কাঁটায় কাঁটায় রাত দশটায় উইলি এসে আমাকে হুনো লাগিয়ে একখানা লেকচার ঝাড়ত। রাইনল্যান্ডের গাঁইয়া ডাএলেক্টে। সে ভাষা বোঝে কার সাধ্যি? সেমিনারের নমস্য পণ্ডিতগণ তো কানে ডবল আঙ্গুল পুরতেন। আমি যে অক্লেশে বুঝতে পারতুম তার একমাত্র কারণ আমার দিনযামিনী কাটত এই শেষের ক মাস ছাড়া শহরের বেকার, ফোকটে পয়সা মারায় তালেবর, ঘাঘরা-পল্টনের তাবেদার মস্তানদের সঙ্গে। তারা গ্যোটে-শিলারের ভাষায় কথা কয় না। কিন্তু থাক সে পুরনো কাসুন্দো।
সে লেকচারের সারাংশ : কী হবে হে, ছোকরা অত নেকাপড়া করে? দুটো প্যাখনা গজাবে বুঝি? ঢের ঢের বাঘা বাঘা পণ্ডিতদের তো এই হাতের চেটোতে চটকালুম, বাওয়া, অ্যাদ্দিন ধরে! কী পেলুম ক দিকিনি, তবে বুঝি তোর পেটে কত এলেম। বলি– কান পেতে শোন, আখেরে ফয়দা হবে, তাই ভাঙিয়ে খাবি। এই যে হেথায় কেতাবে কেতাবে চতুর্দিক ছয়লাপ, ওদেরই মতো ওরা খসখসে শুকনো বুঝলি, শুকনো। রসকষের নামগন্দো নেই। বাড়ি যা, বাওয়া বাপের সুপুর– দু-গেলাস বিয়ার স্যাঁটস্যাঁট করে মেরে দে। গায়ে-গত্তি লাগবে। জানটা ত-র-র-র হয়ে যাবে, চোখের সামনে গুল-ই-বাকওয়ালির পাল ফটফট করে ফুটে উঠবে।
আমি পকেট থেকে একটা সস্তার চেয়েও সস্তা সিগার বের করলুম। এদেশে সেটাকে র্যাট কিলার মূষিক নিরোধ খেতাব দেওয়া হয়। কিছু না, রান্নাঘরে ওরই এক টুকরো রেখে দিন। আর দেখতে হবে না পরের দিন গণ্ডাখানেক মড়া ইঁদুর ঘরে-বাইরে পেয়ে যাবেন। ওই সিগারে বার দুই ঠোক্কর মেরেই অক্কা লাভ করেছেন। এই সোনার শহর কলকাতাতেও বিড়িওলার কুঠুরিতে ব্লেক-আউটের মধ্যিখানেও সে দিব্য মূর্তমান। আমার এক মিত্র আকছার ওই মাল আমাকে রুপোর কেস থেকে বের করে সাড়ম্বর প্রেজেন্ট করে জানিনে কোন্ দুরাশায়।
উইলির দিকে এগিয়ে দিয়ে সিরিয়াস গলায় বলতুম, পাক্কা বাকিংহাম পেলেসের সিগার। বহু কষ্টে তোমার জন্য পাচার করেছি। লাও, হল তো?
উইলি পুনরায় সেই ধুয়ো ধরে, কী যে হয় নেকাপড়া করে–বিড়বিড় করতে করতে চলে যেত এক পণ্ডিতের কামরায়। সেখানে লেকচার না ঝেড়ে চাবির গোচ্ছাটা শুধু ঝমঝমাত।
উইলি আর ঘণ্টা দেড়টাক তাড়া দিতে আসত না।
কে বলে শুধু জর্মন মুল্লুকে ঘুষের মতো লুবরিকেনট ভাদ্রবধু?
তবে হ্যাঁ, বলে রাখা ভালো, উইলি সিগারটার সওগাৎ প্রতিবারে নিত না। না নিলে ও আমার ম্যাদ বাড়াত, নিত্যি নিত্যিই।
.
৩৭.
