সেকথা যাক। আমার মনে কিন্তু একটা ধোকা ছিল। উইলি যদি সত্যই পাণ্ডিত্য বাবদে এতই উদাসীন হয় তবে সে আমাদের জন্য বই জোগাড় করার বেলা এত তুলকালাম কাণ্ড করে কেন? প্রয়োজনমতো আমরা তাকে সকালবেলা যেসব পুস্তক ধার চাই তার একটা ফর্দ দিতুম। সেইটেই নিয়ে সে যেত বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে। এবং ফিরে এসে করিডরে ঢুকতে না ঢুকতে প্রায়ই শোনা যেত তার উচ্চ কণ্ঠস্বর;-অর্থ, কয়েকখানা বই সে পায়নি। আমাদের কেউ কেউ তাকে কখনও-সখনও বোঝাবার চেষ্টা করেছি, সবসময় সব বই পাওয়া যায় হেন লাইব্রেরি ইহসংসারে নেই। আমি স্বয়ং একদিন তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলুম, ও-বই না পেলেও আমার কাজ আটকাবে না। উইলি মাস্টার গরগর করে বলেছিল, আটকাবে কেন? বই না হলে কি সংসার চলে না? বই লেখা না হওয়ার আগে কি সংসার চলেনি? ইত্যাদি ইত্যাদি!
১৯৩২-এ পরীক্ষা পাস করে দেশে ফিরলাম। ১৯৩৪-এ ফের বন শহরের সেমিনারে উইলির সঙ্গে দেখা। এবারে আমাকে সেখানে তিনবেলা খেটে মরতে হত না। কিন্তু উইলিকে প্রাচীন দিনের কায়দা অনুযায়ী মাঝে মাঝে একটা সিগার দিতুম। হিটলার তখন দেশের কর্ণধার। তার চেলাচামুণ্ডারা গরম গরম বুলি কপচাচ্ছে। প্রধান বুলি যুদ্ধং দেহি। কিন্তু আজ এই বঙ্গদেশে এখনও বারুদের গন্ধ যায়নি। ও-কথা থাক!
১৯৩৮-এর গরমের ছুটিতে বন শহরে পৌঁছেই গেলুম সেমিনারে পথমধ্যে উইলির সঙ্গে দেখা। ততদিনে নাৎসি আদেশে প্রায় সবাই একে অন্যকে হাইল হিটলার বলে নমস্কার জানায়। গুটেন মর্গেন গুটেন আবেনট উঠে যাওয়ার উপক্রম। অনেকটা যেমন অভ্যাসবশত উইলিকে হাইল হিটলার বলে প্রীতি-অভিবাদন জানালুম। চার বছর পরে দেখা। উইলি সানন্দে আমার পিঠ চাপড়ে দিয়ে কাছে এসে কেমন যেন বিষাদভরা গম্ভীর কণ্ঠে বললে, তুমি তো, বাপু, বিদেশি। তুমি আবার হাইল হিটলার করছ কেন? কথাটা সত্য। বিদেশির পক্ষে এ-আইন প্রযোজ্য ছিল না।
বুঝলুম অবশ্য আগেই অনুমান করেছিলুম– উইলি প্রচ্ছন্ন হিটলারবৈরী।
এইবারে লটে যেন আমার কাহিনীর খেই ধরে নিয়ে বললে, উইলি রাজনীতির বড় একটা ধার ধারত না। কিন্তু যুদ্ধ লেগে যাবার পর তখন আর কোথায় রাজনীতি কোথায় কী? গোড়ার দিকে জয়ের পর জয়। চতুর্দিকে হর্ষধ্বনি। বৃদ্ধেরা হিসাব করে দেখালেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তুলনায় এ যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা নগণ্য। তাই সই। কিন্তু তখন কজন জানত জঙ্গল থেকে। পুরোপুরি বেরুবার পূর্বেই আনন্দধ্বনি ছাড়তে নেই : আরম্ভ হল জর্মনির উপর বোমাবর্ষণ। প্রথমটায় বড় বড় শহরের উপর। ওই সময় একদিন ব্ল্যাক-আউটের ঠেলায় আশ্রয় নিতে হল উইলি-পরিবারে। স্বয়ং উইলির তখন দম ফেলার ফুরসত নেই। হেথা-হেথা ট্রেঞ্চ খুঁড়ছে, বুংকার বানাচ্ছে এবং তার