তুর্কি আরব-ভূখণ্ডের অংশ নয়, তুর্কির মাতৃভাষা ওমানলি-তুর্কি ভাষা কিন্তু যেহেতু তুর্করা মুসলমান এবং বহুযুগ ধরে আরব ও মিশরের ওপর রাজত্ব করেছে তাই আরবের ভবিষ্যতের সঙ্গে তার ভবিষ্যৎও বিজড়িত। অবশ্য তুর্কির সবচেয়ে কঠিন শিরঃপীড়া রুশকে নিয়ে। রুশের ভয়ে শেষপর্যন্ত সে মার্কিনের শরণ নিয়েছে। রুশ কৃষ্ণসাগরে নৌবাহিনীর মোহড়া দেবে এ খবর বৃহস্পতিবার দিনে রাষ্ট্র হয়। মার্কিন সৈন্যও ওই সময়ে তুর্কিতে নামে।
তা হলে মোটামুটি দাঁড়াল এই :
জর্ডন, ইসরাইল ও তুর্কি মনেপ্রাণে মার্কিন সাহায্য চায়। ইসরাইলের সবাই চায়; জর্ডনের জনগণ খুব সম্ভব চায় না কিন্তু রাজা চান; লেবাননের কর্তৃপক্ষ চান কিন্তু বিদ্রোহীরা অবশ্যই চায় না, তুর্কির অধিকাংশ লোক অনিচ্ছায় চায়। সিরিয়া, ইরাক ও মিশর মার্কিন-ইংরেজকে তাড়াতে চায়। রুশের সাহায্য কতখানি প্রত্যাশা করে বলা কঠিন। জীবনমরণ সমস্যা হয়ে দাঁড়ালে যে রুশকে আমন্ত্রণ জানাবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিম্বা রুশ নিজের থেকেই নামতে পারে। বিশ্ব-কম্যুনিস্ট রুশের দিকে তাকিয়ে আছে সে গণতান্ত্রিক এবং স্বাধীনতাকামীদের সাহায্য করে কি না, কাজেই শেষপর্যন্ত হয়তো তাকে অনিচ্ছায়ই নামতে হবে। অনিচ্ছায় এই কারণে বললাম যে যুদ্ধ-বিশারদ পণ্ডিত ক্লাউজেঞ্জিস বলেছেন, সংগ্রামে নামবে তোমার সুবিধামতো পছন্দমাফিক সময়ে শত্রুর আহ্বানে নয়। আমেরিকা হয়তো স্থির করেছে, রুশের আর শক্তিবৃদ্ধি হতে দেওয়া নয়, এইবারেই লড়ে নেওয়া ভালো। রুশ হয়তো ভাবছে, এখনও আমার সময় হয়নি।
প্রত্যক্ষত তো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি সঙ্কটের পাত্র উপচে পড়ল ইব্রাক নিয়ে। সেখানে ইংরেজের তেলের স্বার্থ কিন্তু এ-সম্পর্কে ইংরেজের রাজনৈতিক বুদ্ধির তারিফ না করে থাকা যায় না। সুয়েজ কানালের ব্যাপারে ইংরেজ তো আমেরিকাকে নামাতেই পারল না, বরঞ্চ বিশ্বজনের নির্মম কটু-কাটব্য শুনতে হল, পরাজয়ও মানতে হল। এবারে ইংরেজ প্রথমে নামাল মার্কিনকে, নিজে নামল পরে। তবে ভয় হয়, ভালোয় ভালোয় সবকিছু মিটে যাবার পর হয়তো মার্কিনরা ইরাকের তেলের বখরা চেয়ে বসবে। বাঙলায় বলি, ফেলো কড়ি মাখো তেল। এ ক্ষেত্রে হবে ফেলো তেল, পাবে না কড়ি।
বাগদাদের এ-বিপ্লব অনেকদিন আগেই হওয়া উচিত ছিল। নূরি অস্-সঈদ (সৈয়দ নয়) ত্রিশ বৎসর ধরে যে রাজনীতি চালিয়েছেন তার মধ্যে তার ইংরেজ-প্রীতিই যে সবচেয়ে নিন্দনীয় ছিল তা নয়। কিন্তু সভ্যতার যে প্যাটার্নের তিনি ইচ্ছা-অনিচ্ছায় প্রতিভূ ছিলেন সেটা সামন্তবাদ প্যাটার্ন। ইংরেজের কাছে তেল বিক্রি করে যে পয়সা আসত সেটা সামন্তবাদের খপ্পরেই চলে যেত। ওদিকে ভিতরে ভিতরে