তাই আজ একবাক্যমনে ভারত ভাগ্যবিধাতাকে নমস্কার করি, যিনি পাঞ্জাব-সিন্ধু গুজরাত মারাঠা-দ্রাবিড়-উল্কল-বঙ্গ হিন্দু-বৌদ্ধ-জৈন-পারসিক-মুসলমান-খ্রিস্টানকে সম্মিলিত করেছেন –সেই দেবের আশীর্বাদ নিয়ে আমরা পুনরায় ভারতের সর্ব ধর্মবিশ্বাসীকে আহ্বান করি–
মার অভিষেকে এস এস ত্বরা
মঙ্গলঘট হয়নি যে ভরা
সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থ নীরে–
আজি ভারতের মহামানবের
সাগর-তীরে।
.
২
ভারতীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দ্বিতীয় বার্ষিকী মহানগরী দিল্লিতে সাড়ম্বরে সমাধান হল। বিস্তর ট্যাঙ্ক, সাজোয়া গাড়ি, তরো-বেতরো কামান, বন্দুক, রাজপুত মারাঠা শুখা শিখ সৈন্যবাহিনী, নৌবহরের অফিসার-মাল্লা-খালাসি, রেডক্রস-নার্সিং ও ইত্যাদির বহুসহস্র লোক বহুতর ব্যান্ডবাদ্যি বাজিয়ে রাষ্ট্রপতিকে সম্মান জানানোর পর এক দীর্ঘ মিছিল বানিয়ে শহরবাসীকে তাক লাগিয়ে দেন। সঙ্গে সঙ্গে তিন ঝক জঙ্গিবিমান বিকট শব্দ করে বিদ্যুৎগতিতে মাথার উপর দিয়ে আকাশের বুক এফোঁড়-ওফোঁড় করে উড়ে গেল।
প্রাচীন যুগের লোক কাণ্ডকারখানা দেখে আমার তো পিলে চমকে গেল। বাপরে বাপ- শান্তির সময়ই যখন এদের এরকম চেহারা তখন লড়াইয়ের সময় না জানি এরা কীরকম মারমুখো হয়ে ওঠে।
আমাদের কর্তাদের কাণ্ডজ্ঞান আছে। আমার মতো আরও পাঁচটা লোক যে এরকম ঘাবড়ে যাবে সেকথা তাঁরা আঁচতে পেরে তাপ দাওয়াইয়ের ব্যবস্থাও করেছিলেন। ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশের সংস্কৃতি বৈদগ্ধের প্রতীক সম্বলিত একখানি মোলায়েম মিছিলের ব্যবস্থাও তারা করেছিলেন।
কোন প্রদেশ আপন সংস্কৃতির কী প্রতীক বেছে নিয়েছিলেন তার সবিস্তর বর্ণনা খবরের কাগজে বেরিয়েছে আপনারা নিশ্চয়ই পড়েছেন। ছবিও বেরিয়েছে, কাজেই ভালোমন্দ বিচার করতে কোনও অসুবিধে হবে না।
আমি কূপমণ্ডুক বাঙালি, বাংলা দেশ নিয়েই আমার কারবার।
বাংলা দেশের প্রতীকরূপে সরস্বতী পুজোর নকশা এই মিছিলে দেখানো হয়েছিল। দিল্লির খবরের কাগজগুলোকে আগের থেকে বলা হয়েছিল, বাংলা দেশ বাণীর সাধক, তাই বাংলা দেশের প্রধান বৈশিষ্ট্য তার স্বরস্বতী পূজা।
মনে বড়ই গর্ব হয়েছিল। কারণ বাংলা দেশ সম্বন্ধে রায় পিথৌরা এখনও যেটুকু আশ্বাস মনের কোণে পোষণ করে সেটুকু তার বিদ্যাচর্চা নিয়ে। যেদিন এইটুকুও যাবে সেদিন বাজার শেষ।
বাঙালির বেশির ভাগ বেকার, চাকরিতেও সে অন্য প্রদেশের কাছে মার খায়, বাংলার মোটা মোটা ব্যবসা কে করে, সেকথা তুলে নিরর্থক প্রাদেশিক বিদ্বেষ জানাতে চাইনে, দিল্লিতে বাঙালি কল্কে পায় না, সুভাষের পর বাংলা দেশে নেতা জন্মাননি, কত লক্ষ বাঙালি উদ্বাস্তু হয়ে জীবন্ত অবস্থায় আছে তার হিসাব নিতে মন বিমুখ। তথাস্তু বলিয়া দৈবী কৈলা বরদান। দুধে-ভাতে থাকিবে তোমার সন্তানা পোড় খেয়ে খেয়ে নাস্তিক মন এ বাক্যে আর বিশ্বাস করে না, কিন্তু একটি সত্যে এখনও আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস, বাংলা দেশ এখনও বিদ্যার সম্মান করে।
