এ প্রস্তাবের সম্মতি মধ্যপ্রাচ্যের ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্র থেকে না আসা পর্যন্ত সভা মুলতুবি করে দিলেই হত, কারণ ওটা এলে যে সর্বজনগ্রাহ্য হবে সে-সম্বন্ধে কারও মনে কোনও দ্বিধা ছিল না। তবু বক্তৃতা চলল। কিন্তু স্পষ্ট বোঝা গেল, বক্তৃতাতে আর কোনও ঝাঁজ নেই। উকিল যদি জানতে পারে হাকিম মোকদ্দমার রায় আগেভাগেই লিখে ড্রয়ারে রেখে দিয়েছেন, তখন তার বক্তৃতা আর জমে না।
উত্তর আসতে বোধহয় ত্রিশ-চল্লিশ ঘণ্টা লেগেছিল। মাঝখানে একটা রাত কেটে গেল। বৃহস্পতিবার রাত্রে সাড়ে বারোটায়। (নিউইয়র্কে বেলা দুটো) যখন দিনের দ্বিতীয় বৈঠক বসবার কথা এখনও খবর আসেনি। সভা নির্ধারিত সময়ে বসল না। টীকাকার ক্যানড় মিউজিক অর্থাৎ রেকর্ডসঙ্গীত বাজাতে লাগলেন।
শেষ পর্যন্ত সুসংবাদ এল। দশটি আরব রাষ্ট্র, যথাক্রমে লেবানন, জর্ডন, তুনিসিয়া, মরক্কো, লিবিয়া, মিশর, ইরাক, সউদি আরব, ইয়েমেন, সিরিয়া একমত হয়ে একে অন্যের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবেন না বলে সম্মত হয়েছেন; কাজেই বিদেশি সৈন্য সরানো হোক– অ্যাট অ্যান আর্লি ডেট। এবারে অবশ্য, আর্লি ডেটে ভয় পাবার কিছু নেই।
সভাজন একবাক্যে, সাধু সাধু রব ছড়ালেন। জাতিপুঞ্জের একটি স্মরণীয় দিবস। এরকম ভিটো-হীন সভা পূর্বে হয়েছে বলে স্মরণে আসছে না। জয়তু আরব ন্যাশনালিজম!
***
সবাই উল্লসিত হয়েছেন আরব ঐক্য দেখতে পেয়ে, আরব ন্যাশনালিজম জাগ্রত হয়েছে দেখে। আমরাও হয়েছি।
কিন্তু চিন্তা করে দেখা যাক এতে লাভ হল কার? যদি বলি মার্কিনিংরেজের, তবে যেন কেউ আশ্চর্য না হন। মার্কিনিংরেজের বাসনা, লেবানন ও জর্ডন রাষ্ট্রদ্বয় যেন অক্ষত থাকে। তাই তারা জায়গা দুটিতে সৈন্য নামিয়েছিল। এখন তো মিশর, ইরাক, সিরিয়া অর্থাৎ অন্যান্য দুশমন আরব রাষ্ট্রগুলোই সে ভার আপন আপন কাঁধে তুলে নিল! মার্কিনিংরেজ সৈন্যাপসারণের পর যদি জর্ডনে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে কোনও স্বতঃস্ফূর্ত গণতন্ত্রের আন্দোলন আরম্ভ হয়, তবে তো গণতান্ত্রিক মিশর, ইরাক, সিরিয়াকে যে শুধু হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হবে তাই নয়, যেহেতু তারা মৈত্রীসূত্রে বদ্ধ হয়েছেন, অতএব জর্ডনের রাজা তাঁদের কাছ থেকে সাহায্য কামনা করতে পারেন। সাহায্য করুন আর না-ই করুন– সর্বসম্মত প্রস্তাবে হয়তো অতদূর যাওয়া হয়নি– জর্ডন থেকে কোনও রাজদ্রোহী ইরাকে পালিয়ে এলে তাকে তো জর্ডনের হাতে ফেরত দিতে হবে।
আর কিছু না হোক, মিশর-ইরাক প্রভৃতি গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে এখন বসে বসে দেখতে হবে, জর্ডন এবং লেবাননের প্রগতিশীল নেতারা কীভাবে ইংরেজ এবং মার্কিনের খয়েরখা বাদশা হুসেন এবং তাদের প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর হাতে লাঞ্ছিত হন। অন্তরে অন্তরে এদের কল্যাণ কামনা করলেও প্রকাশ্যে জয়ধ্বনি করতে হবে রাজা হুসেনের। মার্কিনিংরেজ সৈন্য অপসারণের পরও অদৃশ্য সৈন্যসঙ্কুল মার্কিনিংরেজ ঘটি হয়ে রইল জর্ডন-লেবানন!
