লটে বললে, উইলিকে তো চিনতে নিশ্চয়ই ভালো করে –তোমাদের সেমিনারের হাউসমাস্টার?
আমি বললুম, বন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন পীরমুরশিদ চিনতেন না তাকে? এস্তেক সেমিনারের বড়কর্তা প্রফেসর ডকটর পাউল কালে পর্যন্ত উইলির বাক্যস্রোত চট করে থামাবার চেষ্টা করতেন না।
এস্থলে কাহিনীর প্রথম অংশটা আমাকেই বলতে হবে। উইলির সঙ্গে লটের পরিচয় বরঞ্চ বলা উচিত ফ্রাউ উইলির সঙ্গে লটের পরিচয় হয় অনেক পরে। বিশেষত, অন্তত দুটি বছর তার সঙ্গে আমাকে মুখোমুখি হতে হত প্রতিদিন পাঁচ-দশবার। তার পদবি ছিল হাউস মাইস্টার। মাইস্টার শব্দের অর্থ জৰ্মনে যদিও মাস্টার তবু হাউস-মাইস্টার বলতে হাউস মাস্টার বা বোর্ডিং স্কুলের শিক্ষক বোঝায় না। হাউস-মাইস্টার কোনও বাড়ি বা অফিসের দেখ-ভাল করে। একে দরওয়ান বলা চলে না। বরঞ্চ ইংরেজিতে হাউস-কিপার বলা চলে, ফরাসিতে ইনিই কাসিয়েৰ্জ নামে পরিচিত।
উইলি, তোলা নাম ভিলহেলম, সেমিনার বাড়িটা ফিটফাট ছিমছাম রাখত সে-কথাটার বিশেষ উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন। সেন্ট্রাল হিটিঙে উনিশ-বিশ, মূল্যবান পাণ্ডুলিপি ফটোস্টাট করার জন্য ডার্করুমের পর্দা থেকে আরম্ভ করে সূক্ষ্মতম যন্ত্রপাতিতে এককণা ধুলো পড়ে থাকতে কেউ কখনও দেখেনি। কোনও একটা ট্যাপের ওয়াশার বিগড়ে যাওয়াতে সেটার থেকে পিটির পিটির জলের ফোঁটা ঝরছে, এহেন গাফিলতি কেটে কখনও দেখাতে পারলে, হাউস-মাইস্টার উইলি যে তনুহূর্তেই এক ছুটে রাইন ব্রিজের উপর পৌঁছে সেখান থেকে জলে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করত সে সত্য সম্বন্ধে আমাদের কারও মনে ধূলিপরিমাণ সন্দেহ ছিল না।
সেমিনার বাড়ির পাশে ছোট একটি দোতলা বাড়ির উপরের তলায় ছিল মাইস্টার উইলির কোয়ার্টার। সেখানে সর্বাধিকারিণী ছিলেন তাঁর বিবি। গাব্দাগোব্দা শরীর, হাসিভরা মুখ– ন-সিকে টিপিকাল জর্মন হাউস-ফ্রাউ। বয়স চল্লিশের মতো হবে, কিন্তু উইলিকে দেখে ঠাহর করা যেত না তার বয়স কত হতে পারে। সেমিনারের সবচেয়ে পুরনো কর্মী বলতেন, পনেরো বছর ধরে তাকে ওই একই চেহারায় দেখছেন। সর্বাঙ্গে সর্বত্র অনেকগুলি ছোট ঘোট সাইজের মাসল ছড়ানো; ছোট ছোট সাইজের কারণ আর পাঁচটা জমনের তুলনায় উইলি ছিল রীতিমতো বেঁটে।
সেমিনার পূর্ণসিদ্ধ অর্ধসিদ্ধ পণ্ডিতে পণ্ডিতে ভর্তি, আর জনা পাঁচেক সুপ্রাচীন অর্ধপ্রাচীন অধ্যাপক। সর্বশেষে ডক্টরেটের থিসিস লেখাতে ব্যস্ত আমরা কয়েকজন তো ছিলুমই। আমার মনে মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগত, এতসব পণ্ডিত আর এঁদের দিনের পর দিন একটানা বিদ্যাচর্চা দিনে দশ ঘণ্টা খাটা সেমিনারের ডাল-ভাত– এসব দেখে দেখে পাণ্ডিত্যের প্রতি উইলির মনোভাবটা ছিল কী? কাউকে যে বড্ড বেশি একটা সমীহ করে চলত, উইলির ধরনধারণ দেখে সেটা তো মনে হত না। তাকে কোনওদিন খবরের কাগজ পর্যন্ত পড়তে দেখিনি। আমি তার কোয়ার্টারে বহুবার গিয়েছি, কারণ আশপাশের কাফের তুলনায় উইলির বউ আমাদের জন্য কফি বানিয়ে দিত ঢের সস্তায়। আমাদের সময়াভাব তাই তার ব্লিৎস সার্ভিস উপেক্ষা করে খুদ কাফেতে যাওয়াটা আমরা নিছক থার্ডক্লাস স্মবারি চালিয়াতি বলে মনে করতুম। সেমিনারের জানালা দিয়ে ফ্রাউ উইলিকে শুধু আঙ্গুল তুলে দেখাতে হত ক-কাপ ক-পট কফি