এইখানটায় এসে কম্যুনিস্টরা একটু বিপদে পড়েন। কম্যুনিস্টদের আপ্তবাক্য, তাদের বেদ-বাইবেল-পুরাণ হল মার্কস সায়েবের কেতাব। তাতে স্পষ্ট লেখা রয়েছে, ক্যাপিটালিজমের আসল ধর্ম হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, মাৎস্যন্যায়। যত দিন যাবে মারামারি খুনোখুনি করবে তারা তত বেশি। একে অন্যকে বিনাশ করে শেষটায় তারা সকলেই সমূলে বিনষ্ট হবে অর্থাৎ ক্যাপিটালিজম তখন শিব হয়ে গেল। সেই শোনে তখন ফুটে উঠবে ক্যুনিজমের রসমঞ্জরী। কিন্তু গত লড়াইয়ের সময় দেখা গেল, ক্যাপিটালিস্ট দেশগুলো দিব্য একজন আরেকজনের সহযোগিতা করল, শুধু তাই নয়, শ্রেণিতে শ্রেণিতে যে দ্বন্দ্ব শান্তির সময় উগ্র হতে উগ্রতর হতে চলছিল সেই দ্বন্দ্ব লড়াইয়ের সময় উগ্রতম না হয়ে সব শ্রেণি এক অদ্ভুত সহযোগিতার পরিচয় দিল। ক্যাপিটালিস্টের বড় গোসই চার্চিলের ডাকে ইংল্যান্ডে চাষা-মজুর যে স্বতঃপ্রবৃত্ত সাড়া দিল, সেরকম ধারা সাড়া স্তালিনকেও আপন দেশে দেখাতে বেগ পেতে হবে।
প্রমাণ হয়ে গেল, অন্তত এই ব্যাপারে মার্কস সায়েবের ভবিষ্যদ্বাণী সফল হল (আরেক ব্যাপারে যে তিনি ভুল বলেছিলেন সেটা হচ্ছে, রুশিয়াতে সর্বপ্রথম মজুররাজ বসতে পারে তা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি কিন্তু সে প্রস্তাব এখানে অবান্তর), এবং এই প্রমাণটি অতি প্রাঞ্জল ভাষায়, আধুনিকতম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সপ্রমাণ করে দিলেন রুশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক পণ্ডিত ভাগা সায়েব! মস্কোর বুকের উপর বসে রুশিয়ার সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক জ্ঞানকেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে তিনি যখন এই মার্কসদ্রোহী কাফির ফতোয়াখানা ছাড়লেন তখন স্বয়ং স্তালিন দিশেহারা হয়ে গেলেন।
বেদনাটা এইখানেই। কম্যুনিস্টরা কখনও আঁচতে পারেনি যে, ক্যাপিটালিস্টদের ভিতরে এখনও এতটা প্রাণশক্তি রয়েছে যে, তারা এখনও বাঁচতে জানে, অর্থাৎ বিপদ সামনে দেখলে তারা আর দিশেহারা হয়ে মারামারি করে লাইফবোটটাকে ভেঙে তো ফেলেই না, এমনকি প্রাণ বিসর্জন দিয়ে, সহযোগিতা করে, আসল জাহাজখানাকেই ফের চালু করে তোলে। তারাও প্ল্যান-মাফিক কাজ করতে শিখে গিয়েছে। এই প্ল্যানের নামই মার্শাল প্ল্যান।
[ দৈনিক বসুমতী]
.
