মারাঠি ভাষায় তবু কিছু আছে, গুজরাতিতে তারও কম। আসামিতে তো প্রায় কিছুই নেই, ওড়িয়ার খবর জানিনে– তবে যেহেতু শিক্ষিত আসাম এবং উড়িষ্যা সন্তান মাত্রই বাংলা পড়তে পারেন তাই তাদের জন্য বিশেষ দুশ্চিন্তা করতে হবে না।
মোদ্দা কথায় ফিরে যাই। রাধাকৃষ্ণণ তো দায় চাপিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর অর্থাৎ অধ্যাপকদের ওপর। কিন্তু হায়, তাদের তো দরদ নেই এসব জিনিসের প্রতি। আর স্বয়ং রাধাকৃষ্ণণের যদি দরদ থাকত তবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে উপ-রাষ্ট্রপতি হতে গেলেন কেন?
.
৪
কলকাতাতে বর্ষা-বসন্ত আছে বটে, কিন্তু তাতে করে কলকাতাবাসীর জীবনযাত্রার কোনওপ্রকারের ফের-ফার হয় না। হৈ-হুল্লোড়, পার্টি-পরব, কেনা-কাটা, মারামারি একই ওজনে চলে। দিল্লিতে কিন্তু ভিন্ন ব্যবস্থা। এখানে দুই ঋতু- গ্রীষ্ম আর শীত। শীতকালে এন্তার দাওয়াত, নেমন্তন্ন, দিনে দশটা করে মিটিং, হপ্তায় দুটো করে আর্ট প্রদর্শনী, আজ ভরতনাট্যম, কাল কথাকলি, পরশু যেহুদি মেনুহিন, আর একগাদা সঙ্গীত সম্মেলনে, কবিসঙ্গম, মুশাইরা। গ্রীষ্মকালে এ সবকিছুতে মন্দা পড়ে যায়, শুধু যেসব দেশের বাৎসরিক পরব গরমে পড়েছে, সেসব দেশের রাজদূতেরা বাধ্য হয়ে রিসেপশন দেন, আর সবাই শার্ক ফিন আর কালো বনাতের মধ্যিখানে প্রচুর পরিমাণে ঘামেন। পার্টিগুলোর জৌলুসেরও খোলতাই হয় না, কারণ ডাকসাইটে সুন্দরীরা পাহাড়-পর্বত ঘুরতে গেছেন। পার্টিতে যদি রঙ-বেরঙের শাড়ির বাহারই না থাকল তবে সে পার্টি অতি নিরামিষ (নিরস্তু তো বটেই, এসব পার্টিতে জল মানা) তাই পাঁচজন পার্টি থেকে ভদ্রতা রক্ষা করেই তাড়াতাড়ি কেটে পড়েন।
এসব হল নিউ দিল্লির কাহিনী।
পুরানি দিল্লিতে কিন্তু একটা জিনিসের অভাব কখনও হয় না। প্রায় প্রতিদিনই কোনও না কোনও নাগরিককে অভিনন্দন করার জন্য কোনও না কোনও পার্কে তাঁবু আর শামিয়ানা খাঁটিয়ে, দিগধিরিঙে লাউড-স্পিকার ঝুলিয়ে যা চেল্লাচেল্লি আরম্ভ হয়, তাতে পাড়ার লোক ত্রাহি ত্রাহি ডাক ছাড়ে– দরজা-জানালা বন্ধ না করে একে অন্যের সঙ্গে কথা পর্যন্ত কওয়া যায় না।
এরকম একটা অভিনন্দন পার্টিতে আমি দিনকয়েক পূর্বে গিয়েছিলুম। যে দু জনকে অভিনন্দন করা হল, আমি তাদের নাম শুনিনি, দিল্লির কজন লোক তাঁদের নাম শুনেছে তা-ও বলতে পারব না।
দু জনারই যে প্রশস্তি গাওয়া হল, তা শুনে আমার বিদ্যেসাগর মহাশয়ের একটি ছোট লেখার কথা মনে পড়ল। এ লেখাটি সচরাচর কেউ পড়েন না বলে উদ্ধৃতির প্রলোভন সম্বরণ করতে পারলুম না।
কবিকুলতিলকস্য কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য এই ছদ্মনামে বিদ্যেসাগর মহাশয় লিখছেন
