছেন।
এমন সময় গৃহকর্তা আমার সখা এসে সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, আমার ছোট বোনটি আপনাকে দেখতে চায়। আমি একগাল হেসে বললুম, বিলক্ষণ, বিলক্ষণ! নিশ্চয়, নিশ্চয়। আমি যে অত্যন্ত গ্যালান্ট সে তো সবাই জানে।
সাদামাটা গলায় বন্ধু যোগ করলেন, এর উনিশ বছরের ছেলেটিকে পাকসেনারা গুলি করে মেরেছে।
.
পাঠক ভাববেন না, আমি বেছে বেছে কতকগুলি বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত উদাহরণ দিয়ে ন-মাসের নির্মমতার ছবি আঁকছি। তা নয়। এ মন্বন্তর এ মহাপ্রলয় এমনই সর্বব্যাপী, এমনই কল্পনাতীত বহুমুখী, প্রত্যেকটি মানুষের হৃৎপিণ্ডে এমনই গভীরে প্রবেশ করেছে, এক একটা শাণিত শর, যেন এক বিরাট প্রাবন সমস্ত দেশটাকে ডুবিয়ে দিয়ে সর্বনরনারীর হৃৎপিণ্ডের প্রতিটি র কর্দমাক্ত জলে ভরে নিরন্ধ করে দিয়ে এই দুখিনী সোনার বাংলাকে এমনই এক প্রেত-প্রেতিনী গুশৃগালের সানন্দ হুহুঙ্কার ভূমিতে পরিণত করে দিয়ে গিয়েছে, যে তার সর্বব্যাপী সর্বাত্মক বহুবিচিত্র রূপ আপন চৈতন্যে সম্পূর্ণরূপে সংহরণ করতে পারেন এমন মহাকবি মহাত্মা কোনও যুগে জন্মাননি। এরই খণ্ডরূপ আয়ত্ত করে প্রাচীনকালে কবি-সম্রাটগণ মহাকাব্য রচনা করেছেন। আমার মনে হয় একমাত্র মধুসূদন যদি এ যুগের কবি হতেন তবে তিনি মেঘনাদবধ না লিখে যে মহাকাব্য রচনা করতে পারতেন তার তুলনায় মেঘনাদ ঝিল্লিধ্বনির ন্যায় শোনাত।
হয়তো বহুযুগ পরে, মহাকালের পরিপ্রেক্ষিতে, চক্রনেমির পূর্ণাবর্তন সম্পূর্ণ হলে মানুষ পুনরায় মহাকাব্য রচনা করতে সক্ষম হবে। যদি হয়, তবে সে মহাকাব্যের সম্মুখে অন্য সর্ব মহাকাব্য নিষ্প্রভ জ্যোতিহীন হয়ে যাবে। একমাত্র মহাভারতই তখনও ভাস্বর থাকবে। তবে সঙ্গে সঙ্গে বলি সম্পূর্ণ নিরর্থক পৈশাচিক নিষ্ঠুরতায় বাংলাদেশের সে মহাকাব্য পরবর্তী সর্ব মহাকাব্যের অগ্রজরূপে পূজিত হবে।
জানি, ভীমসেন দুঃশাসনের রক্তপান করেছিলেন। কিন্তু সেটা প্রতীক। এস্থলে পাকসেনারা নিরীহ বালকের আধখানা গলা কেটে ছেড়ে দিয়েছে। বালক ছুটেছে প্রাণরক্ষার্থে, হুমড়ি খেয়েছে, পড়েছে মাটিতে, আবার উঠেছে আবার ছুটেছে। বধ্যভূমি অতিক্রম করার পূর্বেই তার শেষ পতন।
খান সেনারা প্রতি পতন, প্রতি উত্থানে খল-খল করে অট্টহাস্য করেছে।
শুনেছি কে কজনকে এ পদ্ধতিতে নিধন করা হয়েছে তার রেকর্ড রাখা হত এবং পদোন্নতি তারই ওপর নির্ভর করত।
.
মহাকাব্য লেখা হোক, আর না-ই হোক, এদেশের দাদি নানী এখনও রূপকথা বলেন। মরণোন্মুখ রাক্ষসী পাগলিনী প্রেতিনীপারা, দক্ষিণে বামে সর্ব লোকালয় জনপদ বিনাশ করতে করতে ছুটে আসছে যে-ভোমরাতে তার প্রাণ লুক্কায়িত আছে সেটাকে বাঁচাতে। এসব রূপকথা ভবিষ্যতের কপ-কথার সামনে নিতান্তই তুচ্ছাতিতুচ্ছ বলে মনে হবে। যে চার বছরের মেয়েটির কথা বলেছিলাম সে যেদিন দাদি নানী হবে–ইতোমধ্যে সমস্ত জীবন ধরে বিকট বিকট দুঃখ-দুর্দৈবের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বয়ান যার জীবনে জমে জমে হয়ে উঠবে পর্বতপ্রমাণ– সে যে রাক্ষসীর বর্ণনা দেবে সে রাক্ষসী সংখ্যায় ক্রমবর্ধমান অগণিত। মান্ধাতার আমলের সাদা-মাটা রাক্ষসী রাস্তায় দাঁড়াত না–এসব রাক্ষস ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাদের আধখানা গলা কেটে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে, গ্রামের মসজিদ দেউলের সামনে ছেড়ে দিয়ে হাসতে হাসতে ভস্মশয্যায় গড়াগড়ি দেবে। অঋতুপ্রাপ্তা শিশুকন্যাকে পাশবিক অত্যাচারে অত্যাচারে নিহত করে প্রেতার্চনার থালা সাজাবে নরখাদক পিশাচরাজ ইয়েহিয়ার পদপ্রান্তে।
অন্তরীক্ষে শঙ্কর স্তম্ভিত হয়ে তাণ্ডবনৃত্য বন্ধ করবেন।
লক্ষ বিষাণে ফুঙ্কারে ফুঙ্কারে কর্ণপটহবিদারক ধ্বনিতে ধ্বনিতে আহ্বান জানাবেন লক্ষ লক্ষ চক্রপাণিকে– এবারে মাত্র একটি সতীদেহ খণ্ডন নয়।
লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত পিশাচ বহির্গত বন্দিশালা হতে
মহাবৃক্ষ সমূলে উপাড়ি ফুকারি উড়ায়ে চলে পথে—
সে নিধন ভবিষ্যতের পুরাণে কী রূপ নেবে সে তো এ যুগের নরনারীর দৃষ্টিচক্রবালের বহু সুদূরে।
