ইংরেজ তখন প্যালেস্টাইনে ইহুদিদের এনে সেখানে সাম্রাজ্যবাদীর ঘাটি নির্মাণে তৎপর হল।
***
এই তাবৎ ঘাত-প্রতিঘাতের ভিতর মধ্য আরবিস্তানের ঊষর মরুভূমি নেজুদের ওয়াহহাবি (সিপাহি বিদ্রোহের পূর্বে বাঙলা দেশের স্বাধীনতাকামী বীর দুদু মিয়া ও তীতু মীর দুজনাই ওয়াহহাবি ছিলেন) রাজা ইবনে সউদ তার সুযোগের প্রহর গুনছিলেন। এই সউদি বংশ শরিফের হাশিমি বংশের জন্মশত্রু। মক্কার শরিফ যখন ইংরেজের তাঁবুতে চলে যাওয়ায় মক্কাও কার্যত খ্রিস্টানদের হাতে চলে গেল তখন কাবা ই ডেনজার এই মর্মভেদী বাণী প্রচার করে তিনি আরব বেদুইনদের এক ঝাণ্ডার নিচে জমায়েত করে চললেন মক্কার উদ্দেশ্যে। শরিফ প্রমাদ গুণে তারস্বরে ইংরেজের সাহায্য চাইলেন। ইংরেজের তখন দু হাত ভর্তি। সে কোনও সাহায্য করতে পারল না। স্বাধীন রাজা ইবনে সউদ মক্কা-মদিনার রাজা হলেন। বিশ্ব-মুসলিম আশ্বস্ত হল।
সমস্ত আরবভূমি যায় যায় দেখে ইংরেজ তখন জর্ডন ও ইরাকে দুই হাশিমি রাজ্য বসাল। আবদুল্লাকে জর্ডনে ও ফৈসলকে ইরাকে। ইরাকের শেষ রাজা এই ফৈসলের পৌত্র।
.
২
মিশর দেশ যদিও আফ্রিকায় অবস্থিত ও সেখানকার আরব ঔপনিবেশিকদের সঙ্গে দেশীয় রক্তের প্রচুর সংমিশ্রণ হয়েছে তবু সেখানকার ভাষা আরবি, জনসাধারণ প্রধানত মুসলমান এবং সবচেয়ে বড় কথা কাইরোর অল-অজুহর বিশ্ববিদ্যালয় পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন শিক্ষাকেন্দ্র। ইরাক, লেবানন, সিরিয়া এমনকি ইসলামের জন্মভূমি মক্কা-মদিনার ছাত্ররাও উচ্চশিক্ষার জন্য অজুহরেই যায়। ভারতীয় ছাত্রদের জন্যও সেখানে বিশেষ হোস্টেল আছে। মক্কাতে যেরকম হজের সময় বিশ্ব-মুসলিম নানারকমের রাজনৈতিক মতবাদে তালিম পায়, কাইরোতে ঠিক সেইরকম সম্বত্সরই রাজনৈতিক চর্চা হয়। তদুপরি নাইল-প্লবিতা মিশরভূমি অর্থশালিনীও বটেন।
কাজেই মিশরকে আরব-ভূখণ্ডের অংশ বলেই ধরে নিতে হয়। এবং তা হলে উপস্থিত এ-ভূখণ্ডে চারিটি শক্তি বিরাজমান।
১। মিশর। এর জনসাধারণ ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের তিক্ত আস্বাদ প্রচুর পেয়েছে। তবু তারা সহজে যে কোনও রাজনৈতিক দলে ভিড়ছে তা নয়, প্রায় বাধ্য হয়েই তাকে রাখার সঙ্গে কিঞ্চিৎ মিতালি করতে হয়েছে।
২। সউদি আরব। মিশরের সঙ্গে তার দৃশ্যমান কোনও শত্রুতা না থাকলেও সউদি আরবও বিশ্ব-মুসলিমের কেন্দ্রভূমি হতে চায় ও সে-স্থলে মিশরের সঙ্গে তার শক্রতা না থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে। রাজনৈতিক অর্থনৈতিক প্রগতির দৃষ্টিবিন্দু থেকে দেখতে গেলে এ ভূমি সবচেয়ে পশ্চাৎপদ। আমেরিকাকে তেল বিক্রি করে এরা প্রচুর পয়সা কামায় বলে এরা কিছুটা মার্কিন-ঘেঁষা। কিন্তু সুযোগ পেলে মার্কিনকে ঝেড়ে ফেলে নিজের তেল নিজেই বিক্রি করার চেষ্টা করলেও করতে পারে। এদের বংশগত শত্রুতা কিন্তু হাশিমিদের সঙ্গে অর্থাৎ জর্ডন ও ইরাকের রাজপরিবারের সঙ্গে।