রায় পিথৌরা গর্দিশের ফেরে দিল্লিতে বাস করেন। যে কালাপানির নামে বাঙালি একদিন ভিরমি যেত সেই কালাপানিতেই যখন আজ বাঙালি পেটের ধান্দায় মাথা কোটে তখন দিল্লিবাস তো স্বর্গবাস। তবু বলি, ওয়ারি-বালিগঞ্জে মিলে যদি একদিন আন্দামানকে দ্বিতীয় বাঙলা বানাতে পারে তবে আমি দিল্লি ত্যাগ করে সেই কালাপানিই যাব।
দিল্লিকে নমস্কার। এখানে সবকিছু আছে অস্বীকার করিনে– ইস্তেক বাঙালিবল্লভ ইলিশ মাছও পাওয়া যায়। এখানে পারমিট পাওয়া যায়, এম্বেসি-লিগেশনে ঘোরাঘুরি করলে দাওয়াত পাওয়া যায়, চোখ-কান খোলা রাখলে ফরেন যাবার মোকাও মেলে, শুবো-সাম মিটিঙ-মাটিঙ যখন লেগেই আছে তখন একটুখানি তত্ত্বতাবাশ করলে সভাপতি হয়ে কাগজে ছবি তোলানো কঠিন কর্ম নয়, আরও কত কী আছে সেসব কথা ফাঁস করে দিয়ে আমি খামোখা কম্পিটিটর বাড়াতে চাইনে।
কিন্তু বিদ্যাচর্চা– রামচন্দ্র!
বিদ্যার বাহন বই। গুণীরা তাই আজীবন বই জমান। এখানকার গুণীরাও বই জমান– তবে সে বই চেকবই।
দিল্লিতে বিদ্বান নেই, একথা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু দিল্লিতে বই নেই। এখানকার বিদ্বানরা তাই, ঢাল নেই, তরোয়াল নেই নিধিরাম সর্দারের দল।
এক হিসেবে ভালোই। এখানে এন্তার বিদ্যাচর্চা থাকলে মূর্খ রায় পিথৌরা দু মুঠো অন্ন কামাত কী করে? অ্যাদ্দিনে তার সব পাণ্ডিত্য ফাঁস হয়ে যেত আর কুলোর বাতাস খেতে খেতে কহাঁ কহাঁ চলে যেতে হত।
কী বলতে গিয়ে কোথায় এসে পড়েছি।
বাংলা দেশ বাণীর সেবা করে সেকথা তো মানলুম– তা সে না হয় আজকের দিনে নোটবুক মুখস্থ করেই হোক।
কিন্তু প্রজাতন্ত্র দিবসে আমার মনে হল, এই প্রজাতন্ত্র সফল করার জন্য বাঙালি যে কতটা আপন বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে দিয়ে জ্বলেছে তার খবর বোধহয় অবাঙালিদের একটুখানি জানানো উচিত।
বিবেকানন্দ, বঙ্কিম, অরবিন্দ, রবীন্দ্রনাথ, সুভাষচন্দ্র এরকম মহাত্মা বাংলার বাহিরে বোধহয় বিস্তর জন্মাননি। কী কৌশলে এঁদের নিয়ে দ্রষ্টব্য রসবস্তু নির্মাণ করা যেত বাঙালি শিল্পীরা সে কথাটি এই বেলা ভেবে রাখলে ভালো হয়।
আসছে বছরও তো এই পরব হবে।
***
লাহোর-ওলপিন্ডিতে নাকি শুটিকয় চিরকুমার সভা অর্থাৎ ব্যাচেলরস্ ক্লাবের গোড়াপত্তন করা হয়েছে। সদস্যদের আদর্শ আমরণ অবিবাহিত থাকা; কেউ যদি কোনও কুহকিনীর পাল্লায় পড়ে সন্মার্গভ্রষ্ট হওয়ার উপক্রম করে তবে আর পাঁচ ভাইয়ের কর্ম হবে তখন তাকে সে রমণীর কেশ-পাশ নাগ-পাশ থেকে আজাদ করা।
