আমরা যদি ছোট ছোট কর্মঠ সাহিত্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারি, তবে শেষ পর্যন্ত আমাদের কর্মতৎপরতা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেই। আজ যে বাংলা সাহিত্যের প্রতি আমাদের দরদের অভাব তার প্রধান কারণ আমরা সাহিত্যের সত্যকার চর্চা করিনে।
তার অন্যতম জাজ্বল্যমান উদাহরণ দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও আমরা বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের জন্য কিছু করে উঠতে পারিনি অথচ সেখানে রুশ ভাষা শেখাবার ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছে।
***
দিল্লিতে ব্যাঙের ছাতার মতো একটি জিনিস বড় বেশি গজাচ্ছে। এরা হচ্ছেন আর্ট ক্রিটিক সম্প্রদায়। এরা ছবি বোঝেন, মেনুহিন শোনেন, আবার আলাউদ্দিন সায়েবকেও হাততালি দেন, এঁরা ভরতনাট্যম আর মণিপুরি নিয়ে কাগজে কপচান, চীনা সেরামিক এবং দক্ষিণ ভারতের ব্রোঞ্জ সম্বন্ধে এঁদের জ্ঞানের অন্ত নেই।
এদের একজন তো সবজান্তা হিসেবে এক বিশেষ গণ্ডিতে রাজপুত্রের আদর পান, বিলক্ষণ দু পয়সা তার আয়ও হয়। তা হোক, আমার তাতে কণামাত্র আপত্তি নেই– পারলে আমিও ওঁর ব্যবসা ধরতুম।
কিন্তু আমার দুঃখ ভদ্রলোকটি বড়ই বাংলা এবং বাঙালি-বিদ্বেষী। অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ, নন্দলাল, এবং তাঁদের শিষ্য-উপশিষ্যেরা যে বেঙ্গল স্কুল গড়ে তুলেছেন, সেটাকে মোকা পেলেই এবং মাঝে মাঝে না পেলেও বেশ কড়া কড়া কথা শুনিয়ে দেন। তাঁর মতে যামিনী রায়, যামিনী রায় এবং আবার যামিনী রায়। বাংলা দেশের আর সব মাল বরবাদ, রদ্দি। নিতান্ত প্রাদেশিক বদনাম থেকে নিজেকে বাঁচাবার জন্য।
ইনি যেসব আর্ট-সমালোচনা প্রকাশ করেন, তার সুস্পষ্ট প্রতিবাদ হওয়া উচিত। যারা এসব জিনিসের সত্য সমঝদার, তাদের উচিত বেরিয়ে এসে আপন দেশের সুসন্তানদের কীর্তি বারবার স্বীকার করা। ডেকাডেন্স বা গোল্লায় যাওয়ার অন্যতম লক্ষণ আপন দেশের মহাজনগণকে অস্বীকার করা বা খেলো করে দেখানো।
এ জাতীয় লেখাকে পোলেমিক বলে–বাংলায় মসীযুদ্ধ বলতে পারি। এবং মসীযুদ্ধে বাঙালির পর্বতপ্রমাণ ঐতিহ্য সম্পদ আছে। ভারতচন্দ্র পদ্যময় পোলেমিক, আর বাংলা গদ্য তো আরম্ভ হল খাঁটি মসীযুদ্ধ দিয়ে। রামমোহন তো কলমের লড়াই লড়লেন হিন্দু মুসলমান খ্রিস্টান সর্বসম্প্রদায়ের গোড়াদের সঙ্গে। তার পরের বাঘ বিদ্যেসাগর। তিনি যে পোলেমিক লিখেছেন, সে লেখা লিখতে পারলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আইনজীবী নিজেকে ধন্য মনে করবেন– অধমের মতে পোলেমিকে বিদ্যেসাগর মশাই মিলটনেরও বাড়া। আর মসীযুদ্ধে ব্যঙ্গ কী করে প্রয়োগ করতে হয় তার উদাহরণ তো আপনারা একটু আগে অর্ধচন্দ্র দানে স্পষ্ট দেখতে পেলেন। তার পর তিন নম্বরের মল্লবীর বঙ্কিম। তিনি হেস্টি সাহেবের (নাম ঠিক মনে নেই) বিরুদ্ধে সনাতন হিন্দুধর্মের হয়ে যে লড়াই লড়লেন সে তো অতুলনীয়। বরঞ্চ বলব, কৃষ্ণ চরিত্রের চেয়েও বড় ক্যানভাসে কাজ করেছেন। বঙ্কিম এ মসীযুদ্ধে, এবং এ সত্যও আজ অস্বীকার করব যে, আজ যদি কোনও হেস্টি পুনরায় দেখা দেয় তবে তার সঙ্গে ওরকম পাণ্ডিত্য আর ইংরেজি জ্ঞান নিয়ে (এখানে সাহিত্যিক বঙ্কিমের কথা হচ্ছে না– সে সাহিত্যিক যে নেই যে কথা স্কুলের ছোঁড়ারা পর্যন্ত জানে) লড়নেওলা আজ বাংলা দেশে নেই।
তার পর রবীন্দ্রনাথ; তিনিও তো কিছু কম লড়েননি। তবে তার রুচিবোধ বিংশ শতাব্দীর ছিল বলে তাঁর লেখাতে ঝাঁঝ কম, কিন্তু ইংরেজের বিরুদ্ধে লেখা চিঠিতে কী তিক্ততা, কী ঘেন্না!
