না। পলিটিক্যাল পার্টি নাকি?
না। তাই এখনও নিজেদের গ্রুপ বলে। এই তো তোমাদের এলেম। কথায় কথায় তুমি যে আমাকে মার্কিনি মার্কিনি খেতাবটা দাও, যে আমি মার্কিন বেড়ালের জর্মন ন্যাজ, তুমি বরঞ্চ মার্কিন রিপ ভান উইনকে হার মানাতে পার। সে ঘুমিয়েছিল কুল্লে কুড়িটা বছর, তুমি ঝাড়া চল্লিশটি বছর। এরকম–।
আহা! চল্লিশটি বছরে আমার কোনও অভিজ্ঞতা হয়নি, আর পাঁচটা দেশের তুলনায় জর্মনি যে অনেকখানি বদলে গেছে তার কোনও খবর রাখিনে– এই তো?
উ—
সে-ই তো ভালো। তাই তোমাকে দেখামাত্রই চিনে ফেললুম,
তোর পানে চেয়ে চেয়ে
হৃদয় উঠিল গেয়ে,
চিনি, চিনি, সখী।
কত প্রাতে জানায়েছে
চিরপরিচিত তোর হাসি,
আমি ভালোবাসি।
এইবারে বল, চল্লিশ বছরে আর পাঁচজন যেরকম বদলে গেছে আমার বেলা তাই হলে কি ভালো হত।
খুশি মুখে লটে বললে, শুনতে মন্দ লাগছে না। কিন্তু এই ভালোবাসার ব্যাপারেই যে তুমি কী দারুণ অগা সেটা আমি তোমাকে না শুধিয়ে বুঝতে পেরেছি। এবং যৌন সম্পর্ক ব্যাপারে আজ জর্মনি কোন জায়গায় এসে পৌচেছে তার কোনও খবরই রাখ না। আচ্ছা বল তো, তোমার কি মনে হয়, এদেশের স্কুলের ছেলেমেয়েদের শতকরা ক জনের স্কুলে থাকতে। থাকতেই যৌন অভিজ্ঞতা হয়ে যায়।
কী করে বলব, বল। খুবই অল্পই। ধর্তব্যের মধ্যে নয় নিশ্চয়ই।
খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে লটে বললে, তা হলে শোন, এবং ভিরমি খেয়ো না। ষোল-সতেরো বছর বয়স হতে না হতেই শতকরা পঁয়ত্রিশটি ছেলের ত্রিশটি মেয়ের পরিপূর্ণ যৌন অভিজ্ঞতা হয়ে যায়। পনেরো বছর বয়সেই যথাক্রমে শতকরা চৌদ্দ পনেরো ও দশ। এবং চৌদ্দ বছর বয়সেই একশোটার ভিতর জনা পাঁচেক!
আমি স্তম্ভিত হয়ে শুধোলুম, এসব কি সত্যি? আর তুমি জানলেই-বা কী করে?
জানতে হয় তাই জেনেছি। আমি যে একটা স্কুলে আমার বান্ধবীর হয়ে মাঝে মাঝে পড়াতে যাই। হালেরই তো একখানা প্রামাণিক বই বেরিয়েছে। আমি তোমাকে শুধোচ্ছিলুম, তোমাদের দেশে পরিস্থিতিটা কী রকম, তার খবর নিয়ে তুলনা করে দেখতে। জানো, আমার নিজের বিশ্বাস যে দেশের লোক অল্প বয়সেই যৌন অভিজ্ঞতা পেয়ে যায় তারা উন্নতিশীল প্রোগ্রেসিভ হয় না। এসব কথা এখন থাক। তোমাকে সেই স্ট্যাটিসটিকস্ ভর্তি বইখানা দেব। তুমি সেটা পড়ে নিলে আলোচনার সুবিধে হবে। কিন্তু হাতের কাছে ভিরমি ভাঙবার জন্য স্পেলিং সলটস্ রেখ।… এই দেখ, আমরা জর্মন রাইষের প্রেসিডেন্টের বাড়ির কাছে এসে গিয়েছি।
.
৩৪.
