[*এদেশেও বলে, শীত কাটাতে হলে হয় দুই, নয় রুই (তুলার লেপ)। ইংলন্ডের কাঠফাটা শীতে তুলোতে কিছু হয় না বলে হট-ওয়াটার-বটকে সে শয্যাসঙ্গিনী করে। ইংরেজের চাচাতো ভাই ডাচদের সম্বন্ধে বলা হয় যদিও বিলেতের মতো ও দেশেও যৌন-জীবন নেই– এ কথা কেউ কখনও বলেনি অন্য দেশের পুরুষ যৌবনে বিয়ে করে, হল্যান্ডের লোক পাশবালিশ কেনে, এটা চালু হয় ডাচদের কিপটেমি বোঝাবার জন্যে।]
এসব বিষয়ে অধুনা এক অতিশয় খানদানি ডিউক একখানি প্রামাণিক পুস্তিকা রচনা করেছেন। এ পুস্তিকা রচনা করার হক্ক তাঁর ন-সিকে, রাস শরণার্থী সহায়তা কি লিয়ে পাঁচ নয়ে পয়সে। বললুম বটে কিন্তু বক্ষ্যমাণ জান (কোম্পানি আমলের বানান) সায়েব যখন রাজসিক চাকচিক্যময় ডিউকত্ব লাভ করলেন তখন সঙ্গে সঙ্গে লাভ করলেন মহারানির রাজত্ব বাঁচাবার জন্য, সহায়তা কি লিয়ে চার মিলিয়ন পৌভের চেয়েও বেশি মৃত্যু-কর, বা ডেথ ডিউটি। ফরেন এক্সচেনজ নিয়ে কালোবাজার করার মতো কিস্মাৎ কপালে লেখা ছিল না বলে সেই পাঁচ পয়সী ডাকঘর যিনি নিরিখ বেঁধে মৃন্ময় টাকাকে হিরন্ময় পৌন্ডে পরিণত করেন সে আর্যা নির্দেশ দিয়ে বলে মোটামুটি ১০০,০০০,০০০ (দশ কোটি) টাকা–যদি খেসারতি চার মিলিয়নের উপরে ধরা হয়; নইলে কত আর?– এই ধরুন কোটি সাত-আষ্টেক।
এ ভদ্রলোক বলছেন, যৌনসম্পর্ক ব্যাপারটা নিছক কন্টিনেন্টের একচেটে আবিষ্কার নয়। কন্টিনেন্টের বাসিন্দারা তাঁদের কমন মার্কেটে আমাদের পাত পাড়তে না দিয়ে সে সুখ থেকে আমাদের বঞ্চিত করতে পারেন কিন্তু প্রেম করার সুখ থেকে বঞ্চিত করতে পারবেন না। তফাৎটা তবে কোথায়? ওনারা তাদের যৌনজীবন নিয়ে বিস্তর ঢাকঢোল বাজিয়ে বেহদ্দ চেল্লাচেল্লি করেন, এন্তের বড়ফাট্টাই মারেন, ওই নিয়ে অষ্টপ্রহর ভ্যাচর ভ্যাচর করেন। আমরা করিনে। আমাদের বিবেচনা-বোধ আছে, আমরা পিছিয়ে থাকতে ভালোবাসি। এর থেকে কি স্পষ্টই ধরা পড়ে না যে, নিজেদের ওপর ওদের প্রত্যয় নেই, আমরা ওদের চেয়ে সরেস? (ডুক বোধহয় বলতে চেয়েছেন, ইংরেজ জাতটা নীরব কর্মী! –লেখক) আর এইটেই হল সব কথার নির্যাস। পৃথিবীর আর সর্বত্র যা ঘটে থাকে এ দেশেও তাই ঘটে। শুধু আমরা আমাদের যৌনজীবন নিয়ে বড় একটা কথা বলিনে। হয়তো-বা প্রকৃতিদেবীই এই প্রবৃত্তিটি দিয়ে আমাদের