সবচেয়ে বড় কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেমিনার বাড়িটাকে যেন হিটলারের আবাসভূমি কিংবা বাকিংহাম প্রাসাদের চেয়েও সুরক্ষিত জিব্রটর-দুর্গে পরিণত করে ফেলতে পারে– সে একা, তার দু-খানা হাত দিয়ে। স্বয়ং লর্ড মেয়ার থেকে আরম্ভ করে ভায়া রেকটর হয়ে, সেমিনারে এই একটিমাত্র নাৎসি, লেকচারার শোডার এস্তেক সে সকলের সঙ্গে ঝগড়াকাজিয়া কান্নাকাটি করে জোগাড় করেছে সেমিনারের বরাদ্দানুযায়ী প্রাপ্যের চেয়ে তিন ডবল মালমশলা; অষ্টপ্রহর বয়ে বেড়াচ্ছে বালির বস্তা, ইট-সিমেন্টের ডাঁই।
লটে বললে, হ্যার উইলি ঘরে ঢুকল মজুরদের এপ্রন গায়ে। সর্বাঙ্গ স্বেদসিক্ত কর্দমাক্ত। কথায় কথায় আমি বললুম, মার্কিনরা যত বুদ্ধ হোক, ওরা তো জানে, বন ইউনিভার্সিটি টাউন, এখানে বন্দুক-কামানের কারবার নেই বললেও চলে। এখানে বোমা ফেলে ওদের কী লাভ?
উইলি একটু শুকনো হাসি হেসে বললে, মার্কিনরা বন শহরটাকে ভালো করেই চেনে। এই সেমিনারেই কত মার্কিন এল-গেল। ডকটরেট পাস করল বাইবেল নিয়ে কাজ করে। আমিও তো অন্তত জনাতিরিশকে চিনি। ওরাই আমাকে বলেছে, তাবৎ মার্কিন মুল্লুকে সবচেয়ে বেশি করে নামকরা এই বন-এর ইউনিভার্সিটি। কিন্তু লড়াইয়ের ব্যাপারে ওরা আকাট। আকাশ থেকে বন শহরটাকে সনাক্ত করবে প্যারিস বলে, ভিয়েনাকে ভাববে ইস্তাম্বুল। আর হাতের তাগ তো জানো। দুনিয়ার সবকিছু এক্কেবারে চাঁদমারীর মধ্যিখানের বুলস-আইয়ের মতো বেধড়ক হিট করতে পারে–সব হিট করতে পারে, শুধু যেটাকে হিট করতে চায়, যেটাকে ভাগ করেছে সেইটে ছাড়া! তাগ করবে বার্লিনের রাইষটগ, বোমা পড়বে বন-এর সেমিনারের উপর।
লটে বললে, আমি জানতুম না উইলি দুরবস্থা দুদৈর্ব নিয়েও পুটকারি করতে পারে। কিন্তু তার কথাই ফলল। ভগবান যে কখন কার মুখ দিয়ে কোন ভবিষ্যদ্বাণী করিয়ে নেন কে জানে। এবং এখনও জানিনে কোন নিশানা তাগ করতে গিয়ে তারা লাগিয়ে দেয় সেমিনারের পাশের বাড়িতে আগুন।
উইলি তো প্রথম আপ্রাণ চেষ্টা দিল আগুনটা যাতে ছড়িয়ে না পড়ে। যুদ্ধের শেষের দিক-শক্ত জোয়ানসোমথ মদমানুষ কোথায় যে তাকে সাহায্য করবে; আগুন পোঁছে গেল সেমিনার বাড়িতে।
তখনকার দিনের সেই ঘেঁড়াখোঁড়া সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহায্যে অনেক আগেই উইলি বিস্তর মূল্যবান পুঁথিপত্র পাণ্ডুলিপি নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু সেমিনারের নিত্যদিনের গবেষণাকর্ম পঠন-পাঠন সিলমোহর সেঁটে তো একেবারে বন্ধ করে দেওয়া যায় না– বিশেষ করে ছাত্রদের অসম্পূর্ণ ডক্টরেটের থিসিস, অধ্যাপকদের পুস্তক। উইলি পাগলের মতো দোতলা-তেতলা উঠছে-নামছে আর দু-হাতে জড়িয়ে ধরে সেসব সেমিনারের দোরের গোড়ায় নামাচ্ছে। তার বউ সেগুলো দূরের অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে।
