বিবাহ-প্রস্তাবকে যখন সর্বোত্তম প্রস্তাব বলা হয় তখন এ প্রস্তাবটিকে আমরা অত্যুত্তম প্রস্তাব করে মেনে নিচ্ছি। বিশেষত যখন হিন্দুস্থান ও পাকিস্তানের সব মহাজনরাই জানেন যে, পশ্চিম পাঞ্জাবে নারীর তুলনায় পুরুষের সংখ্যা বেশি। চিরকুমার অনেককে এমনিতে থাকতে হত– ক্লাব বানিয়ে চেল্লাচিল্লি করে যদি নেসেসিটিকে ভার্টু বানানো যায়, বাংলায় যাকে বলি– উড়ো-খই গোবিন্দায় নমঃ তা হলে হাটের মধ্যিখানে হাঁড়ি ভেঙে কার কী ফয়দা?
উঁহু, সেটি হচ্ছে না। একদল ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি উল্টো ক্লাবের পত্তন করেছেন ছোকরাদের বাউণ্ডুলোমি থেকে খারিজ করে কবুল, কবুল, কবুল বলাবার জন্য এ ক্লাবে কন্যাদায়গ্রস্ত পিতারা আছে কি না সে খবর এখনও আমরা পাইনি।
এঁদের বক্তব্য, ইসলাম চিরকৌমার্য সৎ না-পছন্দ করে; বিয়ে না করলে মুসলমান মুসলমানই নয়, এসব অনৈসলামিক কায়দা-কেতা– পাকিস্তানকে না পাক করে ফেলবে।
শুনে তাজ্জব মানলুম।
বিয়ে করতে চাইলে সে সম্বন্ধে অনেক উপদেশ কুরান শরিফে আছে; কিন্তু কেউ বিয়ে না করতে চাইলে কুরান তো তার ওপর কোনও অভিসম্পাত দেননি। চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, মিথ্যে সাক্ষী দেওয়া, পরকীয়া, আল্লাকে অস্বীকার করা এসব অপকর্ম যে গুনাহ সেকথা কুরানে স্পষ্ট লেখা আছে, এমনকি এসব কর্ম করলে ইহলোকে এবং পরলোকে তার কী সাজা সেকথাও সবিস্তর বয়ান করা হয়েছে কিন্তু শাদি না করা গুনাহ (পাপ) একথা তো কুরানের কোথাও নেই। তা হলে যে লাহোরে মুরব্বিরা বললেন, বিয়ে না করা অনৈসলামিক সেটা তারা পেলেন কোন বগল-নামা থেকে?
মুরুব্বিরা হয়তো বলবেন, আরে বাপু, কুরানেই কি সব কথা লেখা আছে? সেই যে নিত্যি নিত্যি পাঁচ বকৎ নেমাজ পড়ছ সে কথাই কি আর কুরানে পট্টাপষ্টি লেখা আছে? আছে হদিসে। কুরানের পরে রয়েছেন হদিস- হদিস ভি মানতে হয়। শ্রুতির পর যেরকম স্মৃতি, কুরানের পর তেমনি হদিস না মেনে উপায় নেই।
বুখারি (আমাদের যেরকম মনু) সাহেব যে হদিস সঞ্চয়ন করেছেন তাতে মহাপুরুষ মুহম্মদ কখন কাকে কী উপদেশ দিয়েছিলেন তার উত্তম বর্ণনা রয়েছে। আরও অনেকেই করেছেন, কিন্তু বুখারি সাহেবকেই এ বাবদে সবচেয়ে বেশি মান্য করা হয় কি লাহোর, দিল্লি, কি কাইরো, কি মরক্কো, সর্বত্রই।
বুখারি সাহেব বয়ান করেছেন, একদা এক দীন মুসলিম মহাপুরুষ (মুহম্মদ) সমীপে আগমন করতঃ নিবেদন করল, হে আল্লার প্রেরিত পুরুষ, এই অধম অতিশয় অর্থহীন। স্ত্রীধন প্রদান করিয়া বিবাহ করিবার ক্ষমতা আমার নাই অথচ আমি কামাগ্নিতে অহরহ দগ্ধ হইতেছি। অনুমতি করুন, আমি অস্ত্রোপচার করত ক্লৈব্যাবস্থা প্রাপ্ত হই। মহাপুরুষ প্রত্যুত্তরে বলিলেন, না। তুমি উপবাস কর এবং আল্লাসমীপে অহরহ প্রার্থনা কর যেন তিনি তোমার মুশকিল আসান (সরল) করিয়া দেন।