গড়েছেন। পুরুষানুক্রমে হয়তোবা আমরা নীতিবাগীশ– ওইটে পেয়েছি উত্তরাধিকারে। কিংবা হয়তো এ-ও হতে পারে যে, এ খেলাটার আইনকানুন আমাদের দেশে অন্য এক ভিন্নভাবে গড়ে উঠেছে; আর সবাই জানে স্পোর্টসের আইনকানুন মেনে চলাতে আমরা পয়লা নম্বরি এবং তার চেয়েও ঢের ঢের বেশি কেরানি আছে আমাদের ভণ্ডামিতে।
এই এতক্ষণে আমাদের মাই লর্ড ডিউকপ্রবর হাটের মধ্যিখানে হাঁড়িটি ফাটালেন– ইংরেজিতে বলা হয় কার্পেটের হ্যান্ডব্যাগ থেকে লুকননা বেড়ালটা বের হবার মোকা পেয়ে এক লক্ষে কেলেঙ্কারিটা ফাস করে দিল। কিন্তু এস্থলে শ্রীযুক্ত জন-এর প্রতি সুবিচারের খাতিরে অবশ্যই বলতে হয়, তিনি সজ্জন এবং সঙ্গে সঙ্গে এককাড়া দুষ্টুবুদ্ধিও ধরেন। ইংরেজের নষ্টামি ভণ্ডামি চিচিং ফাঁক করে দিতে পারলে তিনি সর্বদাই নির্বিষ বিমলানন্দ উপভোগ করেন। তার একটা কারণ হয়তো এই যে, সাতপুরুষের (আসলে ইনি গোষ্ঠীর এয়োদশ পুরুষ) ভিটের উপর খাড়া প্রাচীন কালটি বাঁচাতে হলে তাকে সরকারের প্রাপ্য অষ্ট কোটি টাকার ট্যাক্সটি দিতে হয় রোক্কা নন্দানন্দি, এবং সে রেস্তটা কাছারিবাড়ির হেঁদো তহবিলে বাড়ন্ত। তাই বহু পূর্বেই নিবেদন করেছি, এস্থলে আমাদের উল্টো উপীন যেন তেন প্রকারেণ কাসূলটি খুলে দিলেন পাবলিকের তরে। ফ্যালো দর্শনীর কড়ি মাখো ত্যাল। বলে কী! বিলেতের খানদানি পরিবারের কেউ কস্মিনকালেও এ হেন অনাছিষ্টি কম্বো করেননি। নবাব সায়েরা যে কী পরিমাণ চটেছিলেন তার জরিপ এ স্থলে অবান্তর। বরঞ্চ জন মিঞার দাদ নেবার কায়দাটি বড়ই মুখরোচক– তিনি ওনাদের যাবতীয় ধূর্তামি নষ্টামি বের করে দিলেন দু-খানি বইয়ে– এবং ইহসংসারে ভিলেজ ইডিয়টটা পর্যন্ত বিলক্ষণ অবগত আছে ভণ্ডামির গণ্ডা গণ্ডা ভাণ্ড চিরকালই যৌবনরসে টৈটম্বুর।
এই বৃদ্ধ বয়সে আমি যে ইউরোপের কাম-কাণ্ড নিয়ে অল্পবিস্তর গবেষণা করছি তার জন্য কোনও প্রকারের কৈফিয়ত দেবার বা সাফাই গাইবার প্রয়োজন আমার পাপ-বিবেক রত্তিভর অনুভব করছে না। আমার অকরুণতম পাঠক এমনকি এদানির যেসব রুচিবাগীশ মার্কামারা পদি পিসির পাল এসব ঢলাঢলি না করে খট্টাঙ্গপুরাণ বা এরশুমৌলার নবনির্ঘন্ট নির্মাণ করতে মাণ্ডামাস ঝাড়েন তাঁদের স্মরণে আনছি যে, ঝাড়া বিয়াল্লিশ বছর ধরে আমি ভারত-ইউরোপ-আফ্রিকায় মাকু