ইরাকের বর্তমান রাষ্ট্র-বিপ্লবের পরিপূর্ণ ইতিহাস দিতে হলে হজরত মুহম্মদ সাহেবকে দিয়ে আরম্ভ করতে হয়, এবং তার সরল অর্থ সৈয়দ আমির আলী কৃত হিস্ট্রি অব দি সেরাসি পুস্তকখানা সম্পূর্ণ পুনরাবৃত্তি করে আরও একটি নতুন ভম তার সঙ্গে জুড়তে হয়। সংবাদপত্র তার জন্য প্রশস্ত নয়, অতএব যেটুকু না বললেই নয় সেটুকু সংক্ষেপে সমাধা করি।
মহাপুরুষ মুহম্মদ ও তার শিষ্যগণের সময় মদিনা ছিল আরব-ভুবনের কেন্দ্রভূমি। পরবর্তী যুগে দামাস্ক (দিমিক শামের রাজধানী), তার পর বাগদাদ এবং সর্বশেষ ইস্তাম্বুল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর (এ-দেশে যখন খিলাফত আন্দোলন আরম্ভ হয়) খলিফার সঙ্গে মুসলিম-জগতের কেন্দ্রভূমি লোপ পায়। এরপর রাজা ইবনে সউদ মক্কাকে কেন্দ্রভূমি করার চেষ্টা করে নিষ্ফল হন এবং অধুনা নজিব-নাসির কাইরোকে মুসলিম জাহান না হোক আরব-ভুবনের কেন্দ্রভূমি করার চেষ্টা করছেন। সউদি আরব অবশ্য এ চেষ্টা এখনও ছাড়েনি, কারণ হাজার হোক এখনও প্রতি বৎসর পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মুসলমান নরনারী হজ করতে মক্কা যায় এবং কুরান শরিফে মক্কাকেই ইসলামের কেন্দ্রভূমি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নাসির আর যা-খুশি তাই করতে পারেন, কিন্তু নামাজ পড়ার সময় তাকে মক্কার দিকেই মুখ করতে হয়।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, মধ্যপ্রাচ্যে যে তুমুল হট্টগোল লেগেছে, যার পানে পৃথিবীর ক্ষুদ্র-বৃহৎ তাবৎ রাষ্ট্র মায় মার্কিন-রুশ– একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে, সে সম্বন্ধে সউদি আরব কোনও উচ্চবাচ্য করছে না। হয়তো সে ভাবে মার্কিনের সঙ্গে লড়াই করে এরা সব নিঃশেষ হয়ে যাক– বিশেষ করে নাসির–তা হলে তার পর আমি আরব-মিশরের ওপর রাজত্ব করব। এ অভিলাষ যে ভ্রমাত্মক সে কথা আর বুঝিয়ে বলতে হবে না। কারণ মার্কিন যদি নাসির-মতবাদকে ধ্বংস করে তবে তাকেও একদিন ওই একই বিপদের সম্মুখীন হতে হবে। সে কথা পরে হবে।
***
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে তাবৎ আরবভূমি তুর্কির খলিফার হুকুমে চলত। এমনকি মক্কার শরিফ (পবিত্র কৃষ্ণপ্রস্তর কাবার রক্ষাকর্তা) হজরত মুহম্মদের কুরেশ বংশধর হাশিমি-প্রধানকেও (এই হাশিমি বংশেরই দুই প্রধান যথাক্রমে বর্তমান ইরাক ও জর্ডনের রাজা) তুর্কি খলিফার হুকুমমতো চলতে হত। যুদ্ধ লাগার পর ইনি ইংরেজের সাহায্যে নিজেকে স্বাধীন রাজা বলে ঘোষণা করেন। এটাকে কিন্তু বিদেশি তুর্কের আধিপত্য থেকে আরবের মুক্তিপ্রয়াসের ন্যাশনালিজম নাম দিলে ভুল করা হবে, যদিও এই জিগির তুলেই শরিফ হুসেন আরবদের কিছুটা সমর্থন পেয়েছিলেন। আসলে