পাঠকদের মধ্যে যাদের বয়স কম তাদের মনে নিশ্চয়ই আরেকটা চিন্তার উদয় হবে : আজ ইউরোপে যা হচ্ছে কাল সেটা এদেশে দেখা দেবে না তো? এবং দিলে দু-দিনের মধ্যে যে তার ভেজাল রূপ দেখা দেবেই সে বিষয়ে আমি সুনিশ্চিত।
সবুরদার পাঠক! এ কচকচানিতে তুমি যদি কিঞ্চিৎ চঞ্চলিত হয়ে থাক, তবে আমি মাফ চাইছি। ভবিষ্যতে আর কখনও এমন গুনা করব না– এ-ওয়াদা করলে অধর্ম হবে, তবে চেষ্টা দেব, পরশুরামি ভাষায় তোমার মন যেন হিল্লোলিত হয় চিত্তে চুলবুল লাগে।
তার জন্য ওই জন সাহেবটির সরেস মন্তব্য যেন মন্তব্যমণ্ডলীর সায়েব।
পাঠক, ফরাসি দেশে তুমি যদি কোনও ফিলম-স্টার বা অভিনেত্রীর সঙ্গে প্রেম জমাতে পারো তবে আর পাঁচজনের চোখে ফুটে উঠবে সম; মুখে ফুটবে সপ্রশংস ও! লা লা! বুকে ফুটবে কাঁটাকিন্তু সেটি অতিশয় বেবি সাইজের, দুশ্চিন্তার কারণ নেই, কারণ ফরাসি জাতটা মোটেই হিংসুটে নয়। কিন্তু, জন্ বলছেন, এমন কম্মটি লন্ডনে করতে যেয়ো না। এতে করে তোমার খ্যাতি-প্রতিপত্তি বাড়বে তো না-ই বরঞ্চ তোমার পক্ষে রীতিমতো খতরনা হতে পারে বিশেষ করে তুমি যদি এ লাইনে এমেচার হও। এমনকি মেয়ে আর্টিস্টের প্যার পেলেও ওই একই হাল। আর্টের সঙ্গে প্রেমে মোটেই ম্যাচ করে না। ও দুটোর মধ্যে কোনও সম্পর্কই নেই। ফরাসিরা অবশ্য প্রেমটাকে আর্টের উচ্চাসনে বসায় (গুরুচণ্ডালী!–বলব আমরা) এবং ওটাকে একটা অত্যন্ত প্রকৃষ্ট আপন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আর্ট বলে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু আমরা ইংরেজ জাতি স্পোর্টসের নেশন; এ দেশে প্রেম এক বিশেষ ধরনের ডনকসরত (জিমনাস্টিক) বলে স্বীকৃত হয়।
.
৩৫.
স্বখাত সলিলে আমি ডুবিনি, তোমাকে ডোবাইনি। পাঠক নিশ্চিন্ত থাকতে পার। আর ডুবলেই-বা কী? কবিগুরু বাউলের গীত উদ্ধৃত করে বলেছেন, যে জন ডুবল, সখী, তার কী আছে বাকি গো অবশ্য পাতকোতে নয়, রসের সাগরে অমিয় সায়রে। কিন্তু আশ্চর্য, ইংরেজের আপন দেশে চতুর্দিকে গভীর জলের সন্দ্র থাকা সত্ত্বেও সে ভোবাডুবির প্রস্তাব বড় একটা পাড়ে না। তাই ডুক জন সেটা লক্ষ করে বলেছেন, অন্য দেশের লোক প্রেমকে আর্টের পর্যায়ে ফেলুক (কিংবা ঈশ্বরোপলব্ধির প্রথম সোপান বলে গণনা করুক– লেখক), ইংরেজের কাছে প্রেম এক প্রকারের জিমনাস্টিক। কৌতূহলী মন জানতে চাইল, সেটা কোন প্রকারের জিমনাস্টিক? তখন, ও হরি, আবিষ্কার করলুম ইংরেজের আরেকপ্রস্ত ভণ্ডামি। মার্কিন জাতের পুণ্যভূমি যে রকম প্যারিস, বিলেতের ভণ্ড এবং স্নব– দু জনার মধ্যে খুব যে একটা ফারাক আছে তা নয়– দু জনারই মোক্ষক্ষেত্র অক্সফোর্ড। সেই অক্সফোর্ডে আছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়। ইংরেজ মোকা-বে-মোকায় হামেশাই কভু-বা কনে বউয়ের মতো ফিসফিসিয়ে কভু-বা বাঘা জমিদারের মতো গলা ফাটিয়ে মহারানির যে রাজত্বে সূর্য কখনও অস্তমিত হন না সে রাজত্বের এবং তারই কাছেপিঠে উপীনদের যে দু বিঘে জমি আছে সেসব জায়গাকেও জানিয়ে দেয় অক্সফোর্ডের মতো বিদ্যায়তন ত্রিসংসারে আর কোথাও নেই, এবং এসব ব্যাপারে ইংরেজের ন্যাজ মার্কিন মুব সাধারণ সর্বাঙ্গ ঘন ঘন আন্দোলিত করে সম্মতিসূচক মুদ্রা মারে। সেই বিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয় একখানা রাজভাষার অভিধান।