আরব্য-রজনীর অরুণোদয়
১
আরব্য উপন্যাসের কৃপায় বিশ্বজন খলিফা হারুন অর-রশিদের বাগদাদ চেনে। মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদসিন্ধু একদা বাঙালি মাত্রেই পড়ত এবং সেই সূত্রে ফুরাৎ (ইউফ্রেটিস), কারবালা এবং কুফা নগরী, বাগদাদ শহরের সঙ্গে সুপরিচিত ছিল। ইদানীং মোটরগাড়ি চালু হওয়ার ফলে অনেকেই পেট্রোলের খবর রাখেন এবং ইরানের মুসাদ্দিক যখন আপন পেট্রোল আপন ঘরে তুলতে চাইলেন, তখন সেই সূত্রে অনেকেই ইরাকের তেলের খবরও পেলেন। বাস্তিল পতনের দিন বাগদাদে যে রাষ্ট্র-বিপ্লব আরম্ভ হয়েছে, তার পিছনে রয়েছে এই স্নেহ বা তেলের উৎস– যদিও সেটা এখন রণ-দামামার অউরবের নিচে চাপা পড়ে গিয়েছে।
আরবভূমি (জজিরাতু–অরবিয়া) ইরাক (প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মেসোপটেমিয়া নামে পরিচিত), সিরিয়া (অশ-শাম বা শাম– শামিকাবাব যেখান থেকে এসেছে), লেবানন (লুবনান), ট্র্যান্স-জর্ডন বা শুধু জর্ডন (উরদুন), সউদি আরব (মক্কা-মদিনা নিয়ে হিজাজ এবং মধ্য আরবের নেজুদ নিয়ে এ রাষ্ট্র গঠিত), ইয়েমেন (ইয়েমেন শব্দের অর্থ আরবিতে দক্ষিণ ও শাম্ অর্থ উত্তর– অর্থাৎ আরবভূমির দক্ষিণ এবং উত্তর সীমানা) ও প্যালেস্টাইন নিয়ে সম্পূর্ণ আরব ভূখণ্ড। এ-ছাড়া আদন বন্দর অঞ্চলের এডেন প্রটেকটরেট হাদ্ৰামুত, ওমন, কুয়েৎ প্রভৃতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রদেশ আছে এবং এসব জায়গায় ইংরেজের প্রাধান্য!
(আদনের ঠিক সামনেই সোকোত্রা দ্বীপ। একদা এ দ্বীপ ভারতবর্ষের অধিকারে ছিল। সোকো নাকি সংস্কৃত সুখাধার শব্দ থেকে এসেছে।)
আরবভূমির ৯৫ থেকে ৯৮ জন লোক মুসলমান এবং এদের ভাষা আরবি। কিন্তু লেবাননের শতকরা ৫৩% লোক খ্রিস্টান এবং বিপদে পড়লেই পশ্চিমের খ্রিস্টানদের কাছে সাহায্য চায়। অবশ্য এদের ভিতরও বেশকিছু জাতীয়তাবাদী আছে, যারা দেশের ঝগড়াঝাটির ভিতর বিদেশির আগমন পছন্দ করে না। খ্রিস্টানদের মাতৃভাষাও আরবি। রাষ্ট্রের নেতা সাধারণত খ্রিস্টানই হয়ে থাকেন ও প্রধানমন্ত্রী মুসলমান।
১৯১৪ সাল অবধি প্যালেস্টাইনের শতকরা নব্বই থেকে পঁচানব্বই জন অধিবাসী ছিল মুসলমান, বাদবাকি খ্রিস্টান এবং ইহুদি। এখন অবস্থার সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে।
এই দুই অতি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র বাদ দিলে তাবৎ আরবভূমি ইসলামের অনুপ্রেরণায় চলে। কিন্তু খ্রিস্টান আরবদের জাতীয়তা আন্দোলনে আকর্ষণ করার জন্য অনেক সময় ধর্মনিরপেক্ষ প্রপাগান্ডা চালানো হয়। ইদানীং সিরিয়া ও বাগদাদে কম্যুনিস্ট মতবাদ প্রচারিত হওয়ার পর এই ধর্মনিরপেক্ষতা আরও জোর পেয়েছে। সোমবার রাত্রে বাগদাদ বেতার কেন্দ্র যে আনন্দোল্লাস করছিল, তাতে ঘন ঘন আল্লাহু আকবর (আল্লা সর্বমহান) ধ্বনি হুঙ্কারিত হলেও সমগ্র আরবভূমির ইসলামি ঐক্য সম্বন্ধে এখনও উচ্চবাচ্য করা হয়নি। বলা বাহুল্য, বাগদাদ-কাইবোর আরব খ্রিস্টানরাও দৈনন্দিন জীবনে ভগবানের নাম স্মরণ করার সময় আল্লাহু আকবর বলে থাকে।
আফ্রিকার মিশরকে যদিও আরবভূমি বলা যায় না, তবু স্মরণ রাখা ভালো যে সেখানকার শতকরা নব্বইজন লোকের ধর্ম ইসলাম ও শতকরা ৯৮ জন (খ্রিস্টান কপটদের নিয়ে) আরবি বলে থাকে। এবং এই মিশরই আরবভূমির নবজাগরণের অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে প্রধানত দৃষ্টান্ত দ্বারা। তাই মিশরকে বাদ দিয়ে জজিরাতুল অরবিয়া সম্বন্ধে কোনও আলোচনা করা যায় না।
