সেমিনার বাড়ি তখন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে। সবকিছু পুঁথিপত্র কেতাব কাগজের ব্যাপার। পুরনো কেতাবে আবার আর্দ্রতা এক্কেবারেই থাকে না। বারুদ-পেট্রলের পরেই বোধ হয় তারা পুড়ে মরতে জানে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে।
উইলি তখনও ওঠানামা করছে।
উইলির বউ প্রতিবার স্বামীকে উপরে যেতে বারণ করছে। সে-ও প্রতিবার বলে, এই শেষবার, বউ। আর যাব না।
কী আর বলব।
উইলির বউ বলেছিল, হঠাৎ বাড়িটা যেন একসঙ্গে হুড়মড়িয়ে ভেঙে পড়ল। লটে রুমাল বের করে চোখের জল মুছল।
বললে, জানো সায়েড, উইলির বউ আমাকে দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে বলেছিল, শেষবারের মতো উইলি যখন তার বউকে বলে, এই তার শেষ ক্ষেপ, আর উপরে যাবে না, তখন তার গলায় এমন কিছু ছিল যার থেকে বউ বিশ্বাস করেছিল, এর পর আর সে উপরে যাবে না। সে তার কথা রেখেছিল–না? উপরে সে যায়নি–নাবেইনি যখন।
আরেকটা কথা আমার মনে বড় দাগ কেটেছে। উইলির বউ যেসব পাণ্ডুলিপি নিরাপদ জায়গায় এক উঁইয়ের উপর আরেক উঁই ডাম্প করেছিল সেগুলো পরে সরাবার সময় ব্রা পড়ল উইলি ফাস্ট প্রেফরেন্স দিয়ে সক্কলের পয়লা উদ্ধার করেছিল ছাত্রদের অসমাপ্ত অসম্পূর্ণ থিসিস– তার পর অধ্যাপকদের পাণ্ডুলিপি। … তোমাদের, আই মিন, ছাত্রদের সে খুব ভালোবাসত। না! বোধহয় জানত, প্রথম বাচ্চা প্রসব করার মতো স্টুডেন্টদের প্রথম বই– ডক্টরেট থিসিস বিয়োনোটা শক্ত ব্যাপার। আবার সেই বাচ্চা, আই মিন, ওই অর্ধসমাপ্ত পাণ্ডুলিপিও যদি পুড়ে গিয়ে বিনষ্ট হয়ে যায়। সে তো মারাত্মক গর্ভপাত। প্রফেসরদের তো সে ভাবনা নেই। তাদের কেউ কেউ তো শুনেছি, বছরবিয়েনি– বছরের এ মোড়ে একখানা কেতাব, ওই মোড়ে আরেকখানা।
জ্বলন্ত কেতাব-পুঁথির আগুনে পুড়ে মারা গেল উইলি।
আমার মনে পড়ে গেল আরব পণ্ডিত বহুর উল জাহিজের কথা।*
[*যারা এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার নামে অজ্ঞান, তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিবেদন, সে কেতাবে তাঁর মৃত্যুর সন দেওয়া হয়েছে ১৮৬৯। আসলে তার মৃত্যু ৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে।]
মৃত্যুর তিন-চার দিন পূর্বে তার স্বাস্থ্যের একটুখানি উন্নতি দেখা দেওয়াতে তিনি তার স্ত্রীকে অনুরোধ করেন, তাঁকে যেন ধরে তাঁর কাজ করার তক্তপোশে নিয়ে যান। স্ত্রী আপত্তি জানালে তিনি অনুনয় করে বললেন যে, তার বইখানার আর মাত্র কয়েকখানি পাতা লিখলেই বইটি সমাপ্ত হয়।
জাহিজ যে জায়গায় বসে কাজ করতেন তার চতুর্দিকে থাকত দু-চার গজ উঁচু বইয়ের মিনার।* তারই নিচের একখানা টেনে বের করার চেষ্টাতে সে মিনার তো ভেঙে পড়লই, তার ধাক্কাতে আর কটা মিনারের বিস্তর বইয়ের তলায় চাপা পড়লেন জাহিজ। বই সরানো হলে দেখা গেল, বইখানা সমাপ্ত করতে গিয়ে তিনি জানটি খতম করে দিয়েছেন।
[*বঙ্গীয় শব্দকোষের লেখক ঈশ্বর হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই পদ্ধতিতে কাজ করতেন। তার পাণ্ডুলিপির এক ক্ষুদ্র অংশ তিনি তাঁর কঁচা ঘরে রেখে বিদ্যালয়ে পড়াতে যান। ঘরে আগুন লাগাতে তিনি অর্ধোন্মাদ উইলির মতো জ্বলন্ত গৃহে প্রবেশ করতে গিয়ে বাধা পান। হরিচরণের প্রতি নিয়তি– অন্তত উপরের দুই বিষয়ে সদয় ছিলেন। তার পরলোকগতি জাহিজ বা উইলির মতো হয়নি। তিনি অন্ধ হয়ে যান।]
তাঁর জীবনীকার বলেছেন, পণ্ডিতের পক্ষে পুস্তক্যুপের নিচে গোর পাওয়ার চেয়ে শ্লাঘনীয় সমাধি আর কী হতে পারে!
