বিশ্বের পরম সৌভাগ্য যে, তখন রুশ উত্তপ্ত দুর্যোধনের ন্যায় সূচ্যগ্রণ–রব ছেড়ে সিরিয়া কিংবা ইরাকি সীমান্তে সৈন্য পাঠায়নি, ভান করেছিল মাত্র। আসলে সে তার সুবুদ্ধির পরিচয় দিল বিশ্বের দৃষ্টি সেদিকে আকৃষ্ট করে এবং তাই নিয়ে আলোচনার বৈঠক ডাকবার জন্য।
তখন রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশেষ জরুরি সাধারণ সম্মেলন বসল। একাশিজন সদস্যের সবাই, কিংবা প্রায় সবাই সেখানে উপস্থিত। পৃথিবীর বৃহৎ বৃহৎ বেতার প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রোগ্রাম বন্ধ করে রাষ্ট্রপুঞ্জের আলোচনা সর্ববিশ্বে প্রসার করার জন্য এগিয়ে এল। ক্রিকেটের ভাষায় বলতে গেলে যার নাম বল টু বল কমেন্টারি। সেই একাশিজন সদস্যের কেউ যে মৌত অবলম্বন করবেন সে আশা বা দুরাশা কোনও সুস্থ শ্রোতাই করেননি। পনেরো মিনিট থেকে কে কঘন্টা বলবেন তারও কিছু ঠিকঠিকানা ছিল না। সেই তাবৎ বক্তৃতা কণামাত্র কাটছাট না করে পুরোপুরি বেতারিত হল। সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ ও রুশে অনুবাদ। আমাদের বিশ্বাস, বৈঠকের সভাপতি ছাড়া আর কেউই সব বক্তৃতা শোনেননি। তবে প্রতি বৈঠকের শেষে রাষ্ট্রপুঞ্জের বেতার-টীকাকার প্রতি বক্তৃতার সারাংশ শ্রোতাদের শুনিয়ে দেন।
বক্তৃতাগুলো যে শোনবার মতো ছিল যে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। আমাদের শ্ৰীযুত আর্থার লালও উত্তম বক্তৃতা দেন। সংযত কণ্ঠে, উত্তম উচ্চারণে এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রতি পরিপূর্ণ সম দেখিয়ে। তবে এ সম্বন্ধে শ্ৰীযুত আলভা যা বলেছেন সেটাও সম্পূর্ণ ভুল নয়। যেখানে স্বয়ং আইসেনহাওয়ার এবং বৃহৎ বৃহৎ রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী তথা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আপন আপন দেশের হয়ে কথা বলেন, সেখানে শ্ৰীযুত লালের পদমর্যাদা কিঞ্চিৎ অপর্যাপ্ত বলে প্রতীয়মান হওয়া বিচিত্র নয়। সোজা বাংলায়, অনেক সময় ধারের চেয়ে ভারেই কাটে বেশি।
কূটনৈতিকরা সর্বক্ষণ কুটিল কথা বলেন, বক্তৃতা শুনে এ বিশ্বাস আমার ভাঙল। বস্তুত এদের ভিতর অনেকেই ছিলেন গভীর দার্শনিক। ইরাক-জর্ডান-লেবাননের খেই ধরে এঁরা বিশ্বশান্তি সম্বন্ধে উৎকণ্ঠিত চিন্তা করেছেন এবং বারবার সেই সিদ্ধান্তেই উপস্থিত হবার চেষ্টা করেছিলেন যে, শান্তির জন্য কীভাবে জনমত দৃঢ়তর করা যায়, কোন নীতি অবলম্বন করলে আজ-এখানে কাল-সেখানে অশান্তিবহ্নি প্রদীপ্ত হয়ে উঠবে না। বিশ্বজন যে এঁদের আলোচনা উদগ্রীব হয়ে শুনছে এ সম্বন্ধে তারা বিলক্ষণ সচেতন ছিলেন। বস্তুত একদিন বৈঠক বসতে ১১ মিনিট দেরি হওয়ায় সভাপতি বলেন, বিশ্বজন যখন আমাদের আচরণের প্রতি একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে, তখন আমাদের আরও সাবধান হওয়া উচিত।