এদেশে, এদেশে কেন পৃথিবীর সর্বত্রই এ যুগে স্ত্রী-পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে এত বেশি আলোচনা, নাটক, ফিল্ম, সাহিত্য, সঙ্গীত তৈরি হচ্ছে যে, আমরা এই হট্টগোলের মাঝখানে প্রায়ই ভুলে যাই যে, এই ভারতেই রতি বা কাম সম্বন্ধীয় প্রথম পুস্তক রচিত হয়। এই সর্বপ্রথম পুস্তক বহু যুগ ধরে সম্মানিত হয়েছে নিশ্চয়ই, কিন্তু এ যুগে পৃথিবীর সর্বত্র এ বই এমনই সিংহাসনে আসন পাচ্ছে, শুধু তাই নয়, এমনই জনপ্রিয় হয়েছে যে, একে এখন অক্লেশেই ওরো-আমেরিকার অন্যতম বেস্ট-সেলার বলা যেতে পারে। ঠিক মনে পড়ছে না, কোথায় যেন পড়েছি, এক নাতিবৃদ্ধ জ্যাঠামশাইকে তার ভাইঝি একখানা অতি মনোরম দ্য-লুকস বই উপহার দেয় তার জন্মদিনে। এই ভদ্রজন পুস্তক সঞ্চয়নে অতিশয় অনুরক্ত ছিলেন এবং এরকম মরক্কো চামড়ার বাধাই সোনালি, চারুকার্যে ঝলমলিয়া কেতাব যে তিনি একটু মনোযোগ সহকারে দেখবেন, মেয়েটি সে আশা নিশ্চয়ই করেছিল! জ্যাঠামশাই সেরকম কিছু করলেন না বটে, কিন্তু দেখা গেল, তিনি অতিশয় সযত্নে তার আপন ডেসকে আর পাঁচটা দামি জিনিসের সঙ্গে সেটি তালাবদ্ধ করলেন। তার পর বহু বৎসর কেটে গেল, সামান্য এই ঘটনাটি কে-ই বা মনে রাখে। তার মৃত্যুর পর (যতদূর মনে পড়ছে তার অন্য এক ভাইঝি) তাঁর ঘরদোর গোছগাছ করতে গিয়ে ডেসকের ভিতর আবিষ্কার করল সেই প্রাচীন দিনের বইখানি। ততদিনে ইউরোপ নানা বিষয়ে মুক্তমনা হয়ে গিয়েছে কিন্তু ভাইঝি বইখানা দেখে স্তম্ভিত। সেই সে আমলে কোনও ভদ্র পরিবারের মেয়ে তাঁর শান্তশিষ্ট বয়স্ক জ্যাঠামশাইকে কামসূত্র উপহার দেবে, এ তো একেবারেই অবিশ্বাস্য। আসলে মেয়েটি দোকানে গিয়ে নিশ্চয়ই চেয়েছিল, কোনও একখানা বেস্ট-সেলার এবং তার চেয়েও বড় কথা, সেটার বাঁধাই যেন অসাধারণ চাকচিক্য ধরে। জ্যাঠামশাই সব জাতের বইয়ের খবর রাখতেন। রঙিন মোড়ক খুলে এক নজর তাকাতেই বুঝে ফেলেছিলেন, ব্যাপারটা কী, কিন্তু মেয়েটি যাতে লজ্জা না পায় তাই তিনি ওই পন্থা অবলম্বন করেন।
এর থেকেই পাঠক অনায়াসে বুঝে যাবেন যে, ঘটনাটি ঘটেছিল মান্ধাতার আমলে; নিদেন মহারানি ভিক্টোরিয়ার সুবর্ণযুগে এবং খুব সম্ভব তাঁর পূতপবিত্র আপন দেশে। কারণ বহু বহু কন্টিনেন্টাল গুণীজ্ঞানীর দৃঢ় প্রত্যয়, কুল্লে ইউরোপের একমাত্র বিলেত দেশেই যৌনজীবন নামক কোনও প্রতিষ্ঠান নেই, কস্মিনকালেও ছিল না– অন্তত ফরাসিদের গলা কেটে ফেললেও তারা এ বিশ্বাস কিছুতেই ত্যাগ করবে না। অবশ্য দেশকালপাত্র হিসেবে নিয়ে ইংরেজ জীবনযাপন পদ্ধতি সম্বন্ধে সে তার মতবাদের অতি সামান্য কিছুটা অতি অবরে-সবরে সামান্য রদবদল করতে পারে। যেমন, একদা ইংরেজ সম্বন্ধে ফরাসিদের মধ্যে সুপ্রচলিত প্রবাদ ছিল, কন্টিনেন্টের আর-সর্বত্র নরনারীর মধ্যে যৌনসম্পর্ক থাকে, ইংরেজের থাকে, গরম জলের বোতল।* কিন্তু ইতোমধ্যে এই পৃথিবীতে, তার সর্বোত্তম গৌরবময় যুগে, মানুষ কলকজা যন্ত্রপাতি, এক কথায় টেকনিকাল সর্ববাবদে এমনই উন্নতি করেছে যে, এস্তেক ফরাসিও সেটাকে এড়িয়ে যেতে পারে না। বংশবৃদ্ধি বংশ-নিরোধ আরও মেলা আশকথা পাশকথা তার কানে এসেছে। তাই বিস্তর ঘাড় চুলকে অনেক ভেবেচিন্তে তার পূর্বেকার প্রবাদটি বছর দশেক পরে পরিবর্তিত করে সর্বাধুনিক পরিমার্জিত সংস্করণ ছাড়ল, এখন তারা ইলেকট্রিক কারেন্টে গরম করা লেপ ব্যবহার করে।