৩। হাশিমি পরিবার। এঁদের একজন এখনও জর্ডনের রাজা। অন্যজনের রাজত্ব গেছে এবং বাগদাদ বেতারকেন্দ্র আজকাল অতি গর্বের সঙ্গে জমহুরিয়াতুল ইরাকিয়া অর্থাৎ ইরাক রিপাবলিক বলে আত্মপরিচয় অভিজ্ঞানবাণী প্রচার করে ও সমস্ত রাত ধরে রবুল-আম অর্থাৎ জনগণ অধিনায়কের প্রশস্তি গায়। এই রব্দুল-আম সমাসটি আমি ইতোপূর্বে কখনও শুনিনি। সাধারণত আল্লার প্রশস্তি গাওয়ার সময় বলা হয়, রব্দুল আলিমিন (দুই ভুবনের দৃশ্য ও অদৃশ্য অধিনায়ক), কিম্বা রব্দুল মুসলিমিন (মুসলিমদের অধিনায়ক) কিম্বা ওই জাতীয় কিছু একটা।
৪। সিরিয়ার গণতন্ত্র। খাস আরব-ভূখণ্ডে একা বলে (লেবানন যদিও রিপাব্লিক তবু সেখানকার খ্রিস্টান-প্রাধান্য দুই গণতন্ত্রের সৌহার্দ্যের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সে মিশরের সঙ্গে মিলে গিয়ে যুক্তগণরাষ্ট্র নির্মাণ করেছিল। সিরিয়াতে রুশ-প্রাধান্য বেশকিছুটা আছে এবং পাঠকের স্মরণ থাকতে পারে সুয়েজ-সঙ্কটের সময় সিরিয়া রাশাকে তার দেশে জঙ্গিবিমান অবতরণ করতে দেয়। বর্তমানে ইরাকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়াতে সিরিয়ার শক্তি বৃদ্ধি হল।
রাষ্ট্র হিসেবে লেবানন এদের থেকে একটু আলাদা থাকে। লেবাননের খ্রিস্টান-প্রাধান্য তার অন্যতম কারণ। আধুনিক ইয়োরোপীয় শিক্ষাদীক্ষায় কিন্তু ইসরাইলের পরেই তার স্থান। ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকানরা এখানে একটি কলেজ খোলে ও পরে সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। এদের প্রকাশিত বহু আরবিপুস্তক প্রাচ্যপ্রতীচ্যে যশ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে জেসুইটরাও আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয় খোলে। এসব সত্ত্বেও লেবাননে রাজনৈতিক ঐক্যসাধন করা কঠিন। খ্রিস্টান ও মুসলমানের সংখ্যা যদিও প্রায় সমান তবু খ্রিস্টানরা দুই সম্প্রদায়ে বিভক্ত, মুসলমানরাও প্রায় সমান সমান শিয়া-সুন্নিতে বিভক্ত এবং তার ওপর দ্রুজ মুসলমানরাও রয়েছে। আমেরিকানরা যখন বলে, তাদের লেবাননে নামার অন্যতম উদ্দেশ্য সেদেশের খ্রিস্টানদের রক্ষা করা তখন সেটা নিছক মিথ্যা নয়। যদিও ধর্মের জন্য ব্যাপক খুনোখুনি সেখানে হয়েছে বলে জানিনে। বরঞ্চ দ্রুজ মুসলিমদের ওপর সুন্নি মুসলমানদের প্রচুর আক্রোশ বহুযুগ ধরে বর্তমান।
আরবরা ইসরাইলকে আরব-ভূখণ্ডের অংশ বলেই ধরে এবং সুযোগ পেলে ইহুদিদের যে সমূলে বিনাশ করবে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু বলতে গেলে ইসরাইলই এখন আরবভূমির সর্বশ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তি। ইসরাইল তার প্রাণের মায়ায় মার্কিন-ইংরেজের ওসম্পূর্ণ নির্ভরশীল এবং এক লেবানন ছাড়া আর সকলেই তার জানের দুশমন।