গল্প শুনেছি উর্দুর কবিসম্রাট গালিব সাহেব তার প্রতিদ্বন্দ্বী জওহ্ সাহেবের একটি দোহা এক মুশাইরায় (কবি-সঙ্গমে) শুনে বারবার জওকে তসলিম করে বলেছিলেন, আপনি দয়া করে আপনার ওই দুটি ছত্র আমায় দিয়ে দিন, আর তার বদলে আমি আমার সম্পূর্ণ কাব্য আপনাকে দিয়ে দিচ্ছি।
রবীন্দ্রনাথের ওই শেষ চিঠির পরিবর্তে যে কোনও পোলেমি তাঁর সব পোলেমিক দিতে সোল্লাসে প্রস্তুত হবেন।
শরৎচন্দ্র যদি তার মসীযুদ্ধ রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে না করে সে যুগের আর যে কোনও লোকের সঙ্গে করতেন, তবে তিনিও মসীযোদ্ধা হিসেবে নাম কিনে যেতে পারতেন। আর কেনেনইনি বা কী করে বলব? তার নারীর মূল্য পোলেমিকের প্রথম চাল। বাংলা দেশ এ পুস্তকের বিরুদ্ধে কলম ধরলে তিনি যে কী মাল ছাড়তেন, তার কল্পনা করতেও আমি ভয় পাই।
ধর্মে বিবেকানন্দ পোলেমিস্ট, ব্যঙ্গ কবিতায় দ্বিজেন্দ্রলাল।
***
এতখানি ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও কোনও বাঙালি এইসব ভূঁইফোড় আর্ট ক্রিটিকদের জোরসে দু কথা শুনিয়ে দেন না কেন?
.
৫
চীনের সহিত ভারতের লুপ্ত সাংস্কৃতিক যোগসূত্র পুনরায় স্থাপনা করিবার জন্য যে চৈনিক বিদগ্ধমণ্ডলী ভারতে আগমন করিয়াছেন তাহাদিগকে বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করিবার জন্য দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় শ্রীযুক্ত টিং সি-লিন ও শ্রীযুক্ত ফুঙ য়ু-লনকে ডক্টরেট উপাধি দ্বারা বিভূষিত করিয়াছেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি মহোদয় স্বহস্তে উপাধি এবং প্রশস্তি প্রদান করেন। দিল্লি নগরীর তাবৎ গুণীজ্ঞানী সভাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।
শ্ৰীযুত সি-লিন বৈজ্ঞানিক। তিনি তাহার বক্তৃতায় অর্বাচীন চীন বিজ্ঞানচর্চায় কী প্রকারে শনৈঃ শনৈঃ উন্নতিমার্গে ধাবমান হইতেছে তাহার সবিস্তার বর্ণনা করেন এবং পুনঃ পুনঃ সভাস্থ ভদ্রমণ্ডলীর বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া বলেন যে, চীনের সর্বপ্রকার বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা জনগণের মঙ্গলার্থে নিয়োজিত হইতেছে। শ্ৰীযুত সি-লিন স্পষ্ট বলেন নাই কিন্তু আমাদের বিশ্বাস ভারত যদি এই উত্তম উদাহরণ অনুসরণ করে তবে জন-গণ-মন অধিনায়কের শুধু মৌখিক নয়, আন্তরিক এবং সফল প্রশস্তি গীত হইবে।