উইলি পণ্ডিত ছিল না। কিন্তু পণ্ডিতদের সেবক, পুস্তক সংরক্ষণের একনিষ্ঠ সাধক। পুস্তক সহমরণে সমাধি লাভ করল– এর চেয়ে শ্লাঘনীয় শেষকৃত্য আর কী হতে পারে।
বাংলাদেশ
০১.
এই নয় মাসে যা ঘটেছে সেটা পৃথিবীর ইতিহাসে তুলনাহীন। পাঠক সাধারণ যেন না ভাবেন এটা একটা কথার কথা মাত্র। ঠিক দু মাস পূর্বে ১৫ জানুয়ারিতে আমি এখানে এসেছি। দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস ধরে আমার অগণিত আত্মীয় আত্মজনের আপন আপন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা দিনের পর দিন শুনে গিয়েছি। এমন একটি মাত্র প্রাণী পাইনি যার কোনও কিছু বলার নেই। মাত্র চার বছরের শিশুরও তার আপন গল্প আছে। সে আদৌ বুঝতে পারেনি ব্যাপারটার কারবার জীবন-মৃত্যু নিয়ে। আমাকে বললে, মা আমার হাত চেপে ধরে চানের ঘরে নিয়ে গিয়ে ফিস্-ফিস্ করে বললে, চুপ করে থাক, কথা বলিসনি, টু শব্দটি করবিনি। সমস্তক্ষণ কানে আসছে বোমা ফাটার শব্দ। আমি ভেবেছি, একসঙ্গে অনেকগুলি বিয়ের আতশবাজি ফাটছে। মা এত ভয় পাচ্ছে কেন? …প্রাচীন দিনের এক বন্ধু তাঁর বাড়ি নিয়ে গেলেন– তাঁর আত্মীয়েরা আমার সঙ্গে পরিচিত হতে চান। গিয়ে দেখি, প্রাচীনতর দিনের সখা আমার প্রিয় কবি আবুল হোসেন বৈঠকখানার তক্তপোশে বসে আত্মচিন্তায় মগ্ন। আমাকে দেখে মুচকি হেসে বললেন, এই যে। যেন ইহসংসারে এই ন-মাসে বলার মতো কিছুই ঘটেনি। আর পাঁচজন আশ-কথা পাশ-কথা বলছিলেন। বর্বর না-পাকদের সম্বন্ধে মামুলি কথা। আমি কেন জানিনে কবির দিকে একবার তাকালুম। তারই পাশে আমি একটি কৌচে বসেছিলুম। অতি শান্তকণ্ঠে ধীরে ধীরে বললেন, আমার চুয়াত্তর বছরের বৃদ্ধ আব্বা গাঁয়ের বাড়ির বৈঠকখানায় চুপচাপ বসেছিলেন। জানতেন না-পাকরা গায়ে ঢুকেছে। তিনি ভেবেছেন, আমি চুয়াত্তর বছরের বুড়ো। আমার সঙ্গে কারওরই তো কোনও দুশমনি নেই।… না-পাকরা ঘরে ঢুকে তাকে টেনে রাস্তায় বের করে গুলি করে মারল।
