মোকদ্দমার ফাঁকে শাখট সাহেব একখানা প্রামাণিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। বিষয়, মার্শাল প্ল্যান। অসমদ্দেশীয় কোনও দেশি-বিদেশি ভাষায় সেটি অনূদিত হয়নি বলে পাঠকদের সেটি নিবেদন করছি।
শাখটের পেটে বহুৎ এলেম। তাই তার ভাষা এবং বর্ণনশৈলী অতীব সরল। অতলনীয় ভাষায় তিনি যে কটি কথা লিখেছেন, তার সারমর্ম হচ্ছে, হে মার্কিনগণ, মার্শাল প্ল্যান নামক যে দলিলে তোমরা আমাদের দস্তখত চাইছ তার দাম কিছুই নেই– অর্থাৎ তোমাদের মনে যদি ক্ষীণতম আশা থাকে যে, আমরা একদিন এ প্ল্যানের ঋণ পরিশোধ করতে পারব, তবে সে আশা শিকেয় তুলে রাখ। (এ স্থানে পাঠককে স্মরণ করিয়ে দিই যে, একদিন কাইজার যেরকম বেলজিয়ামের সঙ্গে সন্ধিপত্রকে স্ক্র্যাপ অফ পেপার বলেছিলেন, শাট সেই কথাই বলেছেন অপেক্ষাকৃত সংস্কৃত ভাষায়) তার কারণ—
(১) ঋণশোধ করার মতো সোনা আমাদের কাছে নেই, কখনও হবে না। কাজেই সে প্রশ্ন উঠতেই পারে না।
(২) তা হলে তোমরা টাকার বদলে চাইবে তৈরি মাল (finished goods), কিন্তু তা নিয়ে তোমাদের লাভটা কী? তোমরা সে মাল বেচবে কোথায়? আপন দেশে? কিন্তু তোমরা তো নিজেই শিল্পপ্রধান (industrial) দেশ। আমাদের মাল যদি বাজারে ছাড়ো, তবে তোমাদের শিল্প কোণঠাসা হয়ে তোমাদের শিল্পের বিনাশসাধন হবে না? (শাখট বলেননি, কিন্তু আমাদের স্মরণ আছে, ইংরেজ, বিশেষ করে ফরাসি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জর্মনির কাছ থেকে এরকম ফোকটে পাওয়া মাল নিয়ে মহা বিপদগ্রস্ত হয়েছিল)। তবে কি তোমরা আমেরিকার বাইরে পৃথিবীর অন্যান্য বাজারে আমাদের দেওয়া মাল বেচবে; তা হলে সেসব জায়গায় তো প্রথম মার্কিন মাল সরিয়ে তার পর আমাদের মাল চালাতে হবে।
এই কথাটুকু বলে শাট সাদা কালিতে একটা কথা লিখেছেন তার মর্ম আপনাদের আশীর্বাদে আমি ধরতে পেরেছি। তিনি লিখেছেন, বলিহারি তোমাদের বুদ্ধি (এইটুকু সাদা কালিতে), হিটলারও তো ঠিক এই সুবিধেটাই চেয়েছিল। সে-ও তো বলেছিল যে, দুনিয়ার বাজার তোমরা চেপে ধরে বসে আছ। তোমাদের সোনার ধানে সব নৌকো ভরে গিয়েছে, তাকে আদপেই ঠাই দিচ্ছ না এবং শেষটায় হিটলার বাজার পাবার আশায়ই তো তোমাদের সঙ্গে লড়ল। যে বাজার তোমরা লড়াই করে বাঁচালে, সেই বাজার তোমরা খুশ এখতেয়ারে ফ্রি, গ্র্যাটিস অ্যান্ড ফরনাথিং আমাদের হাতে তুলে দেবে?
তার পর শাখট কৌটিল্যের মতো একখানা মোক্ষম তত্ত্বকথা ছেড়েছেন। তিনি বলেছেন, আমেরিকার মতো শিল্পে উন্নত দেশ পয়সা যদি ধার দেয়, তবে ফেরত পাবার আশা করতে পারে একমাত্র সেসব দেশ থেকেই, যারা কাঁচামাল (raw material) বিক্রি করে। কারণ কাঁচামালের প্রয়োজন তোমাদের সবসময়ই থাকবে।
এবং শেষ কথা বলেছেন, অতএব, হে মার্কিনগণ, যদি কিছু ধারার দাও, তবে ওটা দানের মতো করেই দিও। ওর জন্য মনের কোনও কোণে মায়া রেখ না। ও পয়সা কখনওই ফেরত পাবে না।
শাখটের লেখা এ সুসমাচার পড়ে মার্কিনরা কী বলেছেন, তার সন্ধান এখনও পাইনি।
কিন্তু প্রশ্ন এই যে, গাঁটের পয়সা খরচ করে, খাতকের টক-কথা বরদাস্ত করে, জর্মন দানব গড়ে তোলা– এত সব বয়নাকা কেন?