পূর্বেই নিবেদন করেছি, লাহোর-পিন্ডিতে মেয়েছেলে পুরুষের তুলনায় কম। চিরকুমাররা অবশ্য বলেছেন, তাদের অর্থাভাব বিয়ে না করার অন্যতম কারণ। এঁদের যুক্তি ও যে ব্যক্তি মহাপুরুষের কাছে গিয়েছিল তার যুক্তি একই। সর্বাব্যবস্থাতে বিয়ে করা যদি চরম কাম্য হত তবে মহাপুরুষ নিশ্চয়ই তাকে বিয়ে করতে আদেশ দিয়ে বলতেন (মুরুব্বিরা সচরাচর যেরকম বলে থাকেন), রুটি দেনে-ওলার মালিক খুদা, তিনিই পেট দিয়েছেন, তিনিই রুটি দেবেন। তুমি বিয়ে কর।
অর্থাভাব থাকলে চুরিচামারি করে বিয়ে করা অনুচিত সেকথা মহাপুরুষ মেনে নিয়েছিলেন– লাহোরের মুরুব্বিরা মানছেন না। তাই বোধহয় শাস্ত্রে বলে ধর্মের গতি সূক্ষ্ম।
আর যদি বলা হয়,
মহাজ্ঞানী মহাজন যে পথে করে গমন ইত্যাদি তা হলে নিবেদন, যে খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া সম্বন্ধে গত সপ্তাহে নিবেদন করেছিলুম, তিনি এবং অধিকাংশ সুফিই চিরকৌমাত অবলম্বন করে মহবুব-ই-ইলাহি (ব্রহ্মবান্ধব) উপাধি লাভ করেছিলেন।
.
৩
বোম্বায়ে বক্তৃতা প্রসঙ্গে শ্ৰীযুত রাধাকৃষ্ণণ বলেন, এদেশের সবচেয়ে বড় কর্তব্য আপামর জনসাধারণের ভিতর শিক্ষার প্রচার ও প্রসার করা এবং বেকার সমস্যার নিরঙ্কুশ সমাধান করা।
এ অতি সত্য কথা– এমনকি পৃথিবীর বর্বরতম দেশও এ তত্ত্ব মেনে নেবে। কিন্তু প্রশ্ন, শিক্ষার বিস্তার এবং প্রসার করা যায় কী প্রকারে? পূর্ববঙ্গে একটি প্রবাদ আছে,
যত টাকা জমাইছিলাম
শুঁটকি মাছ খাইয়া
সকল টাকা লইয়া গেল
গুলবদনির মাইয়া!
যতরকমের খাজনা হতে পারে, যতপ্রকারের ন্যায্য-অন্যায্য ট্যাক্স হতে পারে, সবই তো চাঁদপানা মুখ করে দিচ্ছি। সরকারের হাতে সে টাকা জমা হচ্ছে এবং তার বেবাক খরচ হয়ে যাচ্ছে এখাতে ও-খাতে সে-খাতে, অর্থাৎ গুলবদনির মাইয়াই সব টাকা নিয়ে যাচ্ছে, শিক্ষা বিস্তারের জন্য যে অর্থের প্রয়োজন তার শতাংশের এক অংশও উদ্বৃত্ত থাকছে না।
কাজেই গ্রামে গ্রামে পাঠশালা খুলি কী করে, পুরনোগুলোই বা চালু রাখি কোন কৌশলে?
***
কিন্তু আমার মনে হয় পুরনো স্কুল চালু রাখা আর নতুন স্কুল খোলাই শিক্ষা বিস্তারের জন্য প্রধান কর্ম নয়। খুলে বলি–
অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গিয়েছে, কোনও বিশেষ গ্রামে গত পঞ্চাশ বৎসর ধরে একটি ভালো পাঠশালা উত্তমরূপে চালু আছে, প্রতি বৎসর দশ-বারোটি ছেলে শেষ পরীক্ষা পাস করে বেরিয়ে যাচ্ছে, কেউ কেউ বৃত্তিও পাচ্ছে, কিন্তু তবু যে কোনও সময় আপনি সে গ্রামে গিয়ে যদি হিসাব নেন, কটি ছেলে লিখতে-পড়তে পারে, তবে দেখবেন দশ-বারোটির বেশি না, বাদবাকি আর সবাই লেখাপড়া ভুলে গিয়েছে এবং যে দশ-বারোটি এখনও কেঁদে-কুকিয়ে পড়তে পারে তারাও শীঘ্রই সম্পূর্ণ নিরক্ষর হয়ে যাবে। অবশ্য আমি এস্থলে সাধারণ চাষা-মজুরের কথাই ভাবছি– মধ্যবিত্ত কিংবা বিত্তশালী পরিবারের কথা উঠছে না।