আইসেনহাওয়ার কোনও প্রস্তাব উত্থাপন করেননি। তিনি অনেকটা আসামির মতো সাফাই গাইলেন, আমরা লেবানন ত্যাগ করতে সর্বদাই প্রস্তুত যদি লেবানন সে ইচ্ছা জানায় কিংবা অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে যায়।
তাই রাষ্ট্রপুঞ্জের রইল দুটি প্রস্তাব–
১। রুশের পক্ষ থেকে : কালবিলম্ব না করে মার্কিনিংরেজ মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরে পড়ক।
২। নরওয়ে এবং অন্য কয়েকটি রাষ্ট্রের প্রস্তাব : সমস্ত ব্যাপারটা রাষ্ট্রপুঞ্জের সেক্রেটারি-জেনারেল মি. ডা হামারশেলটের হাতে ছেড়ে দেওয়া হোক। সৈন্য সরানোর কর্তব্যাকর্তব্য বিবেচনা করবেন তিনি।
এ প্রস্তাবে সৈন্য সরানোর পুরো ভরসা নেই, তবে প্রস্তাবকরা বলেন, যেহেতু আইসেনহাওয়ার বিশেষ শর্ত প্রতিপালিত হলে সৈন্যাপসারণে প্রস্তুত তখন সেক্রেটারি জেনারেলের কার্যকলাপ ওই দৃষ্টিবিন্দু থেকেই পরিচালিত হবে। সৈন্য অপসারণের খানিকটে ভরসা এতে পাওয়া গেলেও কবে সেই শুভকর্মটি সমাধান হবে, এ সম্বন্ধে কোনও হদিস মূল প্রস্তাব কিংবা তার টীকাতে পাওয়া গেল না। স্পষ্ট বোঝা গেল, এ প্রস্তাবের পশ্চাতে রয়েছেন মার্কিনিংরেজ এবং তাদের খয়েরখারা।
এ দুই প্রস্তাব নিয়ে যখন পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা হচ্ছে তখন শোনা গেল, এশিয়য়া-আফ্রিকি রাষ্ট্রগুলো একটি তৃতীয় আপোসি প্রস্তাব সম্বন্ধে চিন্তা করছেন। তার মূল্য উদ্দেশ্য হবে, সৈন্য সরানো হোক– অ্যাট অ্যান আর্লি ডেট, কূটনৈতিক ভাষায় কী বোঝায় তা জানেন শুধু ভাবগ্রাহী জনার্দন। কারণ কথিত আছে, কোনও ডিপ্লোমেট যখন বলেন নো তার সোজা অর্থ পারহ্যাপস্; যখন তিনি বলেন পারহ্যাপস তখন তার সোজা অর্থ হ্যাঁ; এবং তিনি যদি কখনও বলেন হ্যাঁ, তা হলে বুঝতে হবে তিনি ডিপ্লোমেট নন।
তখন দেড় দিনে গোটা পাঁচেক বৈঠক হয়েছে মাত্র, এমন সময় মধ্যপ্রাচ্যের তাবৎ আরব রাষ্ট্র একজোট হয়ে সবার মাঝখানে ফাটাল এক বিরাট বম্। সৈন্য অপসারণ সম্পর্কে তারা নাকি সবাই একটি প্রস্তাবে সম্মত আছেন– এবং জর্ডন ও লেবাননও নাকি তাতে আছেন! প্রস্তাবটি নাকি ইতোমধ্যে গিয়েছে আরবদের ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রের আপন আপন রাজধানীতে। তাদের প্রধানমন্ত্রীরা সম্মতি জানালেই প্রস্তাবটি রাষ্ট্রপুঞ্জের বৈঠকে পেশ করা হবে।
বৈঠকে তখন লেগে গেল ধুন্দুমার! যাদের নিয়ে এত শিরঃপীড়া তারাই যদি একমত হয়ে কোনও প্রস্তাব পেশ করে তবে অন্যদের আর ফপরদালালি করবার রইল কী? উত্তট সঙ্কটটা দেখা দিয়েছে লেবানন আর জর্ডন বাইরের সাহায্য চাইল বলে; তারা যদি শত্রুর সঙ্গে যোগ দিয়ে বলে তারা নিশ্চিন্ত, তখন মার্কিনিংরেজেরই বা বলবার রইল কী, রুশের হুঙ্কারও তো অর্থহীন।
