এর কারণ অনুসন্ধান করলে দেখতে পাবেন– আমরা চাষার ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়ে দিয়ে ভাবি, আমাদের কর্তব্য শেষ হয়ে গিয়েছে, কিন্তু একথাও ভাবিনে, তারা পরীক্ষায় পাস করার পর পড়বে কী? এরা যে পুনরায় নিরক্ষর হয়ে যায়, তার একমাত্র কারণ তাদের কাছে পড়বার মতো কিছু থাকে না।
ইয়োরোপের চাষা-মজুর আমাদের মতো গরিব নয়। তারা যে নিরক্ষর হয়ে যায় না তার একমাত্র কারণ তারা খবরের কাগজ পড়ে এবং মেয়েরা ক্যাথলিক হলে প্রেয়ার বুক আর প্রটেস্টান্ট হলে বাইবেল পড়ে। অবরে সবরে হয়তো একখানা নভেল কিংবা ভ্রমণকাহিনী পড়ে, চাষা বাড়িতে না থাকলে হয়তো তার হয়ে চিঠি-চাপাটিও লেখে, কিন্তু এগুলো আসল কারণ নয়– আসল কারণ খবরের কাগজ, প্রেয়ার বুক এবং বাইবেল।
স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, আমাদের চাষা খেতে পায় না, সে খবরের কাগজ কেনবার পয়সা পাবে কোথায়?
তাই দেখতে পাবেন, যে চাষা কোনওগতিকে তার ছেলেকে পাঠশালা পাশের সময় একখানা রামায়ণ কিংবা মহাভারতকিনে দিতে পেরেছিল তার বাড়িতে তবু কিছুটা সাক্ষরতা বেঁচে থাকে। এই আংশিক বাঁচাওতাটা কিন্তু প্রধানত বাংলা দেশে। হিন্দিভাষীদের তুলসীরামায়ণ পড়ে সে লাভ হয় না, কারণ তুলসীর ভাষা আর আধুনিক হিন্দিতে প্রচুর তফাৎ। তুলসীর ভাষা দিয়ে আজকের দিনে চিঠি লেখা যায় না– কাশীরাম কিংবা কৃত্তিবাসের ভাষার সঙ্গে কিন্তু আধুনিক বাংলার খুব বেশি পার্থক্য নেই।
তাই দেখতে পাবেন, মুসলমান চাষা পাঠশালা পাশের পর খুব শীঘ্রই নিরক্ষর হয়ে যায় কারণ সে রামায়ণ-মহাভারত পড়ে না এবং বাংলা ভাষায় এরকম ধরনের সহজ সরল মুসলমানি ধর্মপুস্তক নেই। ভারতবর্ষের ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশে পরিস্থিতিটা কীরকম তার খবর আমার জানা নেই, তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস এর পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান করলে আমরা শিক্ষা বিস্তারের জন্য বিস্তর হদিস পাব।
তা হলে ওষুধ কী?
যে উত্তর সকলের প্রথম মনে আসবে সে হচ্ছে, গ্রামে গ্রামে লাইব্রেরি বসানো। কিন্তু অত টাকা যোগাবে কোন গৌরী সেন? সরকার তো দেউলে। তা হলে?
