এখানে আমি পড়েছি বিপদে। কার কাছে গণ্য হতেন? ধরে নিচ্ছি তালেবর মহিলাটি সযতে দুই প্রস্থ বন্ধুবান্ধব বেছে নিয়েছিলেন যাদের এক প্রস্থ অন্য প্রহকে চিনতেন না। দুই প্রস্থকে দুই নাগরের নাম দিতেন। কিংবা হয়তো স্যুকের চিন্তাধারা আদৌ সেদিকে যায়নি। তিনি বলতে চেয়েছেন, দুইজনাই ভাবতেন, বাচ্চাগুলো তারই। কিন্তু তবু শেষ প্রশ্ন থেকে যায়, বাচ্চাগুলো ভাবত কী? তারা ঠিক যে রকম জানে, একজোড়া জুতোতে দুটো জুতো থাকে ঠিক সেইরকম মেনে নিয়েছে একই বাড়িতে দুটো বাপ আনাগোনা করে! পাঠক জানেন, আমার কল্পনাশক্তি বড়ই অনুর্বরা। আপনারাই না হয় এ সমস্যাটি সমাধান করে নিলেন।
এবং সর্বশেষ জন বলেছেন, দু-দুজন নাগরের কাছ থেকে প্রেম, আত্মনিবেদন, প্রশস্তি-গীতি, আসঙ্গসুখ লাভ করে, সমাজের দু-দুটো হোমরাও সিং চোমরাও খানকে আস্ত দুটো বোকা ম্যাড়ার মতো আঙ্গিনার খুঁটিতে বেঁধে রেখে তিনি যে তার আত্মশ্লাঘা বাড়াতে চেয়েছিলেন তা নয়, তিনি সবকিছু করেছিলেন সুন্ধুমাত্র পৌন্ড শিলিং পেন্সের জন্য।
ফ্রান্সে তো এসব নিত্যদিনের ডাল-ভাত। রীতিমতো একটা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এ কথা ভুললে চলবে না, জনও আমাদের বলছেন, পৃথিবীর আর সর্বত্র যা ঘটে থাকে, বিলেতে তাই ঘটে, তবে, সায়েবরা এসব বাবদে উচ্চবাচ্য করেন না।
কিন্তু জন যে দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিলেত তথা তাবৎ কন্টিনেন্টের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করেন আপন মতামত প্রকাশ করেন, কিংবা যখন নীরব থাকেন, অথবা কোনও প্রকারের উপদেশ দেওয়া থেকে নিরস্ত থাকেন, সবক্ষেত্রেই তাঁর বৈশিষ্ট্য আছে। তারই একটা পরিস্থিতির উল্লেখ তিনি করেছেন বড় বে-আব্রু ভাষায়। আমি সেটা মামুলি ঢঙে পেশ করি। বলছেন, কোনও হাউস পার্টিতে (অর্থাৎ যেখানে উইক এন্ড কাটাতে হয়) যদি তুমি সুযোগ পেয়ে গৃহকত্রীর সঙ্গে কিংবা কোনও বন্ধুর স্ত্রীর সঙ্গে মাত্রাধিক প্রেম করে ফেল তবে সে-গেরো থেকে বেরিয়ে আসবার চেষ্টা কর– অবশ্য যতখানি পার ভদ্রতা বজায় রেখে। বলা বাহুল্য, অতিশয় চতুরতাসহ। কারণ কোনও মহিলারই হৃদয়ানুভূতিতে আঘাত হানা অনুচিত। কিন্তু হায়, ইহসংসারে সব গেরো তো আর এড়াতে পারা যায় না।
এস্থলে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, পরিস্থিতিটা জন-এর মনঃপূত নয়। কিন্তু তিনি তার দেশবাসীর তথা বিশ্বজনের মনোবৃত্তি ভালো করেই জানেন বলে লম্বা লেকচার ঝেড়ে সদুপদেশ দেননি। তার নীরবতা বহু ক্ষেত্রেই হিরন্ময়।
.
৩৬.