চাই। রেকর্ড টাইমের ভিতর ফ্রাউ উইলি ডাইনে-বাঁয়ে দুলতে দুলতে ট্রেতে করে কফি নিয়ে উপস্থিত। আমি কিন্তু সোজা ওদের ঘরে গিয়ে কফি খেতুম–কী হবে ওই ফুল স্লিম (গাব্দাগোব্দার দ্ৰ ইংরেজি প্রতিবাক্য) ফাউকে সিঁড়ি ভাঙতে দিয়ে। সেখানে একদিন লক্ষ করলুম, ঘরে মাত্র একখানা বই– বাইবেল। বহু ব্যবহৃত। আমি জানতুম, ক্যাথলিক জনসাধারণ সচরাচর বাইবেল বড় একটা পড়ে না– তারা তাদের উপাসনা পুস্তিকা নিয়েই সন্তুষ্ট, গিঞ্জেয় যাবার সময় ওই বই-ই সঙ্গে নিয়ে যায়। কথায় কথায় শুধালুম বাইবেলখানা পড়ে কে? উইলি। এবং একখানা বই ছাড়া অন্য কোনও কেতাব ছোঁয় না। তাই তো। সমস্যাটা একটু তলিয়ে দেখতে হয়।
সেমিনার খোলা থাকত সকাল আটটা থেকে রাত দশটা অবধি। জবরদস্ত গবেষকরাও রাত আটটার সময় বাড়ি গিয়ে আর বড় একটা ফিরতেন না। কিন্তু আমার তখন গৃহিতৃৈব কেশেমু মৃত্যুনা ধর্মমাচরেৎ মৃত্যু যেন তোমার চুল পাকড়ে ধরে আছেন এইভাবে ধর্মের আচরণ করবে। ধর্ম মাথায় থাকুন, মাথার উপরকার কেশ পাকড়ে ধরে আছেন আমার ট্যাক। সোজা বাঙলায় কইতে গেলে, ইংরেজ যে সত্যি বেনের জাত সেটা সপ্রমাণ করল আমার শেষ কল্পনখানা কেড়ে নিয়ে একদিন বিলকুল মিন নোটিশে– গোলড স্ট্যান্ডার্ড বর্জন করে। আদাজল খেয়ে যে কড়ি ক-টা জমিয়েছিলুম– আরও ছটি মাস জর্মনিতে বাস করে রয়েসয়ে আমার গব্বযন্তনা থিসিসখানা নামাব বলে, তাদের উপর বমিং হয়ে গেছে। গোলড স্ট্যান্ডার্ড নাকচ হওয়ার ফলস্বরূপ হঠাৎ একদিন দেখি আমার ট্র্যাকের তিনকড়ি চট্টোপাধ্যায় চটসে দু-কড়ি চাটুয্যেতে পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিলেন। অতএব আর মাত্র দুটি মাসের ভিতর যদি সেই লক্ষ্মীছাড়া থিসিসটা শেষ করে, তিন-তিনটি ভাইভা পরীক্ষা পাস না করতে পারি তবে শয়নং যত্রতত্র ভোজনং হট্টমন্দিরে তাই-বা কী করে হয়, এই পাথরফাটা শীতের দেশে যত্রতত্র শয়ন করলে মৃত্যু অনিবার্য এবং বন শহরের হাটবাজারের ভিখিরিকে দিনান্তে খয়রাতি এক পেলেট সুপ দেবার ব্যবস্থাও নেই- ফুরার হিটলার ভিয়েতন তেষার বরাতে একদিন যমরাজকে ফাঁকি দিতে পেরে অন্য পুণ্যভূমিতে পরজন্ম লাভ করলেন। তাই তখন প্রাণপণ রেস দিচ্ছি টাইমের সঙ্গে। সকাল, বিকেল পাঁচ-পাঁচ দশ ঘণ্টা কাজ করার পরও মাঝে মাঝে আলুসেদ্ধ মাখম রুটি দিয়ে ব্যানকুয়েট সেরে রাত সাড়ে আটটায় আরেক প্রস্ত সেমিনার যেতুম। কিন্তু আমার ওয়াটারলু ছিল অন্যত্র। সেটা এতক্ষণ পেশ করিনি, কারণ অধিকাংশ শ্যানা পাঠকই সেটা আমার লেখকজীবনের প্রথম প্রভাতেই জেনে গিয়েছেন; নিতান্ত যারা জানেন না তাদের বলি লেখাপড়ায় আমি চিরকালই ছিলুম বিংশ শতাব্দীর এক নবকালিদাস যিনি মা সরস্বতীর কৃপালাভ কস্মিনকালেও কামনা করেননি এবং দেবীও অহেতুক তাঁকে দর্শন দেননি। সাদামাটা ভাষায় বলতে গেলে কেতাবপত্র দেখলেই আমার গায়ে জ্বর আসত, স্কুলবাড়িটা আমার কাছে শুশানমশানের লাগোয়া ওয়েটিংরুমের মতো মনে হত এবং কুয়েশচন পেপারের ওপর চোখ বুলুতে না বুলুতেই পরীক্ষার হলে কতবার যে ভিরমি গিয়েছি। সেটা আমাদের শহরের এমবুলেনস তাদের রেকর্ডরূপে সযত্নে লোহার সিন্দুকে পুরে রেখেছে। কিন্তু তৎসত্ত্বেও কী করে, কোন দুষ্টগ্রহের তাড়নায় যে আমি বন শহরে ডক্টরেট নেবার জন্য এসেছিলাম সেটা গোপন রাখতে চাই– পাঠক অযথা খোঁচাবেন না।
