এইবারে আইস, নিন্ননাসিক পাঠক, অন্য একখানা অভিধানের শরণাপন্ন হই। যে কনসাইস অক্সফোর্ড ডিকশনারি নিয়ে এতক্ষণ নাড়াচাড়া করছিলুম, যার নাম শ্রবণেই শ্রীরাধার ন্যায় উন্নাসিকজনের কপোল ভাসিয়া যায় নয়নের জলে তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে; পক্ষান্তরে আমি যে অন্য কোষের শরণাপন্ন হচ্ছি সে কোষ প্রথম যে রূপ নিয়ে প্রকাশিত হয় সেটি ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে অর্থাৎ অক্সফোর্ডের প্রায় একশো বছর পূর্বে। তার অর্থ, গত একশো বছর ধরে এ অভিধানের ঐতিহ্য। একে সচরাচর ওয়েবস্টার বলা হয় এবং উপস্থিত Websters Seventh New Collegiate Dictionary নাম দিয়ে কলকাতায় রাস্তাঘাটে জলের দরে বিক্রি হচ্ছে আমার হিসাবে যার দাম হওয়া উচিত ৬০/৭০ টাকা, বিক্রি হচ্ছে সেটি দশ টাকায়– চেষ্টা-চরিত্র করলে পাবেন আট টাকায়। এ অভিধান অবহেলা করার মতো কেতাব নয়। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা বলেন, অভিধানের ইতিহাস লিখতে গিয়ে এ অভিধানের উল্লেখ না করলে সে বিবরণী অসম্পূর্ণ থেকে যায় এবং কনসাইস অক্সফোর্ড যে পাঁচখানি বেস মডার্ন ডিকশনারির কাছে ঋণ স্বীকার করেছেন তার মধ্যে ওয়েবস্টার রচিত কোষ অন্যতম। এইবারে দেখি ইনি কী বলেন। প্রথমেই দেখা যাচ্ছে, ইনি ঈষৎ ধর্মভীরু, কারণ লাভ শব্দের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, পিতার ন্যায় ঈশ্বর মানবসন্তানের জন্য যে মঙ্গল চিন্তা করেন (উদ্বেগ ধরেনও বলা যায়, কারণ ইংরেজিতে আছে ফাদারলি কনসার্ন)। অক্সফোর্ডে ভগবান নেই– না, না– আমি বলতে চাই, অক্সফোর্ড অভিধানে লাভ শব্দ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সংকলনকারী মানুষের প্রতি ঈশ্বরের, কিংবা ঈশ্বরের প্রতি মানুষের ভালোবাসার উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ করেননি কিংবা এই কুসংস্কারে বিশ্বাস করেননি। তা সে যাই হোক, সেই ধর্মভীরু, ওয়েবস্টার লাভ শব্দের নানা অর্থ দিতে গিয়ে (কেউ কেউ যে ঈশ্বরের প্রতিশব্দরূপে লাভ ব্যবহার করেন সেটাও বলেছেন) লিখছেন যৌন আলিঙ্গন এবং সেটা বোঝাতে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ক্যাপিটাল অক্ষরে লিখেছেন, COPULATION অর্থাৎ মৈথুন যৌন সঙ্গম এবং যে টু মেক লাভ নিয়ে গবেষণা আরম্ভ করেছিলুম তার বেলা ইংরেজের মতো বিস্তর ধানাই-পানাই না করে, আশকথা পাশকথা (বিট অ্যাবাউট দি বুশ) না ঝেড়ে, এর ঘাড়ে ওর কাঁধে আপন বোঝা না চাপিয়ে একদম এক ঘায়ে সোজাসুজি উত্তর দিচ্ছেন : টু এনগেজ ইন সেক্সায়েল ইন্টারকোর্স।
অবশ্য বলতে পারেন, ওয়েবস্টার অভিধান মূলত মার্কিন অভিধান। এর উত্তরে নিবেদন : (১) এ অভিধান আমেরিকায় প্রকাশিত হওয়ার অল্পদিনের মধ্যেই এর বিলিতি সংস্করণ প্রকাশিত হয় এবং এখনও যেসব ইংরেজ উন্নাসিকতা অপছন্দ করেন (আমি নেটিব ঘৃণা করি) তারা এ অভিধানই ব্যবহার করে থাকেন; (২) কনসাইজ অক্সফোর্ড বহুস্থলে বিশেষ বিশেষ ইংরেজি শব্দ মার্কিন মুল্লুকে যে অন্য অর্থে ব্যবহৃত হয় তার উল্লেখ করেন; এ স্থলেও করলে পারতেন; (৩) আমি ভূরি ভূরি ইংরেজ-লিখিত গল্প-উপন্যাসে এর ব্যবহার পেয়েছি। কিন্তু স্কু পাইনি, এবং ওয়েবস্টারেও শব্দটা নেই কারণ শব্দটা এখনও গ্রাম্য; (৪) এবং সর্বশেষ বক্তব্য, ওয়েবস্টার মার্কিন দেশগত বলে যদি তাকে অস্পৃশ্য বিবেচনা করতে হয় তবে এ অভিধানখানি এদেশের গুণীজনের আশীর্বাদ লাভ করল কী প্রকারে? কারণ গ্রন্থ পরিচিতিতে স্পষ্ট ছাপা আছে।