এটা ডাইনেস্টিক বা রাজবংশের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা। মূলত অবশ্য এর পিছনে ছিল ইংরেজ। যারা লরেনসের সে পিলার অব উইজডম্ পড়েছেন, বাকি কাহিনী তাদের আর বলতে হবে না। এই শরিফগোষ্ঠী এবং তাদের সাঙ্গোপাঙ্গ ইংরেজের সাহায্যে তুর্কির প্রচুর ক্ষতি করতে পেরেছিল বটে, কিন্তু তুর্কির যুদ্ধে পরাজয় যে প্রধানত ওই কারণেই হয়েছিল একথা আজও কেউ বলেনি।
আরব জয়চন্দ্র এই যে খাল কেটে ঘরে কুমির আনলেন, তারই খেসারতি সম্পূর্ণ আরবভূমিকে আজও চোখের জলে নাকের জলে দিতে হচ্ছে। লাভের মধ্যে তাঁর এক বংশধর এখন জর্ডনের টলটলায়মান সিংহাসনে বসে তারই প্রপিতামহের স্মরণে ইংরেজকে ডাকছেন এবং অন্যজন নাকি এসবের অতীত হয়ে অন্য লোকে চলে গিয়েছেন। কিন্তু এসব পরের কথা।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর হাশিমিগোষ্ঠী অবাক হয়ে দেখে, সেল ডিটারমিনেশন অব দি পিপল, জনগণের স্বরাজলাভ ইত্যাদি জিগির তুলে যে পাশ্চাত্য শক্তিপুঞ্জ হাশিমি তথা আরবদের কিয়দংশ তুর্কির বিরুদ্ধে তাতিয়েছিল, তারাই তাবৎ আরবভূমি গ্রাস করে বসে আছে। এমনকি মক্কার শরিফ হুসেনকেও নাকি বলতে হবে, তিনি এখন আর তুর্কির খলিফার মনোনীত প্রতিনিধি নন, এখন তিনি ইংলন্ডের (খ্রিস্টান!) রাজার প্রতিনিধি হয়ে মুসলমানের পুণ্যভূমি মক্কা-মদিনার তদারকি করবেন! অর্থাৎ ইস্তেক কাবা পর্যন্ত খ্রিস্টানের তবেতে চলে গেল! মহাপুরুষ মুহম্মদের পরে এ দুর্দৈব ঘটল এই প্রথম। বিশ্ব-মুসলিমের জিগরে তাতে কতখানি চোট লেগেছিল, সেকথা আর বর্ণনা দিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। এ-দেশে পর্যন্ত তার ঢেউ এসে যে খেলাফতি আন্দোলনের উচ্ছ্বাস জাগিয়ে তুলেছিল সেকথা বয়স্কদের স্মরণে থাকার কথা।
কিন্তু ইংরেজ করল ব্যাকরণে সামান্য একটি ভুল। আরবভূমি ভাগাভাগি করার সময় ফ্রান্সকে দিল শিকার-করা হরিণের ন্যাজটুকু অর্থাৎ সিরিয়া। ফ্রান্স গেল ভয়ঙ্কর রেগে। কিন্তু ওই নিয়ে তো আর আরেকটা বিশ্বযুদ্ধ বাধানো যায় না। ফ্রান্স লেগে গেল দাদের সন্ধানে।
ইতোমধ্যে মুস্তাফা কামাল পাশা তুর্কি থেকে ইংরেজ আধিপত্য সরাবার জন্য লাগালেন লড়াই। ফ্রান্স বিষমোল্লাসে, অবশ্য গোপনে, সিরিয়ায় সঞ্চিত তার অস্ত্রশস্ত্র দিল মুস্তাফা কামালের হাতে তুলে। লয়েড জর্জ তুর্কির ইংরেজ সৈন্যদের বাঁচাবার জন্য বিশ্ব-খ্রিস্টানকে আহ্বান করলেন। ফ্রান্স তো গোপনে কামালকে সাহায্য করছেই আমেরিকাও ততদিনে কেটে পড়েছে–কেউ সাহায্য করল না। ইংরেজসৈন্য তুর্কি ছেড়ে পালাল। কামাল নয়ি তুর্কি গড়ে তুললেন। সঙ্গে সঙ্গে সিরিয়াও পূর্ণ স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে গেল।
