আমি বললুম, সেসব দিন গেছে। আগের আমলে পালা-পরবের মানেই ছিল কাঙালি-ভোজন। গরিব-দুঃখীরা খেয়ে খুশি হত, কর্তারা খাইয়ে খুশি হতেন আর পাড়ার জোয়ান মদ্দেরা পরিবেশন করে সুখ পেত। ওই ছিল তখনকার দিনের ম্যাস্ কনটাক্ট। এখন আমরা ম্যাস্ কনটাক্ট করি খবরের কাগজে আর মিটিঙে সেসব মিটিঙে আবার ম্যাস আসেও না।
***
আমার আরেক লক্ষ্মী-ট্যারা ঠোঁটকাটা বন্ধু আছেন। তিনি কখনওই কোনও বস্তু সোজা দেখতে পান না। আমাকে বললেন, আজ আর এমন কী দিন যে মোচ্ছব করতে হবে?
আমরা সবাই তার দিকে অবাক হয়ে তাকালুম।
বললেন, ২৬ জানুয়ারি আমাদের সত্যকার স্বাধীনতা দিবস। ১৫ আগস্টে তো আমরা স্বাধীনতা পাইনি– পেয়েছি ডমিনিয়নত্ব।
সুশীল পাঠক, আপনারা একটু বিবেচনা করে দেখবেন।
***
স্বাধীনতা দিবসেই আমি পিছন পানে তাকাই। ভাবি, এই এক বৎসরে দেশ কতখানি এগুলো?
বিত্তসম্পদের দিক দিয়ে কতখানি এগিয়েছি বা পিছিয়েছি, তার হিসাব আমার পক্ষে করা সুকঠিন, সুকঠিন কেন অসম্ভব। চিন্তা এবং ভাবের জগতের উন্নতি-অবনতির সম্বন্ধে যে বুক ঠুকে কিছু বলব, সে শাস্ত্রাধিকারও আমার নেই। তবু যখন ওই জগতেরই দাঁড়ায়ে বাহির দ্বারে মোরা নরনারী, তখন রবাহূতরূপে গুণীজনের আলোচনার কিছু কিছু বুঝতে পেরে যেসব সমস্যার সমানে এসে পড়েছি, সেগুলো নিবেদন করি।
পণ্ডিতজি সব সময়েই বলেন, সাম্প্রদায়িকতা এবং হিংসাবৃত্তি (ভায়োলেন্স) ত্যাগ না করলে ভারতের উদ্ধার নেই। হিংসাবৃত্তি কাদের, কেন তারা হিংস্র সেকথা আমি ভালো করে জানিনে, কারণ রাজনীতি আমি বুঝিনে এবং যারা হিংস্র, তারা বোধহয় রাজনৈতিক মতবাদবশতই হিংস্র হয়েছেন, তাই তাদের নিয়ে আমার কিছু বলার নেই।
সাম্প্রদায়িকতা যেখানে ঐতিহ্য এবং বৈদগ্ধ্যগত ট্রাডিশনাল এবং কালচারেল) সেখানে আমাদের কিঞ্চিৎ বক্তব্য আছে।
আমাদের দেশের প্রত্যেক সম্প্রদায় কোনও না কোনও ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই এদেশে হিন্দু সম্প্রদায়, মুসলমান সম্প্রদায়, খ্রিস্টান সম্প্রদায় ইত্যাদি (এদের ভিতরে আবার উপসম্প্রদায় আছেন, কিন্তু সেগুলো নেশন বা জাতির সামনে এখনও আমাদের সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়নি)। অধিকাংশ হিন্দু বিশ্বাস করে, হিন্দুধর্ম সর্বোত্তম ধর্ম, অধিকাংশ মুসলমানেরও বিশ্বাস ইসলাম পৃথিবীর শেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম। এ বিশ্বাস থেকে এদের টলানো উপস্থিত কিংবা অদূরভবিষ্যতে অসম্ভব। এবং তার প্রয়োজনও নেই, কারণ যতক্ষণ অবধি এ বিশ্বাস আমাদের জাতীয় (নেশনাল) জীবনে কোনও তোলপাড় সৃষ্টি না করে ততক্ষণ আমাদের কোনও ভাবনা নেই। আমার মা দুনিয়ার সব মায়ের চেয়ে ভালো রাঁধতে পারতেন। এ বিশ্বাস অধিকাংশ পুত্রই আপন মা সম্বন্ধে পোষণ করে, তাতে কোনও ক্ষতি নেই। কিন্তু যদি কেউ বলে, মুসোলিনি-হিটলার সেটা বলতে পারতেন যে, বাদবাকি দেশকে তার মায়ের রান্নাই খেতে হবে, তা হলেই চিত্তির।