Published with the assistance of Joint Indian-American Text Book Programme
এ বিষয়ে এতখানি লেখবার কারণ কী? গত সপ্তাহে প্রতিজ্ঞা করেছিলুম, কচর কচর আর করব না, কিন্তু আমার কপাল মন্দ, তার দু-দিন পরেই এক সদ্য বিলেতফেরতা তরুণের সঙ্গে মোলাকাত। ছেলেটি ভালো, কিন্তু বিলিতি মোহ ঝেড়ে ফেলতে এখনও তার ঢের সময় লাগবে। তখন হঠাৎ আমাকে স্ট্রাইক করল, কে যেন বলেছিল, বিলিতি মবারি স্বরাজ লাভের পর আদৌ কমেনি, বরঞ্চ বেড়েছে। যেসব ছেলেছোকরারা আমার লেখা পড়ে আমাকে সম্মানিত করে অন্তত তারা যেন অক্সফোর্ড বলতে ভিরমি না যায়, রকবাজি গুলমারার সময় খোদার-খামোখা বিলিতি মবারির চিত্রিত গর্দভ না হয় তাই এতসব বলতে হল, অন্যান্য যথা বিদেশের বর্তমান অনুচ্ছেদ প্রধানত সেক্স নিয়ে সেগুলো পূর্বেই নিবেদন করেছি। অভিধান নিয়ে আলোচনা করে স্পষ্ট বোঝা গেল, ইংরেজ ভাজে ঝিঙে, বলে পটল।
ড্যুক অব বেডফোর্ড জন ভণ্ডামি সম্বন্ধে যা বলেছেন তার অনেকখানি সর্বদেশে সর্বকালেই থাকে তবে কোনও কোনও দেশে চক্ষুলজ্জাটার বাড়াবাড়ি কোনও কোনও দেশে কম। কোনও ফরাসি যখন সমাজের সম্মানিতা কোনও মহিলাকে প্রণয়িনীরূপে গ্রহণ করে তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে সেটা গোপন রাখার কোনও প্রয়োজন বোধ করে না, কিন্তু বিলেতে ঠিক তার উল্টো অর্থাৎ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বর্জনীয়। এবং অনেক ক্ষেত্রে ইংরেজ তার ভাব-ভালোবাসাটা এমনই নিরন্ধ্র গোপন রাখতে সক্ষম হয় যে মহিলাটিও তার ডবল সুযোগ নেবার পথটা নিজের থেকেই দেখতে পান। জন সাহেব একটি সত্য ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলছেন, একটি প্রখ্যতা মহিলা (এই গোপনীয়তার সুযোগ নিয়ে) সমাজের অতি উচ্চস্থানে প্রতিষ্ঠিত দু জন অভিজাত জনের সঙ্গে একই সময়ে প্রণয়লীলা চালালেন। কথায় বলে ডান হাতের কারবার বাঁ হাত জানে না– নটবরদ্বয়ের একজনও জানতেন না, মহিলাটি দু জনার এজমালি রক্ষিতা। মহিলাটি যেসব কেনাকাটা করতেন, তাঁর খরচাপাতি যা হত তার প্রত্যেকটি বিল তিনি দোকানির কাছ থেকে ডুপ্লিকেটে চেয়ে নিতেন এবং আমাদের চৌকস শেয়ালের একই কুমিরছানা দু-দুবার দেখাবার কায়দায় দুই মহাশয়ের সামনে পেশ করতেন। মাগ্যি-ভাড়ায় ছিমছাম যে বাড়িটিতে বাস করতেন তার ভাড়াও গুনতেন দুই হুজুরই। বলা বাহুল্য, হাফাহাফি নয়, পুরোপুরিই কারণ প্রেমের বখরাদার আছে সে তথ্যটি না জানলে ভাড়ার বখরাদার জুটবে কোত্থেকে? কিন্তু তাবৎ কেচ্ছার মধ্যে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ব্যাপার : বেশ অনেক বৎসর ধরে উভয়েই কাচ্চাবাচ্চাগুলোর জনকরূপে গণ্য হতেন।