এইখানে এসে আমিও আটকা পড়ে যাই। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি নতুন স্কুল খোলর চেয়েও বড় কাজ পড়ার জিনিস সাক্ষর ছেলেমেয়েদের হাতে দেওয়া বিনি পয়সায় কিংবা অতি অল্প দামে।
আমি বহু বৎসর ধরে এ সমস্যা নিয়ে মনে মনে তোলপাড় করেছি, বহু গুণীর সঙ্গে আলোচনা করেছি, দেশ-বিদেশে উন্নত-অনুন্নত সমাজে অনুসন্ধান করেছি তারা এ সমস্যার সমাধান কী প্রকারে করে, কিন্তু কোনও ভালো ওষুধ এখনও খুঁজে পাইনি। আমার পাঠকেরা যদি এ সম্পর্কে তাদের সুচিন্তিত অভিমত আমাকে জানান, তবে তার আলোচনা করলে আমরা লাভবান হব সন্দেহ নেই।
***
অন্য এক বক্তৃতা প্রসঙ্গে শ্ৰীযুত রাধাকৃষ্ণণ বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়দের কর্তব্য ছাত্রদের স্পিরিচুয়াল ডিরেকশন দেওয়া।
আমার মনে হয়, এইমাত্র আমরা যে সমস্যা নিয়ে বিব্রত হয়েছিলুম, সেই সমস্যারই এ আরেকটা দিক।
স্পিরিচুয়াল বলতে শ্রীরাধাকৃষ্ণণ নিশ্চয়ই রিলিজিয়াস বলতে চাননি–তা হলে হাঙ্গামা অনেকখানি কমে যেত– তাই মোটামুটিভাবে ধরা যেতে পারে, তিনি আত্মার প্রয়োজনের দিকটাতেই ইঙ্গিত করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান কর্ম ছাত্রকে তার দেশের বৈদগ্ধ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করা এবং এ বিষয়েও কোনও সন্দেহ নেই যে, ভারতীয় বৈদগ্ধ্যে আত্মার ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য প্রয়োজনের অধিক সুস্বাদ আহার্য রয়েছে। কাজেই ধরে নেওয়া যেতে পারে অধ্যাপকেরা যদি ছাত্রদের ভারতীয় বৈদগ্ধের প্রতি অনুসন্ধিৎসু করাতে পারেন, সে বৈদগ্ধের উত্তম উত্তম বস্তুর রসাস্বাদ করাতে শেখান, তবে ছাত্র নিজের থেকেই তার প্রয়োজনীয় আধ্যাত্মিক ধন চিনে নিতে পারবে। সকলেরই কাজে লাগবে এবং মুষ্টিযোগ যখন মুষ্টিগত নয়, তখন ছাত্রের সামনে গন্ধমাদন রাখা ছাড়া উপায় নেই যে যার বিশল্যকরণী বেছে নেবে।
কিন্তু সমস্যা সৎসত্ত্বেও গুরুতর। ছেলেদের পড়তে দেব কী? ভারতীয় বৈদগ্ধ্যের শতকরা পঁচানব্বই ভাগ সংস্কৃত-পালিতে, তিন ভাগ ইংরেজিতে, আর মেরেকেটে দু ভাগ বাংলায়। অথচ আজকের দিনে সব ছেলেকে তো আর জোর করে বিএ অনার্স অবধি সংস্কৃত পড়াতে পারিনে। এবং তাতেই বা কী লাভ? কজন সংস্কৃতে অনার্স গ্রাজুয়েটকে অবসর সময়ে সংস্কৃত বইয়ের পাতা ওলটাতে আপনি-আমি দেখেছি। সংস্কৃত গড় গড় করে পড়া শিখতে হলে টোল ছাড়া গতান্তর নেই।
অতএব মাতৃভাষাতেই আমাদের বৈদগ্ধ্য-চর্চা করতে হবে।
এবং সেখানেই চিত্তির।
আজ যদি আপনি বেদ, উপনিষদ, ষড়দর্শন, কাব্য, অলঙ্কার, নৃত্যনাট্য-সঙ্গীতশাস্ত্র অলঙ্কার বাংলা অনুবাদে পড়তে চান তবে একবার ঘুরে আসুন কলেজ স্কোয়ারে বইয়ের দোকানগুলোতে, যেসব বইয়ের বাংলা অনুবাদ হয়ে গিয়েছে সেগুলোই যোগাড় করতে গিয়ে আপনাকে চোখের জলে নাকের জলে হতে হবে। আর কত শত সহস্র পুস্তক যে আপনার পড়তে ইচ্ছে হবে, অথচ অনুবাদ নেই– তার হিসাব করবে কে?
হিন্দিওলাদের তো আরও বিপদ। আমাদের চেয়ে ওদের অনুবাদ সাহিত্য অনেক বেশি কমজোর। এই দিল্লির কনট সার্কাসে আমি হিন্দি বইয়ের দোকানে সার্কাসের ঘোড়ার মতোই চক্কর লাগাই আজ পর্যন্ত কোনও সংস্কৃত বইয়ের উত্তম হিন্দি অনুবাদ চোখে পড়ল না যেটি বাড়িতে এনে রসিয়ে রসিয়ে পড়ি।