* অভিধানটি উত্তম, কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু সবারিতে ভর্তি। সেই কোষ খুলে দেখতে গেলুম, টু মেক লাভ বলতে কী বোঝায়? প্রেমে পড়া সে তো খুব সম্ভব বিলেতে টু ফল ইন লাভ থেকে কবে, কোনকালে পালতোলা জাহাজে করে সরাসরি এদেশে চলে এসেছে। দেখি টু পে অ্যামরাস অ্যাটেনশনস্ টু–। তবেই তো ফেলল মুশকিলে। ইংরেজ কী ধুরন্ধর জাত। যেখানে টাকাকড়ির ব্যাপার নয় সেখানে চট করে ঋণ স্বীকার করতে ভারি চটপটে। তদুপরি দায়টা ফরাসির ঘাড়ে ফেলে দিয়ে নিজে চটসে সরে পড়ল– প্রেমট্রেম তো বাধা, জানে ওরাই। কথাটা এসেছে ফরাসি ভাষা থেকে; আমূর শব্দের অর্থ প্রেম (মূলত অবশ্য এসেছে লাতিন আমরসুস্ থেকে। কিন্তু ফরাসিরা আমূর বলতে প্রেম, কাম সবই বোঝে। ওদিকে ইংরেজ অ্যামরাস বলতে বোঝে নিছক প্রেম– সে প্রায় আমাদের রজকিনী প্রেম নিকষিত হেম/ কামগন্ধ নাহি তায়… তা হলে আমাদের মহাখানদানি অক্সফোর্ড অভিধানের মতানুযায়ী টু মেক লাভ কথাটার অর্থ বল্লভার প্রতি সপ্রেম মনোযোগ দেওয়া, তাঁর যত্ন আত্যিকর। এস্থলে বলে রাখা ভালো লাভ শব্দে সে জাতীয় কোনও প্রকারের ভেজাল নেই এ কথাটা পষ্টাপষ্টি বলবার মতো দুঃসাহস অক্সফোর্ডের নেই। তাই অতি অনিচ্ছায় (আমার মনে হয়) স্বীকার করেছেন, সেকসুয়াল অ্যাফেকশন, ডিজায়ার ইত্যাদি। পুনরপি বলেছেন, রিলেশন বিটউইন সুইট হার্টস- এবারে পাঠক নিশ্চয়ই ঠাহর করে নিয়েছ শ্রাদ্ধটা কোন দিকে গড়াচ্ছে সুইট হার্টস– একে অন্যের প্রতি অনুরক্ত জনের সম্পর্ক তো হাজারো রকমের হতে পারে। এখানে যদি অক্সফোর্ড সত্যের খাতিরে সাতিশয় কায়ক্লেশে লিখতেন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক তা হলেই তো ল্যাঠা চুকে যেত।
[*ইংরেজ জাতটার প্রাণপুরুষ যে বেনে সেটা বোঝাবার জন্য বহু জ্ঞানী বহুতর যুক্তিতর্ক উদাহরণ-হদিশ পেশ করেন। সেগুলো নিতান্তই কাঁচা পড়ুয়ার সেই যুক্তির মতো ডাস্টবিন মার্কা : গুরুমশাই, আমি ঘুমুচ্ছিলুম, কে যেন আমার হাত দিয়ে তামাক খেয়ে গেছে। আসল মোক্ষম যুক্তি, কামারের এক ঘা-র মতে, এই বিপুল বসুন্ধরায় লক্ষ্মী এবং সরস্বতাঁকে একই গোয়ালে নাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছে কে কোথায়? ইংরেজ– অক্সফোর্ডে। পেত্যয় না হয় তো যান সেই বিগ্রহ-পাণ্ডার যুগল-মিলন দেখতে সেখানে। এই বিদ্যায়তন এন্তেক কেতাবাদি ছাপে, প্রকাশ করে। এবং সবচেয়ে বড় কথা লাভ করে। কন্টিনেন্ট বা ভারতের বিদ্যায়তনদের লাভ করা মাথায় থাকুন গচ্চা দিতে দিতে কণ্ঠশ্বাস। অর্থশাস্ত্রের মহাজনরা বলেন, ১৯৩০-৩২ যখন বিশ্বময় ব্যবসা-বাণিজ্য জীবনূত তখন যে প্রতিষ্ঠান রেকর্ড মুনাফা করেন তিনি অক্সফোর্ড। অম্মদেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইস্টমন্ত্র Advancement of Learning এই কারসিকতা শুনে এক ইংরেজ বলেছিল, সে কী! একশো বছর হয়ে গেল, তোমরা এখনও ফালতো L অক্ষরটি ঝেড়ে ফেলে দিয়ে আমাদের মতো Advancement of Earning করতে পারোনি!]