যুদ্ধ ব্যাপারটা কী তার সঙ্গে আমাদের সামান্য কিছু কিছু পরিচয় হচ্ছে। ভালোই। না হলে অবশ্য আরও ভালো হত। ভবিষ্যতে, কখনও, কস্মিনকালেও হবে না সে ভরসা যদি কার্তিকেয় দিতেন তবে হত সবচেয়ে ভালো। কিন্তু চতুর্দিকে যে হালচাল দেখছি তাতে তো মনে হয়, বর্তমান যুদ্ধটা ঝটপট শেষ হোক বা রয়ে-সয়েই শেষ হোক, এটাই শেষ যুদ্ধ নয়। আরেকটা মোক্ষমতর লাগবে। কবে লাগবে? সঠিক কেউ বলতে পারবেন না, তবে কোনও মস্তান যদি আমার কানের উপর পিস্তল বসিয়ে না বললে নিষ্কৃতি নেই রবে হুঙ্কার ছাড়ে তবে বলব, বছর পঁচিশেকের ভিতর। কেন, কাতে কাতে, এসব প্রশ্নের উত্তর কিন্তু দেব না। আমি শুধু ভবিষ্যদ্বাণীটি করে রাখলুম এবং আজ দিনের যেসব নাবালক নিতান্ত আর কিছু না পেয়ে আমার এ লেখাটি পড়েছে তারা যেন সেদিন আমাকে স্মরণে আনে অবশ্যই প্রাণভরে অভিসম্পাত দিতে দিতে। কারণ, ততদিনে। আমি ইহলোকের ডাঙাকে এক লাথি মেরে পরলোকের নৌকোয় বসে ভরা পাল তুলে বৈতরণীর হেপারে।
যুদ্ধ প্রতিষ্ঠানটি উত্তম একথা কোনও সুস্থ ব্যক্তি বলেছেন বলে শুনিনি, বরঞ্চ বহু বহু বিজয়ী বীর যুদ্ধের অজস্র নিন্দা করে গেছেন। তবে একটা বিষয়ে যুদ্ধের কি শত্ৰু কি মিত্র সকলেই অকুণ্ঠ প্রশংসা করে গেছেন। যুদ্ধের সময় অতি সাধারণ মানুষও প্রায়ই এমন সর্বোচ্চ পর্যায়ের স্বার্থত্যাগ, দেবদুলভ পরোপকার করে থাকে, পরের জন্য অশেষ ক্লেশ সহ্য করে মৃত্যু পর্যন্ত বরণ করে নেয় যে তার সামনে বহু রণের বিজয়ী বীর নেপোলিয়ন-সম্প্রদায় পর্যন্ত অবনত মস্তকে স্বীকার করেন যে, ওই সাধারণ জনের অসাধারণ কীর্তির কাছে তাদের লক্ষ রণজয় তুচ্ছ।
তারই একটা উদাহরণ লটে আমার সামনে পেশ করেছিল : তার উল্লেখ প্রকাশিত প্রবন্ধ বা পুস্তকে কোথাও আমি পাইনি, লটেও পায়নি।* কাহিনীটি পড়া সমাপ্ত করে পাঠক হয়তো কিছুটা নিরাশ হবেন। ইংরেজ এ স্থলেই বলে থাকে : নাথিং টু রাইট হোম অ্যাবাউট–চিঠি লিখে বাড়িতে জানাবার মতো এমন কিছু অসাধারণ ব্যাপার নয়। আমি কিন্তু তবু জানাচ্ছি, তার কারণ প্রথম দুশমন ইংরেজ যা করে না করে তার উল্টোটা করতে পারলে আমার জানটা বড় খুশ হয়। দ্বিতীয়ত ঘটনাটির নায়ক আমার পরিচিত। নাতিদীর্ঘ আট বছরের পরিচয় সেটা দীর্ঘতম হবার সুযোগ কেন পেল না সেইটেই আমি রাইটিং হোম অ্যাবাউট।
[*অসংখ্য রতনরাজি বিমল উজ্জ্বল
খনির তিমির গর্ভে রয়েছে গভীরে
বিজনে ফুটিয়া কত কুসুমের দল
বিফলে সৌরভ ডালে মধুর সমীরে।
গ্রে-র কবিতা থেকে এই অংশানুবাদ বছর চল্লিশ পূর্বে এতই মুখে মুখে প্রচারিত ছিল যে কেউ সেটা ছাপালে পাঠক সম্প্রদায় বিরক্তিভাবে অবজ্ঞাও প্রকাশ করত না। আজ সে যুগের পাঠক, বৃদ্ধরা পুরনো দিনের স্মরণে দু চোখের জল ফেলছেন, তরুণরা হয়তো পড়বেনই না– আদৌ মডার্ন নয়।]