আমি এস্থলে– নাথ বিদ্যারত্নকে নদিয়ার চাঁদ বলিলাম। কিন্তু শ্রীমতী যশোহর হিন্দুধর্মরক্ষিণী সভা দেবী– মোহন বিদ্যারত্নকে নবদ্বীপচন্দ্র অর্থাৎ নদিয়ার চাঁদ বলিয়াছেন। উভয়েই বিদ্যারত্ন উপাধিকারী, উভয়েই স্ব স্ব বিষয়ে সর্বপ্রধান বলিয়া গণ্য, বিদ্যাবুদ্ধির দৌড়ও উভয়ের একই ধরনের। সুতরাং উভয়েই নবদ্বীপচন্দ্র অর্থাৎ নদিয়ার চাঁদ বলিয়া প্রতিষ্ঠিত হইবার যোগ্য পাত্র, সে বিষয়ে সংশয় নাই। কিন্তু এ পর্যন্ত এক সময়ে দুই চাঁদ দেখা যায় নাই। সুতরাং একজন বই, দুইজনের নদিয়ার চাঁদ হইবার সম্ভাবনা নাই। কিন্তু উভয়ের মধ্যে একজন একেবারেই বঞ্চিত হইবেন, সেটাও ভালো দেখায় না; এবং ওই উপলক্ষে দুজনে হুড়াহুড়ি ও তাগুতি করিয়া মরিবেন সেটাও ভালো দেখায় না। এজন্য আমার বিবেচনায় সমাংশ করিয়া দুজনকেই এক এক অর্ধচন্দ্র দিয়া সন্তুষ্ট করিয়া বিদায় করা উচিত। শ্রীমতী যশোহর হিন্দুধর্মরক্ষিণী সভা দেবী আমার এই পক্ষপাতহীন ফয়তা* ঘাড় পাতিয়া লইলে আর কোনও গোলযোগ বা বিবাদ-বিসংবাদ থাকে না। এক্ষণে তার যেরূপ মরজি হয়।
[*চলন্তিকা ফয়তা এবং ফতোয়া শব্দে পার্থক্য করে অর্থ দিয়েছেন; ফয়তা (আরবি ফাতিহহ) মুসলমান ধর্ম অনুসারে উপাসনা- এবং ফতোয়া (আরবি ফা) মুসলমান শাস্ত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা। কাজীর রায়। বিদ্যাসাগর মহাশয় কিন্তু সর্বদাই ফয়তা শব্দ ব্যবহার করেছেন ফতোয়া অর্থাৎ বিধান রায় অর্থে।]
***
নিত্যি নিত্যি কারণে অকারণে হৈ-হুল্লোড় করার অভ্যাস দিল্লিবাসী বাঙালির ওপরও বেশ কিছুটা প্রভাব বিস্তার করেছে। আজ এখানে সাহিত্য সভা, কাল ওখানে বর্ষামঙ্গল প্রায়ই এসব পরব হয়। এবং অনেক সময়ে মনে হয়েছে, এসব পরবে সত্যকার কাজ যেন ঠিকমতো হচ্ছে না।
তাই আমি চেষ্টা করেছি, ছোট গণ্ডির ভিতর অল্পসংখ্যক লোক নিয়ে প্রতি সপ্তাহে কিংবা প্রতি পক্ষে স্টাডি সার্কল বসাবার, কিন্তু দুঃখের বিষয় এ যাবৎ কৃতকার্য হতে পারিনি। আমার বয়স হয়েছে, তদুপরি আমি খ্যাতনামা সাহিত্যিক নই, কাজেই আমার দ্বারা এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের পত্তন সম্ভবপর নয় অথচ এর প্রয়োজন আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি।
কেন্দ্র হিসেবে দিল্লির মাহাত্ম ক্রমেই বাড়বে। কেন্দ্রের হাতে অর্থ আছে এবং সে অর্থের কিছুটা প্রাদেশিক সরকাররাও পান সাহিত্য এবং সাহিত্যিকদের সেবার্থে। বাংলার প্রাদেশিক সরকার কেন্দ্রের কাছ থেকে বাংলা সাহিত্যের জন্য কত টাকা বাগাতে পারবেন, সে তাঁরা জানেন, কিন্তু আমরা যারা দিল্লিতে আছি এ বাবদে আমাদেরও যথেষ্ট কর্তব্য আছে।