অর্ধশিক্ষিত বহু মার্কিন যে একটিমাত্র জর্মন বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতির কথা শুনেছে সেটি বন শহরে প্রতিষ্ঠিত। এবং সে-খ্যাতির জন্য চোদ্দ আনা শিরোপা পায় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের যে বিভাগ তরো-বেতেরো ভাষা শেখায় প্রাচীন মিশরীয় বাবিলনীয়, বৈদিক সংস্কৃত থেকে আরম্ভ করে অন্যদিনের মডার্ন জাপানি পর্যন্ত তার নাম ওরিয়েন্টাল সেমিনার। এখানে দুনিয়ার কুলে রকমের ঝোঁপ থেকে নানান রঙের চিড়িয়া আসে হরেক রকমের বুলি শেখার তরে এবং মাঝেমধ্যে অধ্যাপকরা যখন সেমিনারে অনুপস্থিত, তখন যা কিচিরমিচির লাগায় তাতে ধ্বনিশাস্ত্রের জানা-অজানা কোনও আওয়াজই বাদ যায় না। ওদিকে মার্কিনদেশের বাসিন্দাদের জাত আগাপাশতলা সাতান্ন জাতের জগাখিচুড়ি দিয়ে তৈরি। তাই তারা আসে বন শহরে, আর অনেকেই জর্মন দেশের সেরা সেই সেমিনারে বসে পড়ে আপন আপন মাতৃভাষায় খবরের কাগজ। অনেকটা সেই কারণে সেমিনারের কাছেই ছিল একটি খবরের কাগজের হরবোলা কিয়োস। আমরা উইলিমাস্টারকে কাছে পেলে তার হাতে পয়সা গুঁজে দিয়ে বলতুম, ফেরার সময় আমার জন্য সেই খবরের কাগজটা এনে দেবে তো? সেই বলার কারণ ওস্তাদ উইলি পৃথিবীর তাবৎ ভাষা উচ্চারণ করত তার আপন নিজস্ব মৌলিক গাঁইয়া রাইন উচ্চারণে। আমি স্বকর্ণে শুনেছি, সেমিনারের সর্বাধিকারী খুদ ডিরেকটর সায়েব উইলিকে বললেন একখানা টাইমস নিয়ে আসতে। উইলি এক সেকেন্ড চিন্তা করে বললে, ও! টে টিমেস? The Times-এর The জর্মন ভাষায় আইনানুযায়ী উচ্চারিত হয় টে এবং Times উচ্চারিত হবে টিমেস। ধ্বনিতন্ত্রে বাঘা পণ্ডিত অধ্যাপক মেনজেরাটের গুরুরও সাধ্য নেই যে লাতিন অক্ষরে লেখা শব্দ তা সে জর্মন হোক, ইংরেজি হোক বা সাঁওতালিই হোক, জর্মন উচ্চারণে যদি পড়তে হয় তবে মাস্টার উইলির উচ্চারণে খুঁং ধরেন। ভূরি ভূরি উদাহরণ দিয়ে ভাষা বাবদে আমার মতো মূর্খও সপ্রমাণ করতে পারবে যে মাস্টার উইলি আমাদের সেমিনারের লেকচারার হারসিগেনশৃপেকের (নামটা শুনুন স্যর! শব্দার্থ ছাগলের চর্বি) যখন অতিশয় ধোপ-দুরস্ত সুমধুর উচ্চারণসহ রাজসিক জর্মন বলতেন তখন উইলি উপস্থিত থাকলে তার মুখে স্পষ্ট দেখা যেত সে যেন প্রচ্ছন্ন কৌতুক অনুভব করছে। এমনকি যখন প্যারিস, ভিয়েনা, অক্সফোর্ড, হারভার্ডের ইয়া বড়াব্বড়া দাড়িওলা বাঘা বাঘা প্রফেসর পণ্ডিতরা আমাদের সেমিনারে এসে এ দেশের সিঙিমার্কা বিদ্যেবাগীশদের সঙ্গে একটি একটি কথা যেন সদ্য-দাগা কামান ঝেড়ে যে তুমুল বাক-বিতণ্ডার সৃষ্টি করতেন আর উইলি মেস্টার একপ্রান্তে ভুরভুরে খুশবাইয়ের ম-ম-মারা কফি সাজাত তখন তার চেহারা দেখে দিবান্ধ-জনও সম্যক হৃদয়ঙ্গম করত, উইলি একটি সাক্ষাৎ পরমহংস : মিঞা মৌলানাদের বাক্যবর্ষণের ঝরঝর বারিধারা তার রাজহাঁসের পালকের উপর পড়ামাত্রই সঙ্গে সঙ্গে ঝরে যেত। পাঠকমাত্রই অবশ্য এসব শুনে বলবেন, বড় বড় পণ্ডিতদের যুক্তিতর্কে রা আলাপ-আলোচনা উইলি বুঝবে কী করে? কাজেই তার পক্ষে ওই প্রতিক্রিয়াই তো স্বাভাবিক। উত্তরে বলি, প্রবাদ আছে, কাজীর বাড়ির বাদীও দু-কলম জানে। তা জানুক আর না-ই জানুক, এসব ক্ষেত্রে বহুলোক দু-পাঁচটা লবজো কুড়িয়ে নিয়ে বের ন্যায় বিদ্যে জাহির করে। কিন্তু এহ বাহ্য : স্বৰ্গত দ্বিজেন্দ্রলাল ঠাকুরকে স্মরণে এনে তারই আপ্তবাক্যের। পুনরাবৃত্তি করি : প্রকৃত সভ্যতার উপলব্ধির জন্য বিস্তর লেখাপড়া করতে হয় না, কেতাবপত্র ঘাঁটতে হয় না।.. এই যে সেদিন কুষ্টিয়া অঞ্চল রাহুমুক্ত হল, সেই অঞ্চলের গাইয়া লালন ফকিরের গীত নিয়ে কবিগুরু থেকে আরম্ভ করে যেসব তত্ত্বান্বেষী সজ্জন আলোচনা করেছেন তারা সকলেই দ্বিজেন্দ্রনাথের আপ্তবাক্যটিকে বার বার নমস্কার জানিয়েছেন।