প্রতিক্রিয়াশীলরা আরব ভুবনে নতুন পাট্টা (লিস্) পেল!
এত দাম দিয়ে ঐক্য!
[আনন্দবাজার পত্রিকা, ৩১.৮.১৯৫৮]
.
দেহলি প্রান্তে
১
ভারতের আর সর্বত্র যেপ্রকারে স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হয়েছে, দিল্লিতেও প্রায় সেইরকমই; তবে কি না দিল্লি রাজধানী, এখানে ভারতের বড় কর্তারা বসবাস করেন, নানা দেশের রাজদূতরা নানাপ্রকারের বেশভূষা পরে আমাদের পালা-পরবে আসেন, ভারতের সব প্রদেশের লোক দিল্লিতে বড় বড় আসন নিয়ে বসেছেন, তাই এখানকার পালা-পরব যতই আমাদের নিজস্ব হোক না কেন, তার চেহারা শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক হয়ে যাবেই যাবে।
তবে কি না দিল্লির লোক কলকাতা কিংবা বোম্বায়ের তুলনায় গরিব বলে কলকাতা বা বোম্বায়ের লোক যখন পার্টি দেন, তখন তার জৌলুস-রওশন, শানশওকত হয় অনেক বেশি। এখানকার অধিকাংশ বড় লোক চাকরি করেন, চাকরিতে পয়সা কোথায়? পয়সা তো বোম্বাই-কলকাতার ব্যবসায়ীদের হাতে। আমাদের পার্টিতে চা আর মোমকলি; কলকাতার পার্টির স্মরণ করে আর মন খারাপ করব না।
তা হোকগে। পালা-পরবে কে কত পয়সা খরচ করল সেইটেই আসল কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে শহরের পাঁচজন এদিনে আনন্দিত হয়েছে কি না, এবং সে আনন্দ তা সে যে কোনও পন্থাতেই হোক প্রকাশ করবার সুযোগ পেল কি না?
***
তা হয়তো পেয়েছিল। অন্তত আমি যে পাঁজরাপোলে থাকি, সেখানেও নৃত্যবাদ্য এবং উত্তম আহারাদির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বাইরের লোককেও নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল, কিন্তু তাদের বেশির ভাগই আসতে পারেননি। সকলের বাড়িতেই পরব–গ্রামসুদ্ধ লোকের বড় ছেলের বিয়ে যদি একই দিনে হয়, তবে কে যাবে কার বাড়ি
কাজেই আমরা আপোসে আনন্দ করলুম। বন্দে মাতরম থেকে আরম্ভ করে খাস দিল্লির গজল, কসিদা বিস্তর গাওয়া হল। লাউড-স্পিকার দিয়ে সেসব গান রবাহূতদের শোনানো হল এবং সর্বশেষে কোর্মা-পোলাওয়ের ভূরিভোজন হল।
আমরা যখন পত্রপুষ্প, বেলুন-ঝালর ভর্তি বিরাট ঘরে বসে গান শুনতে, একে অন্যের সঙ্গে মিষ্টি মিষ্টি কথা কইতে ব্যস্ত ছিলুম, তখন আমাদের চাকরবাকরের ছেলেমেয়েরা আমাদের আনন্দোৎসব উঁকি মেরে মেরে দেখছিল। আমার গায়ে গণ্ডারের চামড়া আমার অস্বস্তি বোধ হয়নি, কিন্তু আমার দু একটি সহৃদয়, স্পর্শকাতর বন্ধু আমার দৃষ্টি সেদিকে আকর্ষণ করে বললেন, তাদের আনন্দ সর্বাঙ্গসুন্দর হচ্ছে না।