হিন্দুরা ১৯৫২ সালে এ আশা করেন না যে, মুসলমানরা হিন্দু হয়ে যাবে কিংবা মুসলমানরাও অনুরূপ প্রত্যাশা করেন না। মনে হচ্ছে একে অন্যের ধর্ম মেনে নিয়েছেন, তাই এখন দাঁড়িয়েছে বৈদগ্ধ্য সংস্কৃতি-কৃষ্টির প্রশ্ন।
সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের বৈদগ্ধ্য দেশের বৈদগ্ধ্য নিরূপণ করে। ইতিহাসও তাই বলে। কিন্তু বৈদগ্ধ্য আর ধর্ম এক জিনিস নয়, সেটা বিবেচনা করে দেখতে হবে। অদ্যকার ইংরেজ, গ্রিক এবং রোমান বৈদগ্ধ্য স্বীকার করে নিয়েছে, এখনও প্রতিদিন সে তার সাহিত্য, নাট্য, অলঙ্কার ইত্যাদি গ্রিক এবং লাতিন বৈদগ্ধ্য থেকে চেয়ে নিয়ে আপন বৈদগ্ধ্য সমৃদ্ধ করে–কিন্তু সে গ্রিক এবং রোমান দেবদেবীর পুজো করে না, অর্থাৎ গ্রিক এবং রোমান ধর্ম স্বীকার করে না। আমরা মোন-জোড়োর সভ্যতা নিয়ে গর্ব করি, কিন্তু আজ যদি সপ্রমাণও হয় যে, মোন-জোড়োবাসী ইঁদুরের পুজো করত, কিংবা নরবলি দিত, তাই বলে আমরা এসব কর্মে লিপ্ত হব না।
এইখানেই আমাদের সমাধান। হিন্দুধর্ম ধর্ম–ধর্ম হিসেবে সম্মানিত হবে, বহু হিন্দু তাঁদের জীবনের চরম মোক্ষ বেদান্ত, সাংখ্য, যোগ পদ্ধতিতে পাবেন (কোনও কোনও অহিন্দুও পাবেন– যেমন মনে করুন, জর্মন শোপেনহাওয়ার উপনিষদকেই আপন জীবনমরণের কাণ্ডারী বলে ধলে নিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের জাতীয় জীবনে আমরা দেখব বেদ থেকে রবীন্দ্রনাথ (এমনকি নজরুল ইসলাম) পর্যন্ত আমাদের বৈদগ্ধ্য-ভাণ্ডারে কে কী কী সম্পদ দিয়ে গিয়েছেন?
এই সুদীর্ঘ চার হাজার বৎসরের ইতিহাসে বহু অ-হিন্দু আমাদের বৈদগ্ধ্যে অনেক কিছু দিয়ে গিয়েছেন, আমরা গ্রিক (যবন– আয়োনিয়ান), ইরানির কাছ থেকে জ্যোতিষ এবং ভাস্কর্যের (গান্ধার-কলা) অনেক কিছু শিখেছি এবং যুগ যুগ ধরে বহু মানবের কাছ থেকে নিয়েছি ও দিয়েছি। এই দিয়ে আমাদের বৈদগ্ধ্য গড়া হয়েছে (সুবোধ ঘোষের আনন্দবাজারের স্বাধীনতা সংখ্যায় প্রবন্ধ দ্রষ্টব্য)।
ধর্মের এই বৈদগ্ধ্যগত মূল্য সম্যকরূপে বোঝার জন্য প্রয়োজন শাস্ত্রপাঠ এবং শাস্ত্রের অনুপ্রাণিত অন্য সব পুস্তক অধ্যয়ন। তা না, আজ যেরকম বহু স্থলে হচ্ছে এবং পণ্ডিতজি এই জিনিস থেকে আমাদের সাবধান করছেন বহু বিবেকহীন লোক ধর্মের নামে হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান সবাইকে ওকাবে।