জনসাধারণ নূরি এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গ নেতাদের চেয়ে প্রগতিচিন্তায় অনেক বেশি এগিয়ে গিয়েছিল। তবু নূরি হয়তো সামলে নিতে পারতেন যদি-না তিনি ছোটা ডিকটেটরি স্টাইলে শুধু রাজার সাহায্যে দেশ না চালাতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর জনসাধারণ কতখানি এগিয়ে গিয়েছে তিনি বুঝতে পারেননি। এ প্যাটার্নটা মিশরের সঙ্গে মিলে যায়। ওয়াফ দলের নেতা এবং রাজা ফারুকও বুঝতে পারেননি মিশরীয় ফল্লাহ (চাষা) কতখানি এগিয়ে গিয়েছে। ফলে রাজা সিংহাসন হারালেন, ওয়াফদের অস্তিত্ব লোপ পেল।
কিন্তু দুঃখের বিষয় মিশর এবং ইরাকে গণ-আন্দোলনের নেতৃত্ব করল আর্মি অফিসাররা। প্রকৃত গণ-আন্দোলনে দেশের সেনানীও যোগ দেবে এ তো ন্যায্য কথা কিন্তু আর্মি-অফিসারদের নেতৃত্বে এবং মোল্লা-পুরুতের নেতৃত্বে কোনও তফাৎ নেই। এদের কেউই সত্যকার গণতন্ত্র চায় না। ডিসিপ্লিন, শাস্ত্রাধিকারের দোহাই কেড়ে এরা জনসাধারণের গণতান্ত্রিক মর্যাদা ও অধিকার পদে পদে খণ্ডন করতে চায়।
আমরা শান্তিকামী, এবং পণ্ডিতজি বাগদাদ সম্পর্কে যা বলেছেন তা যে বাগদাদের চিত্ত জয় করতে সক্ষম হবে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কাল রাত্রে বাগদাদ বেতার পণ্ডিতজির সম্পূর্ণ উক্তিটি একাধিকবার প্রচার করেছে– শ্রদ্ধার সঙ্গে।
[আনন্দবাজার পত্রিকা, জুলাই ১৯৫৮]
.
মরূদ্যান না মরীচিকা?
১৪ জুলাই ইরাকে যে রাষ্ট্রবিপ্লব হল তাই দিয়ে ব্যাপারটার আরম্ভ নয়। এর কিছুদিন পূর্বেই লেবাননের প্রেসেডিন্ট রাষ্ট্রপুঞ্জকে জানান যে, তাঁর দেশে যে অল্পস্বল্প বিদ্রোহ দেখা দিয়েছে তার পিছনে প্রতিবেশী রাষ্ট্র সিরিয়ার প্ররোচনা এবং অস্ত্রশস্ত্রের সাহায্য রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপুঞ্জ লেবাননে কয়েকজন পরিদর্শক পাঠান এবং এঁরা যখন তদারকিতে ব্যস্ত এমন সময় ফাটল ইরাকি বোমা! প্রেসিডেন্ট শামুন তখন রীতিমতো ভয় পেলেন, কারণ ইরাক যে সিরিয়ার সঙ্গে যোগ দিয়ে লেবাননকে আরও বিপদে ফেলবে, সে সম্বন্ধে তার মনে কোনও দ্বিধা ছিল না। বস্ত্রাকর্ষিতা দ্রৌপদীর ন্যায় তিনি তখন গোপীজনবল্লভ শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করলেন। অন্তত তাই করলে ভালো হত। তিনি স্মরণ করলেন মার্কিনিংরেজকে। ফলে মার্কিন সৈন্য নামল লেবাননে এবং ইংরেজ গেল তারই দোসর জর্ডনে।
সঙ্গে সঙ্গে রুশ উদ্ধত এবং অকুণ্ঠ ভাষায় বলল, কর্মটি সর্বশাস্ত্রবিরুদ্ধ। রাষ্ট্রপুঞ্জ যখন তার পরিদর্শক মারফতে লেবাননের তদারকিতে লিপ্ত তখন রাষ্ট্রপুঞ্জের অন্য কোনও সদস্যকে কিছুমাত্র না জানিয়ে এরকম সৈন্য নামানো বিশ্বশান্তি নষ্ট করা ছাড়া অন্য কিছু নয়।