মারছি, ক্রনিক মেলিগনেন্ট বেকারি ব্যামো থেকে ভুগছি বলে গত বাইশ বছর ধরে মাঝেসাঝে সেই মাকু মারার বয়ান লিখে পথ্যির হাঁড়ি চড়িয়েছি, তার পূর্বেকার অর্থাৎ ভ্রমণারম্ভের প্রথম কুড়ি বছরের কাহিনী কাবলিওয়ালার বোয়াল মাছের মতো চোখ-রাঙানি সত্ত্বেও মা সরস্বতীর কাছ থেকে ভিক্ষে চাইনি। সেসব কথা এখন থাক। আমি শুধু শুধোচ্ছি, অর্ধসিদ্ধ অর্ধপ যা-সব লিখেছি তাতে কি পাঠকের মনে কখনও সন্দেহ জেগেছে যে, আমি যৌন কেচ্ছার সন্ধান পাওয়ামাত্রই তার পিঠের উপর ডাকটিকিটের মতো সেঁটে গিয়েছি? বরঞ্চ বলব ও বাবদে আমার উৎসাহ ছিল অত্যল্প। তার প্রধান কারণ, আমার ধারণা জন্মেছিল, যদিও ইউরোপের যৌনজীবন, প্রেমের ছড়াছড়ি প্রাচ্যভূমির তুলনায় অনেকখানি বে-আবরু তবু তাদের ঐতিহ্য বৈদগ্ধ্যের সঙ্গে তাদের আচরণের খতেন মেলালে সামঞ্জস্যটাই চোখে পড়ে বেশি। (বরঞ্চ মাঝে মাঝে মনে হয়েছে, কামসূত্র, কুট্টনীমতম, চৌরপঞ্চাশিকা, এমনকি অর্বাচীনকালে বিদ্যাসুন্দর লেখার পর আমরা কেমন যেন ঈষৎ বেরসিক হয়ে গিয়েছি। সেকথা থাক।) মাত্র দশ বছর পূর্বেই ইউরোপে যে বাড়াবাড়ি দেখেছি তাতেও মনে হয়নি যে, ওই নিয়ে কাউকে অত্যধিক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতে হবে। তবে খুব সম্ভব দু-এক জায়গায় আধা-সাদা অপ্রসন্নতা প্রকাশ করেছি। এবারে যা দেখলুম, শুনলুম, পড়লুম, বিশেষ করে লটে যেসব কথা বলল তার থেকে মনে প্রশ্ন জাগল, প্রতীচ্যের বহু দেশে অত্যধিক মদ্যপান যেমন এই শতাব্দীর গোড়ার থেকে একটা কঠিন সমস্যায় দাঁড়িয়েছে, ঠিক তেমনি এদের যৌন আচরণ যে-স্রোতে গা ঢেলে দিয়েছে, যে গতিতে এগিয়ে চলেছে, বিশেষ করে স্কুলের পনেরো-ষোল-সতেরো বছরের ছেলেমেয়েদের ওপর এটা যেভাবে প্রভাব বিস্তার করছে তার পরিণতি কোথায়? ব্যক্তিগতভাবে আমার মাত্র একটি বিষয়ে কৌতূহল আছে : ব্রহ্মচর্য, সেক্স স্টার্ভেশন কি মহত্তর কর্মে সাহায্য দেয়, উচ্চতর আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে? দু-হাজার বছর ধরে ক্যাথলিক পাদ্রিরা ব্রহ্মচারী জীবনযাপন করার পর আজ বহুতর ব্রহ্মচারী এবং গৃহীর মনে ওই নিয়ে সন্দেহ জেগেছে বৌদ্ধদের ভিতর এ সমস্যা নিয়ে কোনও আলোচনা এখনও আমার কানে এসে পৌঁছয়নি।…