বেদনাটা কোথায়? ভয়টা কিসের?
রুশ বর্গি আসছে। বুলবুলিতে যখন সব ধান খেয়ে ফেলেনি তখন সে ধান পাঠাও বস্তা বস্তা জার্মানিতে। সেখানে জার্মান মুরগি পোষো। তার পর রুশদর্গায় জবাই কর, ফাড়াগৰ্দিশ যখন উপস্থিত হবে।
অবশ্যি জর্মনিও জানে, কার যেন ভালোবাসা, কিসের যেন মুরগি পোষা।
[দৈনিক বসুমতী ]
.
মার্শাল-মার্গ
সুখ-দুঃখ, আশা-নৈরাশ্য, ভালো-মন্দ সংসারের সব জিনিস জোড়ায় জোড়ায় দেখা একরকম লোকের স্বভাব। এদের পিছনে রয়েছেন সাংখ্যকার তিনি বলেন, প্রকৃতি এবং পুরুষ এই দুই মূল বস্তু স্বীকার করে নিলে বাদবাকি বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ছকে ফেলে বিশ্লেষণ করে ফেলা যায়।
আজকের দিনে এঁরাই বলেছেন, সংসারে মাত্র দুটি পন্থা এখন দেখতে পাচ্ছি। তার একটা কম্যুনিজম, অন্যটি ক্যাপিটালিজম। ক্যুনিজম বলতে এখন বোঝায়, স্তালিন যে রাজ্য চালান তার প্রতি বশ্যতা স্বীকার করে পৃথিবীর সর্বত্র সে রাজ্য বিস্তারকল্পে আপন আপন দেশে শক্ত দল গড়ে তোলা এবং তার আদর্শ হবে স্তালিনকে কেন্দ্র করে শ্রমিক-মজুরের বিশ্বরাজ্য প্রতিষ্ঠা করা। আর ক্যাপিটালিজম বলতে বোঝায়, আপন আপন দেশ নিজের পছন্দমতো অর্থনীতি রাজনীতি চালিয়ে আপন আদর্শের দিকে চলবে।
কম্যুনিস্টরা বলে, দেশে দেশে তোমরা যে জাতীয়তাবোধকে উস্কানি দিচ্ছ তার ফল কী হয় ১৯১৪-১৮ এবং ১৯৩৯-৪৫-এও কি তা দেখতে পেলে না? আর লড়াইয়েই যদি সব শেষ হয়ে যেত তা হলে কোনও ভাবনা ছিল না কিন্তু আসল মারটা তো আসে লড়াই শেষ হয়ে যাওয়ার পর। তখন আরম্ভ হয় অভাব-অনটন, বেকার-সমস্যা, রোগশোক, মহামারী। প্রত্যেক দেশ তখন চেষ্টা করে নিজেকে শক্তিশালী করার জন্য, সর্বপ্রকারের সহযোগিতা তখন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে এক দেশে মণ মণ ধান নষ্ট হয় খাওয়ার লোক নেই বলে, আরেক দেশে লক্ষ লক্ষ লোক মরে খাবার চাল নেই বলে।
ক্যাপিটালিস্টরা উত্তরে বলে, তোমাদের ভূস্বর্গ রুশিয়াতে কি অভাব-অনটন নেই? বোগ-শোক-মহামারী কি সেখান থেকে লোপ পেয়েছে? বরঞ্চ শুনতে পাই, তোমাদের ভূস্বর্গ রুশিয়াতে গত ত্রিশ বৎসর যত লোক না খেতে পেয়ে মরেছে তার অর্ধেক লোকও আর কোথাও না খেতে পেয়ে মরেনি। কিন্তু এহহা বাহ্য। আসল কথা হচ্ছে এই, তোমরা কেন ধরে নিচ্ছ যে তোমাদের পন্থা ছাড়া অন্য কোনও পন্থায় সহযোগিতা সম্ভবপর নয়। তোমরা কেন ধরে নিচ্ছ, আমাদের ভিতর চিরকালই প্রতিদ্বন্দিতা, খুনোখুনি, মারামারি চলবে?
